ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

ভূমিকাঃ
বিগত ১৬ই অক্টোবর’২০১১ রোববার, গনপ্রজাতন্ত্রী আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত সকল প্রবাসী বাংলাদেশীদের সমাজকল্যান মূলক সংগঠন ‘অল বাংলাদেশী এসোসিয়েশন অব আয়রল্যান্ডের’ জাতীয় কার্য্যনির্বাহী সংসদ (National Executive Council) এর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। নির্বাচন কেমন হল কিংবা কেমন হতে পারত তা সম্পর্কে লিখার বেশ ইচ্ছা আমার ছিল এবং এখনও আছে। কিন্তু ইতোমধ্যে ‘আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশী কমিউনিটির নির্বাচন এবং কেরামত আলীদের কেরামতি’ শিরোনামে সাজেদুল আমীন চৌধুরী রুবেলের লিখাটি আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
উন্মাদের উক্তিঃ
রুবেলের লিখা পড়ে মন্তব্য কলামে বেশ কয়েকজন সাধুবাদ দিয়েছেন। সাধুবাদ দেবার প্রচন্ড ইচ্ছা আমারও ছিল কিন্তু যেহেতু আমার মানসিক সমস্যা আছে অর্থাৎ আমি উন্মাদ তাই বোধ করি সম্পূর্ন সাধুবাদ তাকে দিতে পারছিনা কিংবা পারলাম না। এতে করে আমার নিজেরই দৈন্যতা প্রকাশ পাচ্ছে এটা অবধারিত। আংশিক সাধুবাদ দিয়েই আমার লিখাটি শুরু করলাম।
যারে দেখতে নারী তার চলন বাকাঃ
রুবেল শুরুতে লিখেছেন গ্রামীন প্রবাদ ‘যার যে লয়, মরলে দূর হয়’ আর লিখেছেন ‘কয়লা ধুলে ময়লা ত যায় না’। শুরুতেই তিনি এক ব্যাক্তির ওমরাহ পালন আর ফ্রেঞ্চ স্টাইল দাড়ি নিয়ে বক্তব্য প্রদান করেছেন। ভুল না বুঝে থাকলে তিনি ঐ দুটি প্রবাদ ফ্রেঞ্চ স্টাইল দাড়িওয়ালা ব্যাক্তি সম্পর্কেই করে থাকবেন। একজন ব্যাক্তি সম্পর্কে এ বক্তব্যটুকু সম্পূর্ন ব্যাক্তিগত অপছন্দের বহিঃপ্রকাশ বলে আমার মনে হয়েছে। আরেকটু বললে বলা যায় যে, ‘যারে দেখতে নারী তার চলন বাঁকা’ মার্কা অভিব্যক্তি। এই বক্তব্যটুকু তার লিখাটির মানকে অনেকটাই ক্ষুন্ন করেছে বলে আমি মনে করছি। পরবর্তীতে তিনি এই ব্যাক্তিটির ভোট গননায় অংশগ্রহনের অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন উত্তোলন করেছেন এবং এমনকি উক্ত ব্যাক্তিটির নিজস্ব প্রকাশে ভোট দান খয়রাতের ক্ষমতার কথা প্রকাশ করেছেন।
সত্য প্রকাশিত হোকঃ
সম্ভবতঃ ঐ ব্যাক্তিটিকে চিনে নিতে অনেকেরই অসুবিধা হবে না। যদি আমি ভুল না করে থাকি, আমার দেখায় ঐ ব্যাক্তিটি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রদানকৃত একটি মনোগ্রাম সামনের পকেটে ঝুলিয়ে ভোট গননায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি যদিও কোন নির্বাচন কমিশনার ছিলেন না কিন্তু তিনি একটি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার থাকার কারনে, নির্বাচন কমিশনের অন্তর্গত ছিলেন এবং নির্বাচন গননায় অংশগ্রহনের অধিকার তার পূর্নাংগই ছিল বলে আমি মনে করি। তবে সত্যি সত্যিই যদি জমিদারী স্টাইলে ভোট দান খয়রাত করে থাকেন তাহলে তিনি যে দূর্নীতি, অন্যায়, বেআইনী এবং বিবেক বহির্ভূত কাজ করেছেন তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু আমি সেই কথাগুলো যেহেতু শুনিনি এবং রুবেলের বক্তব্যে ব্যাক্তিগত অপছন্দের প্রকাশ উপলব্ধী করছি তাই সেটা বিশ্বাস করতে পারছি না। কয়লা ধু’লে ময়লা যায় না এই অভিব্যাক্তি কিংবা ‘যার যে লয় মরলে দূর হয়’ এই