ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ’ একটি স্বাধীন ভূখন্ড হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে একথা আপামর জনসাধারণ সকলেই জানে এবং স্বগৌরবে দিনটিকে স্বরণ করে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে; বাংলাদেশ আজ স্বাধীন দেশ। সত্যিই কি তাই?

যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ হয়েছে? এদেশের সাধারণ মানুষ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছে কিন্তু এদেশের বর্তমান দালাল-রাজাকার আলবদর, যারা ক্ষমতার বলে উচ্চাসনে বসে শাসন করছে তাদের হাত থেকে কে রক্ষা করবে এদেশকে? এদেশের রাজনীতিকরা স্বাধীনতার নামে দেশকে নিয়ে জুয়া খেলায় মত্ত। তাদের কথা শুনে মনে হয়, তারাই যেন দেশকে স্বাধীন করেছে আর সাধারণ মানুষেরা কিছুই করেনি। অথচ ইতিহাস খতিয়ে দেখা যাবে তাদের অধিকাংশই যুদ্ধকালীন সময়ে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ করেনি কিংবা দেশেই ছিল না অথবা আরামে ঘরে বসে থেকেছে। তারা আজ ক্ষমতার বলে দেশকে শোষন করছে, গণতান্ত্রিক দেশের নাম করে পাঁচ বছরের জন্য গতানুগতিক পালাবদলের সরকার নানান বাহানায় এদেশের মানুষের হার ভাঙ্গা পরিশ্রমে উপার্জিত টাকা শুষে নিয়ে নিজেরা সাদা-কালো টাকার পাহাড় গড়ছে। যারা যখন বিরোধী দলে থাকে তারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় হরতাল, অনাচার, মারামারি-হানাহানি না করার প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে গিয়ে ঠিক মতই তাদের অপকর্মগুলো চালাতে থাকে। মাঝখান থেকে সরকারি এবং বিরোধী দলের চাপের মধ্য পড়ে সাধারণ মানুষ হাবুডুবু খেতে থাকে, তাদের করার কিছুই থাকে না। একটি বারের জন্যেও কোন অবস্থাতেই রাজনীতিকরা দেশের সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে না। এ সমস্ত কর্মকাণ্ড যে, দেশে কত বড় ক্ষতি ডেকে আনছে তা তারা কখনোই ভেবে দেখে না। আজকে তাদের এ ধরণের কর্মকাণ্ডে দেশ বিপর্যস্ততার সর্বনিম্নে স্তরে পৌঁছে গেছে; যার নিচে আর কোন স্তরই বাকি নেই। দুর্নীতিতে বার বার বাংলাদেশ সেরা হয়েছে তাদের কারণেই, এটাও যেন স্বগৌরবের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি।

বাংলার জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করেছে কিন্তু মুক্ত হতে পারেনি। যাঁদের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হল তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশকে প্রতি মুহূর্তে লাঞ্চিত, বিকৃত, অবহেলিত হতে হয়! শহীদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোও রাজনীতির অংশ বিশেষ। রাজনীতিকে এই একচল্লিশ বছরে কালো রাজনীতিতে পরিণত করা হয়েছে আর দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হচ্ছে প্রতিটি কাজে। দেশের রাজনীতিকদের কাছে দেশের সবকিছু জিম্মি। যে কোন কারণে বা অকারণে যে কেউ যেকোন অরাজকতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিজেদের দাপট এবং জনপ্রিয়তা বাড়ানোর অভিপ্রায়ে থাকে; কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কোমলমতি ছেলে-মেয়েদেরকে তাঁরা ব্যবহার করে হাতিয়ার হিসেবে। ৯০ তে নাম মাত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর রাজনীতিকরা যেন দেশটাকে আরো বেশি পিষে মারছে পালাবদল করে ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে।

