ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

মানুষ তার নিজের ভুলগুলোর ব্যাপারে সবসময়ই অসচেতন। কখনই নিজের ভুল স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়। ভুল করার পর আত্মসমর্পণ করার মানসিকতা নেই বললেই চলে। কিন্তু নির্দ্বিধায় অন্যের ভুলগুলো নিয়ে গুজব বা সমালোচনা করাটা মানুষের স্বহজাত প্রবৃত্তি হয়ে গিয়েছে।

আমরা সবসময় সরকারের দোষ-ত্রুটির কথা বলি কিন্তু আমাদেরও যে অসংখ্য দোষ-ত্রুটি তা খতিয়ে দেখার অবকাশ দেই না। সকালে ঘুম থেকে জেগে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা কি কি দোষ-ত্রুটি করি তা যদি প্রতিদিন দেখার চেষ্টা করি তবে আমরা আমাদের শোধরাতে পারব খুব সহজেই।

ঘুম থেকে জেগে হাত-মুখ ধুতে গিয়ে আমরা কল ছেড়ে রাখি। প্রতিবার পানি নেওয়ার সময় আমরা কি পানির কলটি বন্ধ করি? অধিকাংশই করি না। এমনকি মাঝে-মধ্যে দেখা যায় কলটি ভালভাবে বন্ধও করা হয়না। এভাবে দৈনন্দিন কাজে আমরা যতবার পানি ব্যবহারের জন্য পানির কল ছাড়ি তাতে তিন ভাগের এক ভাগ পানি অপচয় হয়। যা পানির অভাব দিন দিন বাড়াচ্ছে। ভূ-গর্ভের পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় এই অভাব সামনের দিনগুলোতে আরো ভয়াবহ হতে যাচ্ছে। তাছাড়া নদীতে পলি পড়ার কারণে নদীগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। নদীতে বর্জ ফেলার কারণে নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ক্রমান্বয়ে বিশুদ্ধ পানির সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। যার ফলে প্রকৃতির বিরুপতা দিন দিন হুমকি হয়ে দাড়াচ্ছে মানুষের জন্য। শহর অঞ্চলে শিল্প কারখানা থাকায় এসিড বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে। এসিড বৃষ্টি মানব জীবনে কতটা মারাত্মক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে চলেছি এই আমরাই। আমরা ভুলতে বসেছি,‘‘পানির অপর নাম জীবন’’ আর এই জীবন রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

আমরা বিদ্যুৎ এবং গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সহনশীল নই। একটি দেশলাই কাঠি বাঁচানোর জন্য আমরা যে গ্যাস জ্বালায়ে রাখি সে গ্যাস তৈরি হতে কত কোটি বছর লেগেছে তা কি আমরা ভেবে দেখি কখনও? অপ্রয়োজনে জ্বালিয়ে রাখা লাইট, ফ্যান কি আমরা একটুখানি হাতটা বাড়িয়ে বন্ধ করে দিতে পারি না? মোটর গাড়ির ইজ্ঞিন অপ্রয়োজনে চালু করে না রেখে যতটা সম্ভব বন্ধ করে দিতে পারি না? আমরা যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্রত্যেকটা জিনিসের ব্যবহারে অপচয় রোধ করি তবে শক্তি কতটা বেঁচে যায় তা আমাদের ভেবে দেখা উচিৎ আমাদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে।

মাইক, হাই ভলিমড মিউসিক্যাল সাউন্ড সিস্টেম, উচ্চ হাইড্রোলিক হর্ণ বাজিয়ে শব্দ দূষণ সৃষ্টি করছি প্রতিনিয়ত। যার ফলে আমাদের শ্রবণ শক্তি কমে যাচ্ছে। বড় বড় শব্দ দূষণ সৃষ্টিকারী উৎসগুলো বন্ধ করা ব্যক্তিগতভাবে সম্ভব না কিন্তু এসব সাধারণ উৎসগুলোর প্রতি যদি আমরা নজর দেই তবে কতটা শব্দ দূষন কমে যাবে তা আমাদের ভেবে দেখা উচিৎ।

হাতের পাশে ডাস্টবিন থাকলেও আমরা যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলি, রাস্তায় চলতে গেলে যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলি, যেখানে সেখানে কফ-থুতু ফেলি, এগুলো যে পরিবেশ দূষণের জন্য এবং মানুষকে নিত্য-নৈমিত্তিক অসুস্থ করে তোলার জন্য কত দ্রুত ভাইরাস-ব্যকটেরিয়া ছড়ায় তা আমরা কখনোই ভেবে দেখি না।

অবাধে গাছ কেটে পরিবেশে অভারসাম্য পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছি। আমরা নিজেদের বাড়িতে অবাধ রোদ প্রবেশে জন্য কিংবা অন্য কোন প্রয়োজনে গাছ কেটে নিজের জীবন ব্যবস্থা কঠিন করে তুলছি কিন্তু বোঝার চেষ্টা করছি না যে আমরা আমাদের গলায় ছুরি বসাচ্ছি, বাড়াচ্ছি প্রাকৃতিক দূর্য়োগ। বিশ্বব্যপী গাছের অভাবে কার্বণ ডাই অক্সাইড সহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাসীয পদার্থের পরিমাণ বাড়ার কারণে ওজন স্তর ফুঁটো হয়ে যাচ্ছে, বিশ্ব উষ্ণায়ন বাড়ছে, (এখানে একটি বিষয উল্লেখ না করে পারছি না, সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করেছে অপেক্ষাকৃত বেশি উষ্ণ অঞ্চলের মানুষ বেশি বুদ্ধিমান। এখানে গরম প্রধান উষ্ণতাকে বোঝানো হচ্ছে। এতে করে মানুষের বিশ্ব উষ্ণয়ন কমানোর চেষ্টা কতটা কমে যাবে আমি সেই শংকায় শংকিত!) গলছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের বরফ। এতে করে সমুদ্রের পানি বেড়ে গিয়ে অতি শীঘ্র নিচু অঞ্চলগুলো ডুবে যাওযার হুমকিতে দোদুল্যমান। কিন্তু আমাদের তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

