ক্যাটেগরিঃ প্রতিবন্ধী বিষয়ক

 

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ শারিরীক এবং মানসিক প্রতিবন্ধী। এতো বিপুল সংখ্যক মানুষ কে বাদ দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব নয়। আর এই লক্ষ্যে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে এসব প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা প্রকৃত অর্থে অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ করা হচ্ছে না। সরকার প্রতিবন্ধীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, তাদের কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত বিভিন্ন দিক বিশ্লষণ করলে যা পাওয়া তার বাস্তব চিত্র শুধু প্রতিবন্ধী কেন সাধারণ মানুষের জন্যেও উপযুক্ত নয়। এদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। যারা দেশ পরিচালনা করে তারা দূর্নীতি করছে প্রতিনিয়ত। যার ফলে উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না কোন দিক থেকেই। বিদেশীদের কাছে দেশকে এক অর্থে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। এতো এতো সমস্যাপূর্ণ দেশের কোটি কোটি মানুষ যেখানে অবমূল্যায়ণের শিকার সেখানে প্রতিবন্ধীদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের ব্যবস্থা করা সম্ভব না হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সরকারী চাকুরিতে বিভিন্ন কোটার মধ্যে প্রতিবন্ধী কোটাটিও সংরক্ষিত। এর প্রকৃত বাস্তবায়ন আমাদের সকলের প্রত্যাশা। কিন্তু শারিরীকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলোকে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ যদি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে না দেখে তবে হাজার হাজার কোটা দিলেও প্রতিবন্ধীদের অধিকার বাস্তবিকভাবে বাস্তবায়িত হবেনা। এতো সব নীতমালা থাকা স্বত্ত্বেওশারিরীক অসুস্থ বা প্রতিবন্ধী মানুষ কে সত্যিকার অর্থেই প্রতিবন্ধী মনে করা হয় এবং অনেক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ দিতে চায়না। তাদের কে বলা হয়,”কাজটি আপনি করতে পারবেন না। আপনাদের জন্য সরকারী কোটা আছে…”। শুধু কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে নয় দেশের তথা সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিবন্ধীদেরকে স্বভাবিক মানুষ মনে করার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে।

