ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

গতকাল (মঙ্গলবার) রাজধানীর কদমতলী এলাকা থেকে ম্যানহোলে পড়ে যাওয়ার প্রায় চার ঘন্টা পর ইসমাইল হোসেন নীরব নামের ছয় বছরের এক শিশুকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল (মঙ্গলবার) বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে বড়ইতলা জাগরণী মাঠের পশ্চিমদিকের পালপাড়া রোডের স্যুয়ারেজ লাইনে পড়ে যায় সে। খবর পেয়ে তার মা ও স্থানীয় লোকজনের করা উদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। সে ছিল রেজাউল ও নাজমা দম্পত্তির একমাত্র সন্তান।

এটাই শেষ নয়, আজ থেকে প্রায় এক বছর আগেও (২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর) রাজধানীর শাহজানপুরের রেলওয়ে মাঠ সংলগ্ন পরিত্যক্ত পানির পাম্পের ৩শ ফুট গভীর পাইপে পড়ে জিহাদ নামের ৪ বছরের শিশু মারা যায়।

এভাবে দিনের পর দিন ম্যানহোলে পড়ে মানুষ মারা গেলেও সরকারের মৃত দিলে প্রাণের সঞ্চার একটুও যেনো হচ্ছে না। তবে শুনে আপ্লুত হই, সরকার নাকি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটা ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়েছে।
—কী সেই ব্যবস্থা?
—ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটস অ্যাপ বন্ধ করার ব্যবস্থা। এগুলো বন্ধের কারিশমায় নাকি অনেক সন্ত্রাসী কার্যক্রমও ঠেকিয়েছে তারা।

সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী মহোদয়-মহোদয়াগণ আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে এ বিষয়ে যুক্তি দিয়ে বুলিও আওড়াচ্ছেন,
‘যতোদিন জননিরাপত্তা নিশ্চিত না হবে, ততোদিন ফেসবুক বন্ধ রাখা হবে।’
এরা কোমরে গামছা বেঁধে নেমেছে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে, অথচ জনগণ লুঙ্গি পড়ে নামছে নদী সাঁতরাতে।
এরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে ফেসবুক বন্ধ করে, হোয়াটস অ্যাপ বন্ধ করে। অথচ এদের মস্তিষ্কই যে বন্ধ—-সেটাই বা এদের কে বলবে!
এদেরকে কে বুঝাবে—-ফেসবুক বন্ধ করলেই অরাজকতা বন্ধ হয়ে যায় না, রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা বন্ধ হয়ে যায় না, ছাত্রলীগের অস্ত্র-মহড়া বন্ধ হয়ে যায় না, সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না।
এদের কে বুঝাবে—- সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুধু ফেসবুকের জন্যই হয় না, ভাইবারের জন্যই হয় না; নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি শুধু ফেসবুকের জন্যই হয় না, ভাইবারের জন্যই হয় না, বরং এদের মূলে যে রয়েছে অন্যকিছু।

আজকে ফেসবুক বন্ধ থাকে, অথচ ম্যানহোল থাকে খোলা। ফেসবুক বন্ধ করে নাকি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, তবে প্রশ্ন জাগে—‘মাননীয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মহোদয়-মহোদয়াগণ, ফেসবুক বন্ধ করে প্রতিটি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন; তবে ম্যানহোল খোলা রেখে জনগণের কী নিশ্চিত করছেন, দয়া করে বলবেন কি?’

প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম মহোদয়া,
আপনি বললেন, ‘সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত মনে করবে, একজন মানুষও নিরাপদ না, ততোদিন এসব বন্ধ রাখা হবে।’

তবে কি আমরা বুঝে নিবো, ‘প্রত্যেকটি জনগণ যতোদিন না বলবে, আমরা ম্যানহোলে পড়ে গেছি, ম্যানহোলে পড়ে মরে গেছি; ততোদিন পর্যন্ত ম্যানহোল খোলা থাকবে?’
মহোদয়-মহোদয়াগণ, দয়া করে ফেসবুক বন্ধ না করে আপনাদের নির্বুদ্ধিতার কপাটকে বন্ধ রাখুন।
ম্যানহোল খোলা না রেখে আপনাদের মস্তিষ্কের সু-বুদ্ধির জানালাটাকে খোলা রাখুন।

বলতে পারেন, ফেসবুক আর ম্যানহোলকে আমি এক করে গুলিয়ে ফেলছি কেনো? গুলিয়ে ফেলছি এ কারণেই যে, দুটোই চরম নির্বুদ্ধিতার দগদগে দৃষ্টান্ত। আসলে সরকার যতোই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঢেকুর তুলছে, জনগণ ততোই এদের আচরণে বমি করছে।

আজ নীরব মারা যায়, পরশু জিহাদ মারা যায়; অথচ আমাদের কু-বুদ্ধি মারা যায় না। আমাদের নির্বুদ্ধি আর কুবুদ্ধি যে কতো ডাল-পালা মেলেছে, তার হিসাব করতে গিয়েও বুদ্ধিহীন হতে হয়। আমরা আজ এমন এক জায়গায় এসেছি, যেখানে ফেসবুক খোলা থাকলে মহাসমস্যা হয়, অথচ ম্যানহোল খোলা থাকলে সমস্যা নেই।
সরকার ফেসবুক বন্ধ করতে মরি মরি, অথচ ম্যানহোল খোলা রাখাটা যেনো দরকারি!

এর পূর্বেও শিশু জিহাদ ম্যানহোলে পড়ে মারা গেলে, এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উদাহরণ দেবার মতো তেমন কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। খোলা ম্যানহোলগুলো বন্ধেরও কার্যত কোনো তাগিদ অনুভব করেনি তারা। আসলে এরা জনগণের নিরাপত্তা দেবার কথা বলে ঠিকই, কিন্তু এরা নিজেরাই যে জনগণের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কতোখানি হুমকি, সেটা তো বুঝি আমরা।
এদের বুঝা উচিত—শুধু ফেসবুক বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত চেষ্টা করলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। বরং নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির মূল উৎসগুলোতে আঘাত করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তবে এখন যা হচ্ছে, এক কথায় বলতে গেলে—-
‘ কতোগুলো মূর্খ লোক একত্র হলে, যা হয় আর কী!’