ধরনের নেতিবাচক প্রবাদ এই ব্যাক্তি সম্পর্কে প্রকাশ করে রুবেল নিজেকে ক্ষুদ্রতর করেছেন, নিজের লিখনীকে অসম্মান করেছেন বলেই আমি মনে করি। ঐ ব্যাক্তিটির লয় আমরা পছন্দ না করতেই পারি কিন্তু মৃত্যু দিয়ে যে লয় দূর করা যায় না তার একটি প্রামান্য গল্প আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। ‘এক গ্রামে এক দুষ্ট ব্যাক্তি বসবাস করতেন, তার যন্ত্রনায় গ্রামবাসী ছিলেন অতিষ্ঠ। এমতাবস্থায়, একদিন দুষ্ট ব্যাক্তিটি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তার মরনের সম্ভাবনা দেখা দিল। দুষ্ট ব্যাক্তিটি তখন সকলের দুয়ারে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং বললেন, তিনি চান তার মৃত্যুর পর যেন তার দুষ্ট কাজের শাস্তি স্বরূপ তাকে গ্রামের প্রবেশ পথে ঝু্লিয়ে রাখা হয়। এতে করে তার আত্না শান্তি পাবে, গ্রামের জনগন স্বস্তি পাবে এবং ভবিষ্যতে সকল দুষ্ট লোকরা শিক্ষা গ্রহন করবে। গ্রামবাসীরা তার কথা রেখেছিলেন, কিন্তু গ্রামের প্রবেশ পথে মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখার দায়ে সকল গ্রামবাসীকে জেলে যেতে হয়েছিল। পরিশেষে গ্রামবাসীদের শিক্ষা ছিল এটাই যে দুষ্ট ব্যাক্তি তার মৃত্যু নিয়েও দুষ্টামি করতে পিছপা হয় নি। আমি মনে করি আমাদের উচিত দুষ্ট ব্যাক্তির নষ্টামি এবং ভন্ডামি উপযুক্ত সময়ে প্রমান সহকারে জনগনের সামনে প্রকাশ করা, এতে করে সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অন্যায় ঘৃণীত হবে।
অর্ধেক সত্য মিথ্যার চেয়ে ভয়াবহঃ
আমি একটি প্রবাদ আপনাদেরকে জানাতে চাই, প্রবাদটি হচ্ছে, ‘’অর্ধেক সত্য, মিথ্যার চেয়েও ভয়াবহ’; এই প্রবাদের সাথে একটি গল্পও বলছি, ‘একজন রাজা একদিন ছ’জন অন্ধ ব্যাক্তিকে একটি হাতির এক একটি অংশ ছুঁয়ে তাদের অনুভব ব্যাক্ত করতে বললেন। যে অন্ধ কান ছুয়েছেন তিনি বললেন ওটা একটি কূলো; যিনি পা ধরলেন তিনি ওটাকে একটি খাম্বা বললেন; যিনি শুড় ধরলেন তিনি মনে করলেন ওটা বড় একটি গাছের কান্ড; যিনি লেজ ধরলেন, তিনি মনে করলেন ওটা একটা মোটা দড়ি; যিনি শরীর ছুয়ে দেখলেন, তিনি ভাবলেন ওটা একটা দেয়াল আর যিনি হাতির দাঁত ছুঁয়ে দেখলেন তিনি ভাবলেন ওটা একটা শক্ত পাইপ। এর পর সবার মতামত সম্পর্কে একে অপরের মধ্যে বিবাদ বিসম্বাদ লেগে গেল। অতঃপর রাজা সত্য প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, ওটা কুলো, খাম্বা, কান্ড, দেয়াল, দড়ি কিংবা পাইপ কিছুই ছিল না, ওটা ছিল একটি হাতির বিভিন্ন অংশ মাত্র।‘
আমার মনে হয়েছে, আমাদের লিখক রাত সাড়ে এগারটায় লিমেরিকের কিলমরি লজ হোটেলে গিয়ে শুধুমাত্র কান ছুয়ে ওটাকে কূলো ভেবেছেন, ভোর সাড়ে পাচটায় বাসায় চলে গিয়ে তিনি না দেখেছেন হাতির শুঁড় আর না দেখেছেন হাতীর পা। তিনি দু’জন বিজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর সাথে আলোচনা করে দুটো খাম্বা দেখে মন্তব্য তৈরী করেছেন বটে কিন্তূ তৃতীয় একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী যিনি বিজয়ী হয়েছেন তার সম্পর্কে কোন মন্তব্য না করে কিংবা তার সাথে কোন আলোচনা না করে তার নিজের পুরো লিখনীটিকেই অসম্পূর্ন এবং প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন। এতে করে, তার লিখনিটিকে আমি ‘অর্ধেক সত্য, মিথ্যার চেয়ে ভয়াবহ’ প্রবাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন এবং একটি হাতির অংশবিশেষ দেখে মন্তব্য করার শামিল বলেই মনে করছি। আর তাই সাধুবাদ দিতে আমার কার্পণ্য প্রকাশ করে রাখলাম।
