ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

ছেলেবেলায় একটা গল্প পড়েছিলাম।খুবই পরিচিত গল্প।  গল্পটি আর কিছু নিয়ে নয়, একটা ধূর্ত অতি পিচ্ছিল শেয়ালের কান্ডজ্ঞানহীন কাণ্ড-কারখানা ও তার হাস্যকর মুক্তবুদ্ধি নিয়ে। দু’চার দিন যারা স্কুলের গণ্ডির চারপাশে আধুলি-সিকি পরিমাণও ছোঁ মেরেছে, তাদের মস্তিস্কের আনাচে-কানাচে খোঁজ করলে গল্পটির দেহাংশ পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

শিয়ালটির লেজ ছিল।জন্ম থেকেই ছিল।প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে আট-দশটা শিয়ালের মতোই সে পেয়েছিল সেটি।কিন্তু কথায় আছে না, ‘ স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করাটা বেশি কঠিন।’

শিয়ালটিও তার লেজ রক্ষা করতে পারেনি । তার দেশ প্রেম, স্বাধীনতা সংগ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গোলা-বারুদের টুকা খেয়ে নয়, নিতান্তই চুরি-চামারির স্বভাবদোষে হারিয়েছিল লেজটি। অন্যের বাড়ির সামান্য কিছু খাবারের লোভ সংবরণ করতে না পেরে, চুরি করে ব্রেকফাস্ট কিংবা ডিনার সারতে গিয়েই তার এ হাল। ফাঁদে পড়ে নিজ বরাদ্দে পাওয়া একটিমাত্র লেজও কেটে ফেলতে হয়েছে। লেজ হারানোর পূর্বে বুঝতে না চাইলেই, লেজখানা খোয়া যাবার পর ধূর্ত শিয়াল কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারে—-কতো বড়ো মূল্যবান সম্পদই না সে হারিয়েছে। কিন্তু এখন আর কি-ইবা করার আছে তার! নিজের জন্য বরাদ্দকৃত একটা মাত্র লেজ যে জনমে একবারই পাওয়া যায়।হাজার মাথা ঠুকলেও আর পাবার নয়। যাইহোক, লেজ হারিয়েছে তো ঠিক আছে। এটা-সেটা বলে, বিজ্ঞানের কতগুলো সূত্র তুলে ধরে, চাপাবাজি-ঠকবাজি করে লেজ হারানোর কারণটা না হয় ধামা-চাপা দেয়া যাবে। কিন্তু লজ্জা ঢাকে কী দিয়ে?
অতঃপর শয়তানকে তোষামোদ করে, তার কাছ থেকে কিছু যুক্তি, কিছু বুদ্ধি আর মুক্তচিন্তার পাঠ ধার করে বখে যাওয়া মগজে সংরক্ষণ করে।

বুদ্ধিমতো স্বজাতির কাছে হাজির হয় সে। স্বজাতি ভাই-বোনেরা শেয়ালটির পেছনকার লেজনামক বস্তুটি না দেখতে পেয়ে বিস্মিত বোধ করে, একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে, কেমন যেনো ফিস-ফাস শুরু করে। ধূর্ত শেয়ালটি সবটা বুঝতে পেরে ফিক করে হেসে দিয়ে উপস্থিত স্বজাতি ভাই-বোনদের উদ্দেশে দীর্ঘ বাণী পেশ করতে শুরু করে। একে একে লেজ না থাকার কাহিনি থেকে শুরু করে লেজ কাটার সুবিধা, লেজ রাখার অপ্রয়োজনীয়তা, লেজ কেটে প্রগতিশীল আধুনিক শিয়াল সম্প্রদায় হবার সব রকম নিয়ম-কানুন, বিধি-ব্যবস্থা-পথ বাতলাতে থাকে। মাঝে-মাঝে লেজ কেটে ফেলার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা বুঝাতে গিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে নানান যুক্তি-তর্ক পেশ করতে থাকে। আর এক্ষেত্রে ডারউইন থেকে শুরু করে আইনস্টাইন, নিউটন, গ্যালিলিও, রাসেল কারোর মতই বাদ যায় না। ধূর্ততার সাথে স্বজাতি ভাই-বোনদের বুঝাতে থাকে যে, কীভাবে লেজ কেটে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিশীল শিয়াল সম্প্রদায় হওয়া যায়। আর এভাবেই সে ধীরে ধীরে বনে যায় জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানমনস্ক শেয়াল হিসেবে।

