ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

যখন খুব ছোট… একটু একটু কথা বলতে শুরু করেছি তখন মামনি আমাকে নানা ধরণের ছড়া-কবিতা শেখাতেন ছোট্ট আমার কুটরিখানি লতায়-পাতায় ঘেরা…/আয় আয় চাঁদ মামা…/ঐ দেখা যায় তাল গাছ… আরো কত ধরণের ছড়া-কবিতা ! আজও মনে পড়ে ! মামনি আমাকে নানা রকম গল্পও শোনাতেন। শীতের দিনে লেপের নিচে শুয়ে চুপটি করে গল্প শুনতাম…গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম…। আমাদের বাসায় একটা মেয়ে থাকত । সারাদিন কাজ করে যখন সে শুতে যেত তখন আমি তার পাশে শুয়ে গল্প শুনতাম । প্রতি রাতে একই গল্প শুনতাম । রাজহাসের গল্প…। আমি মুগ্ধ হৃদয়ে সেই গল্প শুনতাম ! একই গল্প…অথচ আমার কোনদিন বিরক্ত লাগেনি ।

মাঝে মাঝে আমার দাদীর কাছে গল্প শুনতাম , ছড়া শুনতাম । যখন একটু বড় হলাম তখন আব্বুর কাছে গল্প শুনতাম । ৭১’ র মুক্তিযুদ্ধের গল্প ! তার কাছ থেকে শুনতাম যুদ্ধের ইতিহাস । তিনি কিভাবে যুদ্ধ করছেলিনে সেই ইতিহাস । একদিন গল্পে গল্পে জানলাম ৫২’র ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস । আমাদের বাংলাভাষার জন্যেও আমাদের র্পূবপুরুষেরা যুদ্ধ করছেলিনে । দিয়েছেলিনে প্রাণ !

আব্বুর সাথে খুব ভোর বেলায় শহীদ মীনারে যেতাম । কিযে ভাল লাগত তখন ! দেখতাম শহীদ মীনার ফুলে ফুলে ভরা…! আমার ছলেবেলো খুব বেশিদিন আগের নয় । এখনও রয়েছে সেই ভালোলাগা…রয়েছে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ ।

আবৃত্তি ও বাংলাভাষার উচ্চারণের উপর দু’বার প্রশক্ষিণ নিয়েছিলাম। আর তখন আরো বেশি উপলব্ধি করেছি বাংলাভাষার প্রতি আমাদের কতটা দায়বদ্ধতা । অথচ আমরা ভাষা কে অবহেলা করি প্রতিনিয়ত। এরপর থেকে ভুল করে যদি একটি উচ্চারণ ভুল করি তখন খুব কষ্ট হয় । কিন্তু এটা ঠিক, সবসময় সব জায়গায় সঠিক উচ্চারণে কথা বলা হয়ে উঠে না । এখন র্সবত্র ভাষার বিকৃত র্চচাটা খুব বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে কয়েক বছর যাবৎ টিভি নাটকগুলাতে , এফএম রেডিও তে (এখন কিছুটা কম ) ।টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে র্বতমানে যে সব ধারাবাহিক নাটক প্রচার হয় সেগুলোর অধিকাংশই পার্শ্ববর্তী দেশের ধারাবাহিক পদ্ধতি নকল করে বানানো হচ্ছে আর ব্যবহার করা হচ্ছে অশুদ্ধ বাংলাভাষা । এই মাধ্যমগুলো মানুষ সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করে । এখানে এরকম র্চচা কেন ? এই প্রশ্ন করলে যুক্তি -র্তক বেঁধে যাবে । সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনচিত্র তুলে ধরাই নাকি তাদের মূখ্য উদ্দশ্যে । পারতপক্ষে তাদের যুক্তি অকাট্য নয় । কারণ মানুষ এখন যান্ত্রীক । প্রমিত ভাষায় নাটকের অভিনেতারা কথা বলতে থাকলে , সারাদিনের কাজের শেষে টিভি দেখতে বসা র্দশকটি যে বিরক্ত হয়ে চ্যানেল পরিবর্তন করবেন সেটা বলার অপক্ষো রাখে না ।কিন্তু প্রত্যেকটা অনুষ্ঠান যদি সঠিক বাংলাতে তৈরি হয় তবে সাধারণ মানুষের কাছে ভাষার সঠিক ব্যবহার গুরুত্ব পেতে বাধ্য। আর এজন্য শ্রদ্ধেয় নাট্যকার /পরিচালকবৃন্দ এবং অনুষ্ঠান পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকা জরুরী ।