আমাকে বিশ্বাস করবেন নাঃ
ব্যাক্তি হিসাবে আমি নিজেকে পক্ষপাতদুষ্ট হিসাবেই মনে করছি। যেহেতু আমি কোন একটা পক্ষকে ভোট প্রদান করেছি এবং নিজে একজন প্রার্থী ছিলাম তাই আমি নিরপেক্ষ ছিলাম না তা আপনাদের পূর্বাহ্নেই বলে রাখলাম। আপনাদের প্রতি অনুরোধ, ‘অনুগ্রহ করে আমার বক্তব্য বিশ্বাস করার আগে যাচাই করে সত্যতা নিরুপণ করে নেবেন; তবে আমি হাতির অনেকাংশ ছুয়ে দেখেছি বলে রুবেলের শুধু কান দেখে কূলো বলার সম্ভাবনা অনেক কম থাকবে এবং আমি কান, লেজ, শূড়, শরীর, পা এবং দাত সহ এই নির্বাচনটিকে একট পূর্নাংগ হাতি হিসাবে ধারনা করেই আমার বক্তব্য উপস্থাপন করব।

নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি এবং ভোট গ্রহনঃ
আমি ১৬ই অক্টোবরের নির্বাচনকে দেখেছি অত্যন্ত কাছে থেকে। সারা আয়ারল্যান্ডে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ২৫৪০ জন ভোটারের ভোট নিরপেক্ষ, সঠিক এবং সুষ্ঠুভাবে গ্রহন করা আপাতঃদৃষ্টিতে কারো কাছে সহজ মনে হলেও আমি অনুধাবন করি এটা ছিল অত্যন্ত দূরুহ কাজ। এই দুরূহ কাজটি অদক্ষ এবং অনভিজ্ঞ নির্বাচন কমিশন প্রচন্ড ভূল ত্রুটি সহ সম্পন্ন করেছেন। ভোট গ্রহন সম্পর্কিত তেমন কোন বিতর্ক আমার দৃষ্টিগোচর হয় নি। ১১ টি স্থায়ী কেন্দ্র এবং ৮টি ভ্রাম্যমান কেন্দ্রে (সঠিক সংখ্যাতত্ত্ব নয়) ভোট গ্রহন করা হয়। ভ্রাম্যমান কেন্দ্রগুলো অনেক দেরীতে বিভিন্ন স্থানে পৌছালে বেশ কিছু ভোটার অপেক্ষা করে ফিরে যাওয়ার সংবাদ আমরা জানতে পেরেছি। স্থায়ী কেন্দ্র গুলোতে যারা পর্য্যবেক্ষন করেছেন তারা অনেকেই প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা এবং সততার প্রশংশা করেছেন। বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি এই নির্বাচনকে অর্থবহ করেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রবাসী বাংলাদেশীরা এধরনের একটি নির্বাচনে ভোট দিতে পেরে আনন্দিত এবং পরিতৃপ্ত হয়েছেন। অনেকেই এই দিনটিকে এক ধরনের উৎসবের আমেজে উদযাপন করেছেন। নির্বাচন কেন্দ্র গুলোতে প্রতিদ্বন্দী প্রার্থী কিংবা তাদের সমর্থকদের মধ্যে সহযোগীতা, সহমর্মীতা এবং বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ অনেককেই উৎসাহিত এবং উদ্দীপ্ত করেছে। নির্বাচন কতটুকু অর্থবহ হয়েছে তা ভোটারদের উপস্থিতিই প্রমান করে দেয়। সর্বমোট ২৫৪০ নিবন্ধনকৃত ভোটারের মধ্যে ২০৪৭ জন ভোটার ভোট প্রদান করেন। ভোটার উপস্থিতির অনুপাত ৮০ শতাংশেরও উর্ধে।
ভোট গননা এবং ফলাফলঃ
ভোট কেন্দ্রে ভোট গননা করে কেন্দ্র ভিত্তিক ফলাফল প্রকাশ করা একটি সর্বজনগ্রাহ্য এবং সতঃসিদ্ধ পদ্ধতি। নির্বাচন কমিশনের সদস্যবৃন্দ সকল ধরনের যুক্তিতর্ক, রীতিনীতি কিংবা প্রমাণ উপেক্ষা করে মারাত্নক ঝুঁকি গ্রহন করে সকল বেলট লিমেরিক শহরে একটি হোটেলে স্থানান্তর করেন। আমার ধারনা মতে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের মধ্যে ভোট গননার বিশালতা এবং যৌগিকতার কোন ধারনাই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে একটু চিন্তা