যাহোক, এবার মূল দিকে ফেরা যাক।

দেশে আজকাল অসংখ্য বুদ্ধিজীবীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। পূর্বেকার কলেরা-আমাশয়ের মতো দেশময় বুদ্ধিজীবীদের মহামারি লেগেছে বোধ হয়। এসব বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই আবার স্বঘোষিত মুক্তমনা। শুধু মুক্তমনা বললে ভুল হবে, এরা প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী আরও অনেককিছুও বটে। এদের কিছু অংশ আছে দেশে, দেশের ভেতরে যারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো সময়ে অসময়ে হাম্বা হাম্বা ডেকে অস্থির করে তুলে। আর কিছু অংশ থাকে সুদূর জার্মানি, ভারত কিংবা আমেরিকায়, যাদের কাজটাও অনুরূপ ঘেউ ঘেউ করা। তাদের এই হাম্বা হাম্বা কিংবা ঘেউ ঘেউ করার কারণটা সুনির্দিষ্ট হলেও, সময়, ধরন কিংবা ছদ্মবেশটা কিন্তু অনির্দিষ্ট। এরা কখনো অতি দেশপ্রেমিক সেজে ভ্যা ভ্যা করে, কখনো বা মুক্তবুদ্ধির খোলা চত্বরে গিয়ে হাম্বা হাম্বা করে, কখনো বা মুক্তিযুদ্ধের নাম বেচে, স্বপক্ষের শক্তি সেজে ম্যাও ম্যাও করে। তবে এদের ছদ্মবেশটা যা-ই হোক না কেনো, উদ্দেশ্যটা কিন্তু পরিষ্কার। এদের অবস্থান, চিন্তাধারা আর মুক্তচিন্তার নামে ভ্র্রান্তচিন্তার ব্যবচ্ছেদ করলে, সহজেই বুঝা যায় এদের ভেতরকার মূল এজেন্ডাটা কী! এদের জীবনাচরণ, আচার-অনুষ্ঠান, বেশ-ভূষা কিংবা প্রতিদিনকার ক্ষুদ্র্রাতি-ক্ষুদ্র ক্রিয়াকলাপ বিশেষ পর্যবেক্ষণে আনলে সহজেই বুঝা যায়, এদের চারিত্রিক বিকারগ্রস্ততা কতোটা চরমে। চরিত্রের কতোটা অংশ পচে গেলে, মুক্তমনার নামে মুক্ত বেহায়াপনার স্লোগান দেয়া যায়, তা এ সমস্ত তথাকথিত দু একটা মুক্তমনার ক্রিয়াকলাপ নজরে আনলে, অনুমান করতে আর কষ্ট হয় না।
গতকাল এমনি দু’এক মুক্তমনা আর প্রগতিবাদীর আবেদন-নিবেদন খেয়াল করলাম। দু’ জনই জার্মানি থাকে। শাহবাগের একনিষ্ঠ কর্মী- সমর্থক হিসেবে কতকটা পরিচিতি আছে তাদের । এদের মধ্যে একজন বিতর্কিত এক অধ্যাপকের পুত্রও রয়েছে। দু’জনই শক্ত বুকের পাটা নিয়ে দু’ মাসের বাচ্চার মতো প্রাণভয়ে কুঁকড়ে জার্মানিতে আত্মগোপনে। দেশে না ঠাঁই হওয়ায় বিদেশে এরা। অবশ্য সভ্যসমাজে অসভ্যের বাঁদরামি না টেকারই কথা। এজন্যই হয়তো সেখানটায় তারা, যদিও টয়লেটের কমোড খাবারঘরে থাকে না। নির্দিষ্ট জায়গায়-ই এরা মানানসই, টয়লেটেই এদের চমৎকার লাগে।আসলে নিজ গুণে নিজ জায়গা পাওয়াটাই এদের প্রাপ্য।