বর্তমানে অনেক নির্মাতাই আঞ্চলিক বা গ্রামের ভাষায় নাটক তৈরি করেন । এটার একটি নির্দিষ্ট দিক আছে । সাহিত্য এই পন্থা কে সর্মথন করে । কেননা এতে করে অঞ্চলভেদে ব্যবহৃত ভাষাকে তুলে ধরা যায়, প্রকৃত খেঁটে খাওয়া মানুষগুলোর হৃদয়ের কাছাকাছি যাওয়া যায় তাঁদের প্রতি ভালাবাসা / শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করা যায় ।

আমরা আঞ্চলিক ভাষা কে শ্রদ্ধা করি । প্রমিত ভাষার সাথে আঞ্চলিক ভাষার কোন বিরোধ নেই । যারা আঞ্চলিকতা পছন্দ করেন তারা আঞ্চলিকতায় -ই থাকুন , আপত্তি নেই । কেউ আপত্তি করেনওনি কোনদিন । কিন্তু একবার ভেবে দেখুনতো- পৃথিবীতে বাংলা একমাত্র ভাষা যার প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করতে হয়েছিল ! তাহলে আমরা কেন শুদ্ধ সুন্দর প্রমিত ভাষায় কথা বলব না ? আমাদের ভাষাকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ থেকেই আমাদের এটা করা উচিত। অনেকেই বলবেন, ”কথা বলাটা আমার ব্যক্তি স্বাধীনতা । আমি যদি আমার নিজের ইচ্ছে মত নিজস্ব উচ্চারণে কথাই বলতে না পারলাম তাহলে স্বাধীন হলাম কেন ?” চমৎকার যুক্তি । অকাট্য করছি না । আমি শুধু বলতে চাচ্ছি একটু উপলব্ধি হোক আমাদরে । একবার শুধু ভাবতে বলছি ‘৫২ কথা…..

ওই উপলব্ধিটুকুই অনেক বড় ব্যাপার । এটুকুতেই হয়ত শহীদের আত্মা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে । এখন যখন দেখি আমার বয়সী কোন ছেলে-মেয়ের মধ্যে বাংলাদেশ আর বাংলাভাষার প্রতি অনুভূতি কম তখন ভীষন কষ্ট হয় ! পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে র্বতমান সমাজ ! এখনকার পিতা-মাতার মধ্যেও ছেলে-মেয়ের হৃদয়ে দেশ ও ভাষার প্রতি মমত্ববোধ গড়ে তোলার কোন প্রয়াস নেই বললেই চলে । ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ছাড়া অন্য কোথাও পড়ানোর কথা অধিকাংশ মায়েরা ভাবতেই পারেন না । তারা বেশ র্গব করে বলেন, আমার বাচ্চাটাতো ইংলিশ ছাড়া কথাই বলতে পারে না। আমি একটা সাংস্কৃতিক বিদ্যলয়ে বেশকিছুদিন শিক্ষকতা করেছি । ওখানে একদিন এক ছাত্র (তখন সে ইংরেজী মাধ্যম বিদ্যালয়ে পড়ত) আমাকে বলেছিল, দিদিমণি আমি বাংলায় লিখতে পারি না…আমাদরে একটা বাংলা পরীক্ষা দিতে হয়…এটা আমার কাছে সবচেয়ে বিরক্ত লাগে । বাংলা আমার সবচেয়ে অপছন্দ… এই জাতীয় নানা ধরণের কথা সেদিন তার মুখ থেকে শুনেছিলাম । তবে আনন্দের কথা হচ্ছে পরর্বতিতে তাকে তার বাবা-মা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তী করিয়েছে (কারণ পরবর্তীতে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তাকে বাংলায় পড়তে হবে) এবং তার মধ্যে বাংলাপ্রীতীও জন্মেছে ।কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তন হওয়া জরুরী। ইংরেজী ছাড়া বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব। তাই সর্বত্র একই শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত। এতে করে এক ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে (যমন-বাংলা মিডিয়াম পরিবর্তন করে ইংলিশ কিংবা ইংলিশ পরিবর্তন করে বাংলায় অথবা মাদ্রাসা থেকে বাংলা বা ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তী হওয়া) অন্যটাতে যাওয়ার দরকার হবেনা।

এযুগের শিশুরা কম্পিটার গেমস্ , র্কাটুন ছাড়া আর কিছুই বোঝে না । তাদের খোলা মাঠে খেলার সময় নেই । তবে একথাও সত্যি যে, এখন খোলা জায়গার অনকে অভাব ! কোন কোন ইংরেজী মাধ্যম বিদ্যালয়ে বাংলায় কথা বললে কঠিন শাস্তি দেয়া হয় । বাবা-মায়ের সাথে ছেলে-মেয়েরা বিদেশী সিরিয়াল, সিনেমা দেখতে বসে ।অথচ বাবা-মা তাদের কে বারণ করাতো দূরে থাক বরং ওসব অনুষ্ঠান নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণে মনোনিবেশ করে । দুঃখজনক !