করলে সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব যে ৭২ জন প্রতিদ্বন্দী এবং ২০০০ ভোটারের ভোট গননার সর্বমোট পরিমান একলক্ষ চল্লিশ হাজারের উর্ধে। রাত দুই ঘটিকার সময় যখন ভোট গননা শুরু হয় তার অব্যবহিত পরেই তারা অনুধাবন করতে সক্ষম হন যে এই পদ্ধতিতে গননা করা হলে এক সপ্তাহেও গননা সমাপ্ত করা সম্ভব নয়। তাই প্রাথমিক কয়েকটি পদে অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাধারন-সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ইত্যাদি কয়েকটি মূল পদে প্রাথমিক ভাবে ভোট গননার সিদ্ধান্ত নিয়ে সকলের সহযোগীতায় কোনপ্রকার বিরোধ, আপত্তি, প্রতিবাদ কিংবা বিতর্ক ছাড়াই উপস্থিত সকলের নিকট গ্রহনযোগ্য এবং অনুমোদিত পদ্ধতিতে গননা সমাপ্ত করা হয়। ইতোমধ্যে সকলেই নিদ্রাহীনতা, ক্লান্তি এবং অবসাদগ্রস্থতায় আক্রান্ত হন। অনেক নির্বাচন কমিশনার মূল পদ গুলোর গননা সমাপ্তির পর হোটেল ত্যাগ করেন। এই অবস্থায় অন্য সকল পদের গননা এবং ফলাফল বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে উপস্থিত সকলের সহযোগীতায় হৃদ্যতাপূর্ন পরিবেশে ভোট গননা চালু রাখা হয়। এসময় অনেক বেলট পেপার যত্র তত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়, এমনকি কয়েকজন প্রার্থী তাদের বেলট পেপার নিজেরাই গননা করতে সাহায্য করে পরের দিন সন্ধ্যা নাগাদ একটি সম্পূর্ন ফলাফল তৈরী করতে সক্ষম হন। উপস্থিত সকলেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেন সম্ভবতঃ বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে। সৌহার্দ্য পূর্ন পরিবেশে ১৭ই অক্টোবর সন্ধ্যার পর জনাকীর্ন হোটেল লবীতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সম্পূর্ন ফলাফল আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষনা করা হয় এবং লিখিত ফলাফল স্বাক্ষর সহকারে সকলের নিকট প্রদান করা হয়। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দী সকল পক্ষ নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়ে একে অপরের সাথে সৌহার্দ বিনিময় করে সহযোগীতার আশ্বাস প্রদান ও গ্রহন করে বক্তৃতাও প্রদান করেন। উক্ত অনুষ্ঠানে এসোসিয়েশনের বিদায়ী সভাপতি আনুষ্ঠানিক ভাবে বক্তব্য প্রদান করে সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে এবং নূতন কমিটিকে সার্বিক সহযোগীতার আশ্বাস দিয়ে নির্বাচনী কার্য্যকলাপ সমাপ্ত করেন। উপস্থিত সকলের মধ্যে আশা এবং উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। নির্বাচনের সফল, সুন্দর এবং বিবাদমুক্ত পরিসমাপ্তিতে দেশে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের মধ্যে এই নির্বাচন সম্পর্কে ইতিবাচক উপলব্ধী সৃষ্টি হয়। আয়ারল্যান্ডে প্রবাসী বাংলাদেশীদের ঘরে ঘরে স্বপ্ন এবং আকাংখার অপূর্ব সমন্বয় প্রকাশিত হয়। অনেকেই বিজিত সকল প্রতিদ্বন্দীকে বিশেষ সম্মান এবং শ্রদ্ধার চোখে দেখতে শুরু করেন। নির্বাচনী ফলাফল বিনা বিতর্কে মেনে নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশীরা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বলে অনেকে মন্তব্য করেন।
বেলট পেপার এবং বাক্সের ভাগ্যঃ