যাইহোক, এমন আত্মগোপনে থাকা ফেরারি দুই আসামীর একটা স্বভাবজাত কাজের নমুনা চোখে পড়লো। এরা নাকি তরুণ-তরুণীদের বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে। আহ্বানের বিষয়বস্তুটাও অবশ্য তাদের চরিত্রের সাথে মানানসই।আহ্বানটা কী? আহ্বানটা হলো—আগামী ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে তরুণী-তরুণীরা যেনো প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশি পাহারায় একে অপরকে চুমো খায়। এজন্য তারা রেজিট্রেশন করারও আবেদন জানিয়েছে আগ্রহী তরুণ-তরুণীদের। এখানেই ক্ষান্ত নয়, মুক্তমনাদের মুক্তবুদ্ধির প্রচার-প্রসার আর উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ফেসবুকে একটা ইভেন্ট পেজও খুলেছে তারা। একজন উদ্যোক্তা ইভেন্ট বিষয়ে নিয়মিত প্রগতিবাদী জবাবও দিচ্ছেন।

http://www.somoyerkonthosor.com/archives/349698

বিষয়টা শুনে ও দেখে আমি মোটেও আশ্চর্য হয়নি।আসলে এদের কাছ থেকে এমন কিছুর আহ্বান না আসাটাই বরং আশ্চর্যের কারণ হতো। কেননা হাজার হোক, এরা তো প্রগতিবাদী মুক্তমনা, বিজ্ঞানমনস্ক আর যুক্তিবাদী, তাই না?
এদের কাজ যে প্রগতির পক্ষে, মুক্তবুদ্ধি আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে!

তবে অবচেতন মনে আপনিতেই প্রশ্ন জেগে ওঠে, ‘ এসব অশ্লীলতা কী সত্যিই প্রগতির পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে?
আজ যারা মুক্তবুদ্ধি চর্চার নামে, মুক্তিযুদ্ধের নাম বেচে এসব অশ্লীলতা উসকে দিচ্ছে, এরা কী সত্যি প্রগতিবাদী?
অবচেতন মন প্রত্যুত্তরে বলে, কক্ষনো না।

তবে কী?
কী তাদের উদ্দেশ্য?

উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার। এদের নিত্য-নৈমিত্তিক কার্য-কলাপ বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসে কোন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তারা মুক্তমনা, প্রগতিবাদী, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিনামক ট্যাগ ব্যবহার করে অবিরাম নীল নকশা এঁকে যায়। আদতে মুখে মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ বলে ঢেকুর তুললেও এদের অন্তরে অন্য কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের শয়তানি বদ ইচ্ছা আছে। একটু খেয়াল করলেই বুঝা যাবে, এদের মূল টার্গেটটা কী! এদের মুক্তমনা সাজার হেতুটা কী!
একটু পরিষ্কার যদি করি, মূলত কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষণের ফলেই তাদের এ উন্মত্ত উল্লম্ফন। তারা চায় বিশেষ কিছুর লাইসেন্স। কিন্তু সেই লাইসেন্স পাবার পথে প্রধান বাঁধা সেই বিশেষ ধর্ম হওয়ায় ধর্মবিদ্বেষ তাদের এতোটা চরমে। আর সেই ধর্মবিদ্বেষ থেকেই তাদের মুক্তমনা, সংশয়বাদী আর যুক্তিবাদী সাজার শেয়ালী অপচেষ্টা।

মূলত এরা চায় নগ্নতার ছাড়পত্র পেতে, প্রকাশ্য রাস্তায় বেহায়াপনা করতে , খেয়াল খুশিমতো মদ-গাঁজা-ইয়াবা খেয়ে থার্টি ফার্স্টনাইটে ঢলাঢলি করতে, ইচ্ছেমতো যেভাবে খুশি লিভ টুগেদার করতে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে আপত্তিকর মেলামেশা করতে। এরা চায় ধর্ম ওঠে যাক, কারণ ধর্ম এসব অশ্লীলতা নিষেধ করেছে। কিন্তু তথাকথিত মুক্তমনা সম্প্রদায় বরাবর-ই চায় এসবের লাইসেন্স পেতে, যাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে চুমো খাওয়া যায়, কেউ তাদের বাঁধা না দেয়, এসবকে অপরাধ না ভাবে। আর ধর্মই প্রথমে বাঁধা দেয় বলে, এটাই তাদের চক্ষুশূল।