আজকে দেশের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অনেকেই ভাত পাত পায় না! প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে এই একবিংশ শতকের স্বাধীন বাংলাদেশে? মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে তাঁরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছে একটি সত্যিকারের জীবন সন্ধানে। কে দিতে পারবে সেই সন্ধান! স্বাধীনতার এতগুলো বছর কেটে গেছে কিন্তু তাঁদের জীবনের সন্ধান মেলেনি! যাঁরা কিছুটা ভাল অবস্থায় আছেন শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে তাঁদের সংখ্যা হাতে গুনতে শুরু করলে গোনার আগেই শেষ হয়ে যাবে। অথচ অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে যারা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। সিংহ-বাঘের নামধারী/উপাধি পাওয়া গণ্য-মান্য মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের এলাকায় জোর পূর্বক ভূমি দখল, সন্ত্রাসবাদ, চাঁদাবাজি কোন কিছুই বাদ দেয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধ আর শহীদের আত্মত্যাগ আজ কেবলই কালো কালিতে মুদ্রিত কিছু হরফ। ইতিহাস বিকৃতিও চলছে হর-হামেশা সরকার বদলের সাথে সাথে। দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কলনী, ভাতা প্রদান করেই সব দায়িত্ব শেষ করে দেয়া হয়েছে; সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধা কোটা অন্তর্ভুক্ত। শুধুমাত্র এটুকু পাওয়ার জন্যই কি তাঁরা জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করেছিলেন? ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজাকার-জামাতদেরকে বগলদাবা করতেও এদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলোর একবারের জন্যেও শহীদের আত্মত্যাগের কথা মনে হয় না! ক্ষমতা পাওয়া দিয়ে কথা; ক্ষমতার জন্য রাজনীতিকরা কতটা নিচে নামতে পারে, সারা বিশ্বের জন্য বিশেষ উদাহরণ আমাদের দেশের রাজনীতিক আর রাজনৈতিক দলসমূহ।

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন যাপন করছে। পাকিস্তান এখন আমাদের জন্য আতঙ্ক নয় কিন্তু ভারত আমাদেরকে শোষণ করে চলেছে চল্লিশ বছর ধরে। ’৭১ এ শোষণের যে বীজ বপণ করেছিল আজ তা পরিণত বৃক্ষ। যার ফল সরূপ ফারাক্কা বাঁধ, বিভিন্ন নদীতে বাঁধ, টিপাইমুখে বাঁধ পরিকল্পনা, বিনা ট্রানজিটে বাংলাদেশের বুক চিরে বাণিজ্যের লর‍্যি চালিয়ে নেয়া, সীমান্তে নির্বিচারে বাংলাদেশের মানুষকে প্রাণ নেয়া; এভাবে আর কতদিন দাসত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে হবে আমরা জানি না! কারণ প্রতিবাদী হতে গেলেই মরতে হবে, গুম হতে হবে কিংবা দেশদ্রোহীর মামলায় পড়তে হব। বর্তমান সময়ে গুপ্তহত্যা, অপহরণ, র‌্যাব সংগঠিত ক্রসফায়ার নিত্যনৈমিত্তিক সংস্কৃতি বা কালচারে পরিণত হয়েছে। অভিনব পদ্ধতিতে দেশের মানুষের প্রাণ নেয়া হচ্ছে। মানুষ হয়ে মানুষকে কেমন করে নির্বিঘ্নে হত্যা করে যার কোন বিচার নেই! খাদ্যের অভাবে ডাইনোসর নিজ জাতির মাংস ভক্ষণ করে শেষ মুহূর্তে বিলুপ্ত হয়েছিল; বাংলাদেশের মানুষেরও কি তবে বিলুপ্তির সময় এসে গেল!

কে দেবে আশা, সান্ত্বনা- ‘‘দেশ মুক্ত হয়ছে, তোমরাও মুক্ত তোমরা সুখের সন্ধান পাব…।’’ কেউ নিশ্চয়তা দেবে না দেশেরর মাটিতে সুখ-শান্তিতে বসবাস করার জন্য। যেদিন মুক্তিযোদ্ধারা জীবন তুচ্ছ করে দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাঁরাই কি পেলো আর কি পেলো না সেই জবাব আমরা নতুন প্রজন্ম চাই…