নির্বাচনী গননা এবং ফলাফল ঘোষনার পর আদর্শ পন্থায় সকল বেলট পুনরায় বাক্সে রেখে বাক্স সকলের সামনে বন্ধ করে, কোন একটি নিরাপদ স্থানে অন্ততঃপক্ষে নির্ধারিত কয়েকদিনের জন্য রেখে দেওয়াই হচ্ছে নৈতিক এবং আইনী পদ্ধতি। নির্বাচন কমিশন গনণা পরবর্তী সময়ে ছিলেন নির্লিপ্ত এবং অবসাদগ্রস্থ। যতটুকু জানা যায়, সকল পক্ষের অনুপস্থিতিতে কয়েকজনের সহযোগীতায় যতটুকু সম্ভব বেলট পেপার একত্র করে কোন এক ব্যাক্তির বাসায় এসকল বেলট পেপার অরক্ষিত অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়। সুতরাং প্রকৃতপক্ষে বেলট পেপার কিংবা বাক্স সুরক্ষিত অবস্থায় রাখতে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ন ব্যার্থতার পরিচয় দিয়েছেন। যার কারনে অরক্ষিত বেলট পেপার তার কার্য্যকারীতা হারিয়ে ফেলেছে বলেই আমি মনে করি।
ফলাফল ঘোষনার পরঃ
নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিক ঘোষনার পর সবাই ফিরে যান তাদের আপন ভূবনে। বিজয়ী প্রার্থীরা শূভেচ্ছার ডালি গ্রহন করতে থাকেন আর বিজিত প্রার্থীরা চর্বিত চর্বন শুরু করেন। নির্বাচন কমিশনের ওয়েব সাইট নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে থাকে। পত্র পত্রিকায় এবং টেলিভিশনে নির্বাচন সম্পর্কিত সংবাদ পরিবেশিত হয় এবং বিজয়ী প্রার্থীদের পক্ষে ফোনে, টেক্সটের মাধ্যমে এবং টেলিভিশনে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অভিনন্দন এবং ধন্যবাদের ঝুড়ি উজাড় করে দেয়া হয়। নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয় অচিরেই তারা ওয়েব সাইটে ফলাফল প্রদান করবেন এবং সকলের সহযোগীতা নিয়ে অভিষেক অনুষ্ঠান আয়োজন করবেন। এমতাবস্থায় শুরু হয় পর্দার আড়ালে অন্য ধরনের কর্মকান্ড।
কেরামত আলী কে কিংবা কারা?
ক্যাথলিক চার্চে সেইন্ট উপাধি প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজন হয় ন্যুনতম একটি কেরামতি (Miracle) প্রদর্শন। অল বাংলাদেশী এসোসিয়েশনের নির্বাচনে কে বা কারা কেরামতি দেখালেন কিংবা কে বা কারা সেইন্ট উপাধি প্রাপ্ত হলেন তা কিন্তু রুবেল কোথাও প্রকাশ করেন নি। তাই কেরামতি সম্পর্কে আমার ধারনা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলাম। প্রথম কেরামতি যদি কেউ দেখিয়ে থাকেন, তাহলে আমি বলব যারা ‘অল বাংলাদেশী এসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড’ নামে সারা দেশের সকল বাংলাদেশীদের জন্য একটি একক সংগঠনের ধারনাকে বাস্তবায়নের পর্য্যায়ে নিয়ে এসেছেন, তারাই দেখিয়েছেন কেরামতি। এধরনের চিন্তা ভাবনায় স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা আছে কিন্তু বাস্তবের সাথে এর যথেষ্ট অমিল আছে। তাই এ ধরনের সংগঠন যদি টিকে যায় তাহলে সেটা হবে প্রথম অলৌকিক ঘটনা কিংবা প্রথম কেরামতি। দ্বিতীয় কেরামতি ছিল নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন অনুষ্ঠান। যদিও নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে, কমিশনের প্রচুর এবং মাত্রাহীন ত্রুটি বিচ্যুতি আছে তবুও নির্বাচনী দিনের সফলতা, যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে তারা ভোট গ্রহন করতে পেরেছেন সেটা ছিল আরেকটি কেরামতি। অদক্ষ, অনভিজ্ঞ এবং অগভীর চেতনা সম্পন্ন কমিশন যে কেরামতি দেখিয়েছেন এবং সেই কেরামতি সকলে গ্রহন করেছেন নির্দ্বীধায়, এটা অবশ্যই একটি বিশেষ অলৌকিক কান্ড। তৃতীয় কেরামতি দেখিয়েছেন ভোটাররা। ৮০ শতাংশের বেশী ভোটার কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে তাদের মূল্যবান মতামত প্রদান করে অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে যে ভূমিকা রেখেছেন তা অবশ্যই একটি বিশেষ কেরামতি।