এরা ভাবে, ধর্মই যতো বাঁধার মূল। ধর্মকে উঠিয়ে দিলে যা ইচ্ছে তা-ই করা যাবে, যখন খুশি ভন্ডামি করা যাবে, মদ, গাঁজা, হিরোইন খাওয়া যাবে। বিয়ে না করে লিভ টুগেদার করা যাবে, প্রকাশ্য রাস্তায় চুমো খাওয়া যাবে, সমকামিতায় জড়ানো যাবে, ইনচেস্ট রিলেশন করা যাবে, নগ্নতা- নির্লজ্জতার চরম শিখরে পোঁছা যাবে। অতএব ধর্মকে উঠিয়ে দাও। আর এজন্যই মূলত বিশেষ কোনো ধর্মের প্রতি এতো এলার্জি এদের।

সেই এলার্জি থেকেই তারা মূর্খের মতো বিশেষ কোনো ধর্মের অপব্যাখ্যা করে, যাচ্ছেতাই মন্তব্য করে, ধর্ম নিয়ে বিষোদগার করে। আর এসব অপকর্ম ঢাকতেই ট্যাগ ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের, মুক্তমতের, প্রগতিবাদের। মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিন্দুপরিমাণ চর্চাও এদের মাঝে নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কোথাও নেই নগ্নতাকে লাইসেন্স দিতে হবে, প্রকাশ্য রাস্তায় চুমো খাওয়ার আহ্বান জানাতে হবে।
তাদের ঘৃণ্য বাসনাকে আড়াল করতেই যুক্তিবাদী, মুক্তমনা আর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি নামক খোলস ব্যবহার করে। আর খোলসে টুকা দিলেই বেরিয়ে আসে আসল রূপ-রহস্য।

আসলে এ-সমস্ত মুক্তমনাদের পরিকল্পনাই হচ্ছে দেশটাকে বেশ্যানগরী বানিয়ে তোলা। তা না হলে কেউ প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশি পাহারায় চুমো খাবার আহ্বান জানাতে পারে! ছিঃ এদের আসল রূপটাই হচ্ছে এমন। এরা ভাব ধরে মুক্তমনার, আসলে এরা নগ্নমনা। এরা ভাব নেয় যুক্তিবাদীর, আদতে এরা নগ্নবাদী। মূলত যুক্তিবাদীর মুখোশে এরা নগ্নবাদী শয়তান।

তবে আর যাইহোক, এদের সাথে লেজকাটা শিয়াল পন্ডিতের সদৃশ্যতা কিন্তু বড়ই নজরকাড়া। শেয়াল যেমন নিজের স্বভাবদোষে লেজ হারিয়ে, সেই লজ্জা ঢাকতে সমগ্র শিয়াল সম্প্রদায়কে লেজকাটার উপকারিতা শোনায়। নিজে যখন লেজ হারিয়েছে, তখন সকলের লেজ কী করে খোয়ানো যায়; সেই অপচেষ্টা-ই সর্বদা মশগুল থাকে।

আজকালকার পাতি বুদ্ধিজীবী আর স্বঘোষিত মুক্তমনা, যুক্তিবাদীদের অবস্থাও ঠিক তেমনি। নিজেরা তো নির্লজ্জ-বেহায়া, বখে যাওয়া কুলাঙ্গার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে-ই, এখন কী করে লেজকাটা শেয়ালের মতো সমগ্র জাতিকে কুলাঙ্গার-বেহায়া জাতি হিসেবে গড়ো তোলা যায়; সে অপচেষ্টাটা-ই তারা এখন করছে—- মুক্তবুদ্ধি চর্চার নামে, প্রগতিবাদ, সংশয়বাদ আর মুক্তমতের নামে।