দৃশ্যগত দিক থেকে যারা শরিরীকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ তাদেরকে প্রতিবন্ধী বলা হয় কিন্তু যেসব শারিরীক সমস্যা চোখে দেখা যায় না এবং মানুষ শরীরে সেই রোগ বা সমস্যা বহন করে তাদেরকে কেন প্রতিবন্ধী বলা হবে না? পৃথিবীতে সাত’শ কোটি মানুষ কোন না কোন ছোট বড় রোগে আক্রান্ত ।অতএব এই অর্থে সকলেই প্রতিবন্ধী। কিন্তু সকলকেতো আর প্রতিবন্ধী বলা যাবে না। তাহলে যার হাত, পা, চোখ নেই, যে মানসিক বিকারগ্রস্থ তাদেরকেও আমরা প্রতিবন্ধী না ভেবে স্বাভাবিক মানুষ মনে করতে পারিনা কেন? আর দশটি রোগের মত এগুলোও এক একটি রোগ। এই অসুস্থ মানুষগুলোকে ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটির ভেতর আটকে রাখা আর জেলখানায় আটকে রাখার মধ্যে আমি কোন তফাৎ দেখি না। একটি সম্পূর্ণ আলাদা শব্দের উপাধী দিয়ে তাদের কে আলাদা করা রীতিমত শাস্তিসরূপ। যার উচ্চ রক্তচাপ কিংবা হৃদ রোগ রয়েছে সে যদি একজন অন্ধ বা বধির মানুষকে প্রতিবন্ধী বলেন তবেতো তাকেও প্রতিবন্ধী বলা উচিত এবং প্রয়োজনে প্রতিবন্ধী সনদ প্রদান করা উচিত, কারণ ওই অন্ধ ব্যক্তিটি যেমন অসুস্থ তেমনি হৃদরোগ বহনকারীও অসুস্থ। পার্থক্য শুধু রোগের ভিন্নতায়। প্রতিবন্ধী বলা হয় তাদের কে যাদের জীবন চলার পথে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এ অর্থে অসুস্থ প্রতিটি ব্যক্তির-ই প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রকৃতির কঠিন বাস্তবতার মধ্যে এই অসুস্থ মানুষগুলো প্রাকৃতিকভাবে নিজস্ব ভারসাম্য তৈরি করে নিতে পারে নিজেরমত করে। যেমন- অনেক অন্ধ ব্যক্তি খুব চমৎকারভাবে কারো সাহায্য ছাড়াই চলতে পারেন। যার দুটি পা নেই সে-ও চলতে পারে নিজস্ব সৃষ্ট কোন এক পদ্ধতিতে। তাই এ ধরণের অসুস্থ মানুষগুলো কে প্রতিবন্ধী শব্দ দিয়ে চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে আলাদা করে অমাবিক কাজটি নাইবা করলাম। যে মানুষটি কে প্রতিবন্ধী বলা হয় তার নিশ্চই খুব কষ্ট হয়! মানসিকভাবে সে ধরেই নেয় যে, সে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ। স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে যতই বলা হোক না কেন এই অসুস্থ মানুষগুলোর মনের বিশেষ স্থানটিতে প্রতিবন্ধী উপাধীটি ক্ষতের মত পীড়া দেয় আজীবন। তার মনের মধ্যে বাজতে থাকে, ” আমি তোমাদের মত নই, আমি প্রতিবন্ধী! আমি ভিন্ন মানুষ”। আমরা এই মানুষগুলোর মনের ওই কষ্টটা কি উপলব্ধী করতে পারি কোনদিন? শরীরের ক্ষত যতটুকু না কষ্ট দেয় তার থেকে অনেক অনেক গুণ বেশি তীব্র মানসিক কষ্ট। একজন মানুষ যদি মানসিকভাবে প্রশান্তি না পায় তবে সে কোন কাজেই দক্ষতা প্রকাশ করতে পারবে না। যারা আজ অসুস্থ তারা অনেকেই সুস্থ হবে না কিন্তু সমাজের মানুষের মানসিতা পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব। যারা অসুস্থ মানুষগুলোকে মানুষ মনে করতে পারে না তারাই প্রকৃত অর্থে প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ।

আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি- বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, অফিস, মার্কেটসহ অনেক জায়গাতেই প্রবেশের জন্য সিড়ি তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ মনুষের কথা চিন্তা করা হয় না। সিড়িগুলো হয় অপেক্ষাকৃত উঁচু কিংবা রেলিংবিহীন। যানবাহনগুলোও প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। এজন্য সকলের সচেতনতা জরুরি। মানুষ জন্মের পর থেকেই প্রাকৃতিকভবে আত্মনির্ভশীল হওয়ার চেষ্টায় নিমগ্ন থাকে। যতটুকু সম্ভব অন্যের সহযোগিতা ছাড়াই প্রতিটি পথ অতিক্রম করতে চায়। প্রতিটি মানুষ স্বাধীন হতে চায়। যানবাহনে ওঠার জন্য যদি কর্তৃপক্ষের স্বদিচ্ছায় প্রত্যেকটা বাহনে বাড়তি একটি করে কাঠের সিড়ি এবং হুইল চেয়ার ওঠানোর জন্য র্যাম্প রাখা যেতে পারে। তাতে দেখা যাবে, অসুস্থ মানুষগুলো স্বাভাবিকভাবেই সাহায্য ছাড়াই চলাফেরা করতে সক্ষম হবে। এতে করে তাদের মনের মধ্যে আর কোন কষ্টবোধ থাকবেনা। উন্নত দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, শারিরীকভাবে অসুস্থ মানুষেরাই সর্বাপেক্ষা সুখী জীবন-যাপন করে। কারণ সেসব দেশে রাষ্ট্রীয় সকল অবকাঠমোগত নীতি সকল জনগণের জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়।

