ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

দীর্ঘ পথ পরিক্রমা, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। এই ঐতিহাসিক অভ্যুদয়ের পরতে পরতে লেপ্টে আছে কিছু মানুষের ঘাম, শ্রম আর রক্তের গন্ধ। মানুষগুলো জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। ভাষার মাসে জাতির এই সূর্য সন্তানদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

আমরা যে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি সে মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথযাত্রায় এক অবশ্যম্ভাবী অবিস্বরণীয় ঘটনা। বলতে বাধা নেই, এই যুদ্ধ আমাদের চেতনাকে শাণিত করে; আমরা প্রেরণা পাই, ভরসা পাই, এগিয়ে যাবার সাহস পাই। জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মহান দেশাত্ববোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ- এ কথা অস্বীকার করবারও জো নেই। আদতে বাঙালি মাত্রই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করেন, চর্চা করেন নিঃস্বার্থ যাপিত জীবনে-  স্যালুট তাঁদের।

তবে আসল কথা হলো, চর্চিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রকমফের যেমন আছে, তেমনি আছে চেতনাধারী মানুষগুলোরও রকমফের। তাদের রং-ঢং যেমন ভিন্ন, ভিন্ন তেমন তাদের উদ্দেশ্যও। আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংজ্ঞাটাও আজ ভিন্ন ভিন্ন। কারো কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে রাজনৈতিক মঞ্চে চিৎকার-চেঁচামেচি করে ভোট ভিক্ষে করা, কারো কাছে বিরোধী পক্ষকে রাজাকার, নব্য রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী তকমা দেবার উপলক্ষ্য পাওয়া, কারো আছে আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে নকল সার্টিফিকেট জোগাড় করে মাসে মাসে সরকারি কোষাগার থেকে টাকা ভিক্ষে করা, আবার কারো কাছে বা সন্তান-সন্ততি-নাতি-নাতনিদের চাকরিতে বিশেষ কোটার দুর্লভ অধিকারি হবার ব্যবস্থা করা। ব্যক্তিভেদে এই চেতনাগুলো পাল্টে যায়, পাল্টে যায় চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশও। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ কথাটা হতে থাকে বারবার অপমানিত। আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যতো চাওয়া-পাওয়ার ফর্দ উড়তে থাকে, পৃথিবীর আর কোনো দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধকে নিয়ে এতো রকম লোভাতুর আয়োজন হয় কি না আমার জানা নেই।

দেশে কত জন মুক্তিযোদ্ধা আছেন (খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা তো দূরের কথা) তার নির্ভুল পরিসংখ্যান আজও আমরা পাইনি। বছর যায়, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটাও বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির আবেদনের ফর্দও। আর আমরা তো মুক্তিযোদ্ধাদের ইদানিং সুযোগ-সুবিধাগুলো সম্পর্কে বেশ ভালোই ওয়াকিবহাল। তাঁদের সন্তানদের জন্য সরকারি চাকরিতে বিশেষ কোটা, এই কোটা, সেই কোটা। তবে অতি আশ্চর্যের ‍বিষয় হলো, সরকার এই বিশেষ কোটার ক্ষেত্রে মহান মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদেরও অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিষয়টি চরম হাস্যকর ও বৈষম্যমূলক। মুক্তিযোদ্ধাদের অসামান্য অবদানের জন্য তাদের স্বাবলম্বী কিংবা পুনর্বাসন করার বিভিন্ন পথ রয়েছে। তাই বলে নাতি-নাতনিদেরও বিশেষ কোটায় অন্তর্ভুক্তিকরণ দেশের অন্যান্য জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল। শুধু তাই নয়, অসাংবিধানিকও বটে। কেননা সংবিধানে দেশের সকল নাগরিককে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে।

মূলত, মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ীদের লাভের পাল্লাটাও বেশ ওজনদার হয়েছে। আর এই ওজনদার লাভের ভাগ নিতে কেই-বা না চায়! তাইতো মুক্তিযোদ্ধা হবার লাভজনক ম্যারাথন দৌঁড়ে প্রতিবছর প্রতিযোগির সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধির দিকে। কল্পনাতীতভাবে মুক্তিযোদ্ধা অন্তর্ভুক্তির আবেদন যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তিকরণের আশঙ্কাও। তবে ভুয়াদের দৌরাত্মে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি অনেকটাই ম্লান।

আজ মুক্তিযোদ্ধা হবার প্রাণান্ত চেষ্টা-তদবিরের মূলে রয়েছে সরকারের দেয়া লোভনীয় আর্থিক সুযোগ-সুবিধাসহ নানা রকম মনভুলানো প্রলুব্ধকর ডিসকাউন্ট। আজ থেকে ১০ বছর পূর্বেও মুক্তিযোদ্ধা হবার এমন আগ্রহ-উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়নি। সরকার যখন একের পর এক সুবিধা বৃদ্ধির আয়োজন করছে, তখনি হঠাৎ এত সংখ্যক প্রার্থীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাবার প্রাণপণ চেষ্টা লোভাতুর মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয় কি?