কেরামতিঃ
শব্দটি সম্ভবতঃ রূবেল সাহেব নেতিবাচক হিসাবে ব্যাবহার করে থাকবেন। সম্ভবতঃ তিনি কেরামতি বলতে ভোট গননায় ফ্রেঞ্চ দাড়ির দান খয়রাতের মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফলে অন্যায় এবং অনৈতিক প্রভাব খাটানোর কথা বলতে চেয়েছেন। এখানে আমার বক্তব্য হচ্ছে, নির্বাচন গননার সময় পক্ষ-বিপক্ষের প্রার্থীরা এবং তাদের কর্মী-সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন। যদি কোন রকম কেরামতি করা হত তাহলে ঐ সময়ে কেউ কোন প্রতিবাদ করেন নি কেন? সেই সময় কোন অভিযোগ পর্য্যন্ত কেউ করেন নি কেন? তাহলে কি তথাকথিত কেরামত আলীর নেতিবাচক কেরামতিতে সেখানে উপস্থিত সকলেই মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন? হতে পারে যারা বিজয়ী হয়েছিলেন তারা না হয় বিজয়ের আনন্দে মোহগ্রস্থ ছিলেন কিন্তু যারা বিজিত হয়েছিলেন তারা কোন যাদুমন্ত্রবলে সকল ফলাফল মেনে নিয়ে নির্বাচন কমিশন এবং বিজয়ী সকলকে অভিনন্দন জানিয়ে, সহযোগীতার আশ্বাস দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিলেন?
উপসংহারঃ
এসোসিয়েশনের এই নির্বাচন কি সুষ্ঠু হয়েছে? আমি বলব, না তা হয় নি। মোটেও হয় নি। কেন হয় নি? সুষ্ঠু না হওয়ার পিছনে অনেকগুলো কারন আছে। এরমধ্যে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের অভাব, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং পক্ষপাতিত্ব অনেকাংশে দায়ী। তবে সবচেয়ে বেশী দায়ী হচ্ছে মেধাহীন নেতৃত্ব, পরিকল্পনাহীনতা এবং সমন্বয়হীনতা।
আরও কিছু উপসর্গ এখানে কাজ করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্রতিদ্বন্দীদের মধ্যে আস্থা এবং বিশ্বাসের অভাব। যদিও এই নির্বাচন পেনেল ভিত্তিক ছিল না, কিন্তু প্রতিদ্বন্দীরা বিভক্ত হয়ে কয়েকটি পেনেল তৈরী করার ফলে দ্বীধা, দন্দ্ব প্রকাশিত হয়। এখানেও নির্বাচন কমিশন তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যার্থ হয়েছেন। কেননা তারা পেনেল ভিত্তিক নির্বাচনের আলোকেই নির্বাচনকে সাজিয়েছেন। প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দীর সাথে যোগাযোগ না করে তারাও পেনেলের প্রতিনিধি কিংবা পেনেলের নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে নির্বাচনকে সাজিয়েছেন।
মাত্রারিক্ত অর্থব্যায় ছিল নির্বাচনের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক। নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার অব্যবহিত পর জনৈক নেতৃস্থানীয় প্রতিদ্বন্দী হিসেব করে দেখিয়েছেন যে সর্বমোট নির্বাচনী ব্যয় অর্ধেক মিলিয়ন ইউরোর বেশী হবে। বাংলাদেশী মূদ্রায় হিসাব করলে ঐ অর্থের পরিমান হয় পাচ কোটি টাকার সমান। উনি অবশ্য বলেছেন এই অর্থ সর্বমোট ব্যয় অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের ব্যয়, প্রতিদ্বন্দীদের ব্যয় এবং নির্বাচনের জন্য সার্বিক