শারিরীক বা মানসিকভাবে অসুস্থ দরিদ্র মানুষগুলোর অবস্থা আরো ভয়াবহ। রাস্তায় বের হলেই তাদের অসহায় মুখগুলো ভিক্ষা নিবেদন করে। এটাই তাদের জীবিকা। অধিকাংশ ভিক্ষুক মানুষগুলো বিভিন্ন চক্রের সাথে জড়িত। কোন কোন চক্র শিশুদের কে শারিরীকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করার পর রাস্তায় ছেড়ে দেয় ভিক্ষা করার জন্য। (হাত হারানো ভিক্ষে চাইতে আসা আনুমানিক ছয় থেকে আট বছর বয়সী ভিক্ষুক শিশুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,” তোমার কি হয়েছিল?” উত্তর,” শুনছি অনেক ছোটবেলায় ট্রেনে কাটা পরেছিলাম, আমার মনে নাই”। একজন নয়, বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে একই উত্তর পেয়েছি। বিষয়টি এমন হতে পারে যে শিশুগুলো শেখানো বুলি আওড়াচ্ছে। কারণ তারা তাদের ছোটবেলায় ছোট্ট শরীর নিয়ে ট্রেনে কাটা পড়লে জীবিত থাকার কথা নয়। দুই বা তিন বছর বয়সের দরিদ্র অপুষ্ট শিশুটি যদি ট্রেন দূর্ঘটনায় পতিত হয়ে থাকে তবে তখন তার হাত কিংবা পা এতটা বড় ছিল না যে, ট্রেন তার কনুই বা কব্জিটুকু অথবা হাঁটুর নিচের অংশটুকুই কেবল কেটে নিয়ে যাবে। ছোট শরীরটা ট্রেনের সাথে পুরোপুরি স্পর্শ করলেই এটা সম্ভব। আর যদি তাই হয় তবে শিশুটির কি ওইটুকু কাটা পরে বেঁচে থাকা সম্ভব? ট্রেনের সাথে অবুঝ শিশুটির স্পর্শ মানে কি হতে পারে তা বোধ করি বলে না দিলেও সবাই সহজেই বুঝতে পারছে। নিশ্চই কোন চক্র ছোটবেলায় তাদের কারো হাত কিংবা পা কেটে দিয়েছে ভিক্ষাবৃত্তি জন্য।) শারিরীক সমস্যা প্রদর্শন করলে ভিক্ষার টাকা বেশি পাওয়া যায়। এটা এখন বেশ জমজাট একটি ব্যবসা। এছাড়াও আরো একটি জমজমাট ব্যবসা বাংলাদেশে প্রচলিত তা হচ্ছে বিভিন্ন এনজিও প্রতিবন্ধীদের প্রদর্শন করে তাদের উন্নয়ন এবংকর্মসংস্থানের জন্য বিদেশী দাতাদের কাছ থেকে অর্থ পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একেবারেই যে শারিরীক অসুস্থ মানুষগুলো অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা উন্নত হয়না তা নয়। তারা নতুন করে বাঁচার তাগিদ অনুভব করে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যদি সকল প্রতিবন্ধী এবং অপ্রতিবন্ধী মানুষের মেধা আর শ্রম কে যার যার সক্ষমতা অনুযায়ী কাজে লাগানো হয় তবে দেশ উন্নত হতে বাধ্য। দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। এখন দরকার অর্থনীতির সঠিক পরিকল্পনা। আর এজন্য দেশের সর্বস্তরের দূর্নীতি, রাজনৈতিক সংঘাত দূর করে সকলকে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। এমনকি বিচার ব্যবস্থাতেও আনতে হবে গতিশীলতা। বাস্তবায়ন করতে হবে সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অভিন্ন ”মানব নীতি”। বেরিয়ে আসতে হবে ট্রেডিশনাল গণ্ডির ভেতর থেকে। দেশে সবাই যখন সমানভাবে সকল সুবিধা ভোগ করতে পারবে তখন আলাদা করে প্রতিবন্ধীদের কাজ পাওয়ার জন্য কোটা সংরক্ষণসহ বাড়তি কিছু করার প্রয়োজন হবে না। কারণ তখন সবাই সম অধিকারভূক্ত হবে। তা না হলে, বাংলাদেশ আজীবন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকবে…..

http://www.dainikazadi.org/annandan_details.php?news_id=1888 ( দৈনিক আজাদী)