আমার এক বন্ধু বেশ র্গব করে একদিন বলেছিল-” বিদেশী গান ছাড়া অন্যসব গান আমার কাছে বোরিং লাগে ।” আমরা সব ভাষার অনুষ্ঠান দেখবো, শেখার থাকলে শিখব। এতে কোন বিরোধ নেই কিন্তু নিজের ভাষাকে অশ্রদ্ধা বা অবহেলা করে নয়। একুশের বই মেলায় যাওয়াটাও অনেকের কাছে ফ্যাশন। আমরা চাই নিজের ভাষা তথা সংস্কৃতিকে ঊর্ধে রেখে প্রকৃত ভালোবাবোধ গড়ে উঠুক সবার মধ্যে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাত থেকে নিজেকে, নিজের দেশকে বাঁচানো প্রত্যেক সচেতন মানুষের দায়িত্ব।

প্রচন্ড কষ্টে মাঝে মাঝে মনে হয়… য়াঁরা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন স্বাধীনভাবে বাংলাভাষায় কথা বলার জন্য, গান শোনার জন্য, মায়ের মুখ থেকে গল্প শোনার জন্য… তবে কি আজ সব বৃথা হতে শুরু করেছে …!?

র্বতমানে বেশকিছু অনলাইন ভিত্তিক বাংলা ব্লগ লেখা-লিখির জগতে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে । অনেকেই খুব সহজে নিজের লেখাটি ব্লগের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে । আমিও ব্যাক্তিগতভাবে বেশকিছু ব্লগে নিবন্ধন করেছি লেখা চর্চার জন্য । ব্লগে অনেকের লেখা পড়ি । মন্তব্য করি। কথা বলতে গেলে অশুদ্ধ উচ্চারণ (ঠিক না হলেও) ঠিক আছে কিন্তু লিখতে গিয়ে কেন অশুদ্ধ বাংলা লেখা হয় সেটা আমার বোধগম্য নয় (এখানে বানান ভুল করার বষিয়টি উল্লখে করছি না )।

কোন=কুন, মন চায়=মুন্চায়/মঞ্চায়, আফসোস=আপসুচ/আপচুস, এমন=এমুন ইত্যাদি আরো অনেক ব্লগীয় শব্দগুলোর ব্যবহার হর-হামেশা চোখে পড়ে । শ্রদ্ধেয় ব্লগার বৃন্দ এগুলো লিখেন ব্লগ পোস্টগুলোতে ।এটা যেন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে । ব্লগ ফ্যাশন…।অনেকের এরকম মজার লেখাগুলো অনেকেই খুব উপভোগ করে যা আর বলার অপক্ষো রাখে না । মন্তব্যের ঝড় ওঠে যায় । অথচ একটি ভাল লেখা পড়তে অনেকেরই কতই না অলসতা ।

কেনরে ভাই, আমরা যারা ব্লগীং করি আমরা কেন এরকম লিখব ? বলবেন- ” এগুলোতো মজা করার জন্য লেখা হয় ।”

কিন্তু এই মজার লেখাগুলো লিখতে লিখতে একসময় হয়ত এগুলো স্থায়ী ভাষা র্চচায় পরিণত হয়ে যাবে। যা আমাদের কাম্য নয়। র্বতমানে বাংলা ভাষা যে র্পযায়ে আছে তা অনেক বছরের পরিবর্তনের ফল । আধুিনক , সুন্দর, সহজ এবং সাবললি । এর থেকে আরো বেশি ক্ষুদ্র হলে তখন হয়ত দেখা যাবে , প্রতিটি শব্দ পরিণত হবে এক একটি র্বণে । আমরা এরকমটি আশা করি না ।

ঘুণ ধরেছে ৫২’র রক্তময় ম্মৃতিতে ; ঘুণ ধরেছে

স্বাধীনতায় ; কংক্রিটের শহীদ মীনারে ;

নগ্নপায়ে হাঁটা প্রভাত ফেরীতে

ঘুণ ধরেছে চেতনায়…।

আমাদের চেতনা জাগ্রত হোক । আমাদের ইচ্ছেশক্তি, আমাদেরকে সুন্দর পথে নিয়ে যাবে । হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিলে দেশ আর জাতি আজীবন মুখ থুবরে পড়ে থাকবে । প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে মনোবল নিয়ে দাঁড়ালে ঘুণপোকা কে খুব সহজেই মেরে ফেলা সম্ভব । পরিবার, সমাজ, বিদ্যালয়, বিনোদন, পেশা ভিত্তিক কার্যক্রম, রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যেকটি পর্যায়ে শুদ্ধ ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত হলে নতুন প্রজন্ম ভাষার গুর্ত্বুকে উপলব্ধি করতে পারবে।