সময় এবং শক্তি ব্যায়ের আর্থিক পরিমাপ সহকারে। যাই বলা হয়ে থাকুক না কেন, প্রতিদ্বন্দীরা অর্থব্যায় করেছেন প্রচুর। এই সর্বমোট অর্থ এভাবে ব্যয় না করে যদি সমাজের কল্যানে সরাসরি ব্যায়িত হত তাহলে সমাজ কি আরো বেশী উপকৃত হতে পারত না? আর যারা এই ব্যয় করেছেন, তাদের এই পরিমান অর্থ ব্যায়ের পিছনে কি কারন থাকতে পারে, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে এবং এই দায়িত্ব সমাজের সচেতন নাগরিকদের। এই অর্থ ব্যায়ের পর যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা কি এই অর্থ থেকে কোন স্বার্থ আদায় করতে পারবেন? আর যারা পরাজিত হয়েছেন, তারা কি এই অর্থের লোকসান মেনে নিয়ে উদার হয়ে আরো কল্যানে এগিয়ে আসতে পারবেন? এটাই এখন দেখার বিষয়।
এখন তাহলে কি করা উচিত? আদর্শ ব্যাবস্থায় এই নির্বাচন বাতিল করে নূতন নির্বাচনের ব্যাবস্থা করা উচিত এবং কর্তব্য। তাহলে নির্বাচন কেন বাতিল হচ্ছে না? আমার ধারনা মতে, অসম্ভব একটি নির্বাচন সম্ভব করা হয়েছে কিন্তু সুষ্ঠ করা যায় নি। এখন এই নির্বাচন বাতিল করা হলে আর কোন নির্বাচন অদূর ভবিষ্যতে আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত করা দুরূহ হবে। যদি আর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় ও, তবুও নির্বাচন সুষ্ঠ করতে পারার কোনই সম্ভাবনা বর্তমানে নেই। কেননা দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং মেধা সম্পন্ন নির্বাচন কমিশন সহসা জন্ম দেয়া সম্ভব নয়। এখন থেকে ভেবে রাখলে ভবিষ্যতের নির্বাচন সুষ্ঠ করা অনেকাংশে সম্ভব হতে পারে বলে আমি মনে করি।
এই নির্বাচনী ফলাফলে কয়েকটি পক্ষ মনঃক্ষুন্ন আবার কয়েকটি পক্ষ আনন্দিত হয়েছেন। বিভক্তির রেখা স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে। এমতাবস্থায় ফলাফল বাতিল করা হলে বিভক্তি আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হবে। আবার ফলাফল ধারন করলেও বিভক্তি স্পষ্ট প্রতীয়মান হবার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। সুতরাং এটা এক ধরনের উভয় সংকটের ব্যাপার। ছুরির দুদিকই ধারালো থাকায় উভয় দিকেই কাটবে। সুতরাং ফলাফল বাতিল, পুনর্গননা কিংবা বাস্তবায়ন কোনটাই আমাদেরকে দ্বীধাবিভক্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
তাহলে উপায় কি? বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার সর্বশেষ সম্রাট নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজিত উক্তির অন্যতম ছিল ‘উপায় নেই গোলাম হোসেন উপায় নেই!!!’ আমাদেরও এখন আর উপায় নেই। তবে গোলাম হোসেন যদি কিছু একটা করেন। আর তা হচ্ছে ভোটারদের প্রদত্ত ভোটের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সকল পক্ষ যদি এই নির্বাচনকে মেনে নেন, বিজয়ী পক্ষ যদি বিজিত পক্ষকে সম্মানিত করেন, মানসিক দূরত্ত্ব কমিয়ে আনতে পারেন আর সেই সাথে বিজিত পক্ষ যদি মহানূভবতা প্রদর্শন করে ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত হন তাহলে হয়তবা কেরামত আলীদের একটি কেরামতি ‘অল বাংলাদেশী এসোসিয়েশন অব আয়ারল্যান্ড’ এবারের মত রক্ষা পেয়ে যাবে। কিন্তু এতগুলো অসম্ভবকে সম্ভব করতে হলে যতগুলো সম্ভাবনাকে যোগ করা দরকার হবে সেটা কি কেউ করতে পারবে?