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, স্বাধীনতার এত বছর পর কেন স্বীকৃতি পাবার এতো প্রাণপণ চেষ্টা? প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কি সত্যি দেশপ্রেমিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবার জন্য যুদ্ধ করেছেন? না-কি মাকে ভালোবেসে তার সম্মান বাঁচাতে নিঃস্বার্থে নিজেকে বুলেটের আগায় সঁপে দিয়েছেন? মায়ের ইজ্জত বাঁচিয়ে কোন সন্তান কি বিনিময় চায়? সে কি কোনো আর্থিক সুবিধা নিতে চায়? মায়ের জন্য কিছু করে সন্তান কি তার স্বীকৃতির জন্য সত্যি দ্বারে দ্বারে গিয়ে ধরণা দেয়? এ প্রশ্নের জবাব আমি পাইনি আজও। বড়ই অদ্ভুত লাগে আমার!

আমাদের দেশের সূর্য সন্তানরা যুদ্ধ করেছেন, দেশকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্মৃতিসৌধ। তাঁদের অবদান ভুলবার নয়। তাঁদের ঋণ শোধ হবার নয়। তাদের দেশের সর্বোচ্চ আসনটাতে আজীবন সমাসীন রাখা হোক, পুনর্বাসিত করা হোক। কিন্তু এই সব কিছু যেনো দেশের অন্যান্য নাগরিকদের সাথে বৈষম্য করে না হয়। যখন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়, তখন সেটা বৈষম্য নয় (বরং আমার কাছে কমই মনে হয়)। কিন্তু যখন তাঁর নাতি-নাতনিদের কোটাভিত্তিক এক টাকাও দেয়া হয় (মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনি হিসেবে সরকারি চাকরিতে বিশেষ কোটা) তখন সেটা নিঃসন্দেহে চরম বৈষম্য।

নাগরিক হিসেবে সবার সমান সুযোগ-সুবিধা পাবার অধিকার রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনি কিংবা ছেলে-মেয়ে বলেই সে দেশের স্পেশাল নীতির স্পেশাল দাবিদার- এটি ঠিক নয়। মুক্তিযোদ্ধা তাদের বাবা কিংবা দাদা-নানা, তারা নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান শুধু তাঁদেরই দেয়া উচিত। এখানে স্বজনপ্রীতির কোনো সুযোগ নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, মুক্তিযোদ্ধারা দেশপ্রেমিক বলে তাদের ছেলে-মেয়ে কিংবা নাতি-নাতনীও যে সাচ্চা দেশপ্রেমিক হবে- এমন নিশ্চয়তা কি সত্যিই আছে? বরঞ্চ অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তো দেশের জন্য ক্ষতিকর এমন কাজেও যুক্ত আছেন। তারা যে দুর্নীতি পরায়ণ হবে না- এমন তো কোনো গ্যারান্টি নেই। তারা যে সবসময় দুর্দান্ত মেধাবী হবে- এমনও তো কোনো কথা নেই। তবু এদের জন্য কোটাব্যবস্থার বিশেষ সুযোগ!

আর এই সুযোগ সন্ধানেই দেশের ৫০ শতাংশেরও বেশি লোক মুক্তিযোদ্ধা সনদের পিছু নেয়। কারণ তারা জানে, ছলে-বলে-কৌশলে এই একটি মাত্র সনদ কবজা করতে পারলে আমার ছেলেটার চাকরি নিশ্চিত, নাতিটার কর্মসংস্থান হাতের মুঠোয়। মাসে মাসে পকেটে কিছু টাকাও আসবে। রাজনীতির মাঠে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে পারবো- “আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি। আমাদের ভোট দিন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী।” আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে কি একেই বুঝায়?

অবশ্য যে দেশে সরকার দলীয় কোনো মন্ত্রী ঘটা করে সভা করে ঘোষণা দেয়- ‍মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি-নাতনিদের লিখিত পার হলেই চাকরি, কোনো মৌখিক লাগবে না; সেই দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংজ্ঞা যেকোনো কিছুই হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অবশ্য যেখানে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞাটাই আমরা এখনো সুনিশ্চিত করতে পারিনি, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রং জনে জনে ভিন্ন হবে এটাই তো স্বাভাবিক।

মূলত মুক্তিযুদ্ধ কথাটা আজ আর সেই অর্থে নেই, যে অর্থে ব্যবহৃত হতো একাত্তরের উত্তাল আন্দোলনে। আজ মুক্তিযুদ্ধ কথাটা ব্যবহৃত হয় রাজনৈতিক মাঠ গরমে, বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করতে অথবা ক্ষমতায় আরোহণ কিংবা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখবার দুরভিসন্ধিতে। সত্যি বলতে কি, মুক্তিযুদ্ধ আজ লাভজনক ব্যবসা; যে ব্যবসায় কোনো লস নেই, ষোলো আনাই মিঠে।