রাস্তায় যানজট, এটি নিত্য দিনের চিত্র। কিন্তু অমরা যদি একটু চেষ্টা করি তবে সরকারের মুখপানে না তাকিয়ে নিজেরাই অনেকটা সমাধানের পথ বের করতে পারি। রাস্তায় তাকালে সবার আগে যে ব্যপারটি লক্ষ করা যায় তা হলো সব যানবাহন এলোমেলোভাবে চলে। ওভারটেকিং বা একটি আরেকটিকে অতিক্রম করা ছাড়া যেন গাড়ি চালাতেই পারেনা। এই ওভারটেকিং প্রবণতাই জ্যাম বাঁধার প্রধান কারণ। ওভারটেকিং করার সময় রিকশার ক্ষেত্রে খুব কমন চিত্র হচ্ছে একটা আরেটার সাথে বেজে যায় আর ওটা ছাড়াতে গিয়ে পেছনে বিশাল জটলা তৈরি হয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যেই। তাছাড়া আরেকটি বিষয় লক্ষনীয়, যারা উচ্চবিত্ত পর্যায়ের মানুষ তারা বাড়ির প্রত্যেকে রাস্তায় একটি করে গাড়ি নিয়ে বের হয়। তারা যদি এভাবে গাড়ি বের না করত তবে প্রতিদিনের এতো অসহ্যকর জট কাউকেই স্পর্শ করতে পারত না আর বায়ু দূষণও কিছুটা কমে যেত।

ওভারটেকিংএর কারণে সড়ক দূর্ঘটনা আরেকটি প্রধান কারণ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে তাজা প্রাণগুলো। তবে সড়ক দূর্ঘটনার জন্য সাধারণ পথচারীরাও অনেক বেশি দায়ী। ব্যস্ত রাস্তায় দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া, ওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা পথচারীদের মধ্যে খুব বেশি লক্ষণীয়। আর তখন যদি কেউ সড়ক দূর্ঘটনায় পতিত হয় তবে পুরো দোশ চালকের।

গ্রাম থেকে কাজের খোঁজে শহরে আসার প্রবণতা বেশ পুরোনো ব্যপার। দরিদ্র দেশে মানেই অভাব আর অভাব। কিন্তু মানুষের ইচ্ছে শক্তি মানুষকে সাফল্যের দ্বারে পৌঁছে দিতে পারে সহজেই। গ্রামে যারা বসবাস করেন তারা যদি সমবায়ের ভিত্তিতে কোন অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন তবে অভাব অনেকাংশেই কমিয়ে দেওয়া যায়।

পোনা মাছ, ঝাটকা মাছ নিধন না করে ওগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দিলে দেশে বিশাল পরিমাণ মাছের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভম। কেনাকাটা করতে গিয়ে অমরা অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনি, বেশি টাকা দিয়ে বিদেশী পণ্য কিনি। দেশী পণ্য কেনার জন্য আমরা সামান্য বেশি টাকা খরচ করতে নারাজ। এছাড়া আমরা সবচেয়ে বেশি যে অকাজটি করি তা হলো, পণ্য কেনার পর ক্যাশ মেমো গ্রহণ করিনা এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আর আমরাও বিক্রেতাদেরকে রাজস্ব ফাঁকি দিতে সাহায্য করছি অথচ ভেবে দেখি না যে এই টাকা দেশের কল্যাণের জন্যই ব্যয় করা হয়।

আমরা সর্বদা সকল ব্যপারে সরকারকে দোষ দেই কিন্তু সরকার নির্বাচনের সময় অন্ধের মত আচরণ করি। সামান্য টাকার বিনিময়ে আমরা অনেকেই আমাদের ভোট বিক্রি করি। তখন আমাদের বিবেক একটুও বাঁধা দেয় না। আমাদের অপকর্মের ফসল হিসেবে জালিম শাসক প্রতিষ্ঠিত হয় অর্থাৎ জালিম শাসক আমাদেরই কর্মফল মাত্র। অসুস্থ রাজনীতিতে তরুণ সমাজ নিজেদেরকে জড়িয়ে অপরাধ প্রবণতার সৃষ্টি করছে। আমরা যদি অসৎ রাজনীতিবিদদের কাছে না ঘেষি, তাদের অসৎ কার্যক্রমে (টাকার বিনিময়ে) সমর্থণ না দেই তবে রাজনীতিবিদেরাও অপরাধ করানোর জন্য কাউকে আর খুঁজে পাবে না এবং নিজেরাও জনশক্তির অভাবে নিজেদের শুধরে নেবে।

দোষ আসলে আমাদেরই। আমরা যদি ভাল হই তবে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ভাল হতে বাধ্য। ছোট ছোট ভুলগুলো যদি আমরা শোধরাই তবে কত বিরাট পরিবর্তন হবে তা আমাদের ভেবে দেখা উচিৎ। আসুন আমরা আগে নিজেরা বদলাই…