ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

‘গম্বুজ’ ইংরেজিতে ‘Dome’ যা ল্যাটিন ‘Domus থেকে উদ্ভূত । স্থাপত্যের এমন একটি বৈশিষ্ট্য যে দেখতে অনেকটা অর্ধ গোলকের মতো । ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ভবনে গম্বুজের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। স্থাপনার ছাদ হিসেবে কলাম বা স্তম্ভের উপর নির্মিত হয় ‘গম্বুজ’ । আকার ও নির্মাণ শৈলী ভেদে ‘গম্বুজ’ অনেক রকমের হয় , ভারতবর্ষের গম্বুজ গুলো অধিকাংশ ‘পেঁয়াজ আকৃতির’। ‘গম্বুজ’ ভবনকে অধিকতর উচ্চতা প্রদান করে , ফলে স্থাপনার ভিতরে বায়ু চলাচল ব্যবস্থা এমন রূপে প্রবাহমান হয় , গরম কালেও এর অভ্যন্তর থাকে শীতল । ভবনের রুফ স্লাব গম্বুজাকৃতি হলে কাঠামোটির ওজন অপেক্ষাকৃত কম হয় এবং সম্পূর্ণ স্ট্রাকচারটি অধিক সহনীয় হয় যা ভবনটিকে একটি কার্যকরী সুসংহত স্থাপনায় পরিণত করে । ‘গম্বুজ’ আচ্ছাদিত স্থাপনায় যখন কোন বক্তব্য বা নির্দেশনা প্রদান করা হয় , সেই ভয়েস খুব সুস্পষ্ট হয় এবং ভবনের যে কোন স্থান থেকে সহজেই তা শোনা যায় । স্থাপনায় ‘গম্বুজ’ থাকলে এর চূড়া অনেক দূর থেকে দৃশ্যমান হয় । এটি এমন একটি স্থাপত্য রীতি যা ধর্মীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তোলে এবং তাকে সনাক্ত করা সহজতর হয়। ‘গম্বুজ’ দ্বারা ভবনটি একটি ভাবগম্ভীর সুপ্রশস্থ এবং শক্তিশালী ম্যাসিভ ফর্মে পরিবর্তিত হয়, যা মানব মনে স্রষ্টার অসীম শক্তির প্রকাশ কে নির্দেশনা দেয়। প্রচলিত বিশ্বাস , ‘গম্বুজ’ আচ্ছাদিত ধর্মীয় স্থাপনা মহান সৃষ্টিকর্তার পরম পবিত্রময় নিবির এক ছায়াতল যা স্রষ্টার একক আধিপত্য কে স্বীকার করে । ইহকালের পাপ শোক দুঃখ অশান্তি থেকে মুক্তি এবং পরকালে স্বর্গালোক প্রত্যাশায় এখানে প্রার্থনায় সমবেত হয় বান্দারা । স্থাপনার কেন্দ্র কিংবা প্রযোজ্য অংশে ‘গম্বুজ’ স্থাপিত হলে সেটি হয়ে যায় স্থাপনার মূল ফোকাল পয়েন্ট , হয়ে যায় শক্তির এক প্রতিকায়িত রূপ ‘সিম্বল অব পাওয়ার’।

ab
গম্বুজে’র প্রথম ব্যবহার দেখা যায় মেসোপটেমীয় সভ্যতায়, পরবর্তীতে পার্সিয়ান রোমান এবং চাইনিজ স্থাপত্য রীতিতেও ধর্মীয় ভবন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গুলোতে ‘গম্বুজ’ এর বহুবিধ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ধীরে ধীরে তা পশ্চিম ইউরোপ আরব এবং ভারতীয় উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে। তবে গির্জা এবং মসজিদে ‘গম্বুজ’ থাকতেই হবে , ব্যাপারটি সে রকমও নয় , অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এর ব্যত্যয় দেখা যায়।
‘দ্যা চার্চ অব রতুন্দা’ । প্রাচীনতম মন্দির যার গম্বুজটি ইট দ্বারা নির্মিত। গম্বুজের ব্যাস ৮০ ফিট । ৩০৬ খৃস্টাব্দে রোমান রা এটি নির্মাণ করেন । এটি গ্রীসের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ‘থ্যাসালোনিকি’ তে অবস্থিত। । অনেকের মতে এটি পৃথিবীর সবচাইতে পুরনো চার্চ । প্রায় ১২০০ বছর অধিক সময় কাল এটি একটি চার্চ ছিল , পরবর্তী সময়ে অটোমান সম্রাট জয়ী হলে ১৫৯০ খৃস্টাব্দে সেটি ‘মসজিদে’ রূপান্ততির হয় এবং ১৯২১ খৃস্টাব্দে আবার গ্রীক রা ক্ষমতায় আসীন হলে পুনরায় তা ‘চার্চে’ ফিরে যায়। এর দেওয়াল ১৯ফুট অধিক পুরু।
f
‘হাজিয়া সোফিয়া’ । এর গম্বুজটি ইট দ্বারা নির্মিত হলেও তার সাথে ‘এশল্যার’ অর্থাৎ বৃহৎ বর্গাকার পাথর খন্ড ব্যবহার করা হয়েছে। এই গম্বুজের ব্যাস ১০৩ ফিট । মধ্যযুগের রোম স্রামাজ্যের সাবেক রাজধানী ইস্তাম্বুলের (বর্তমান তুরস্ক) প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত । আদিতে এটিকে গির্জা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ৫৩৭ খৃস্টাব্দে নির্মাণের পর ভূমিকম্পে ব্যপক ক্ষতি সাধিত হলে ৫৬৩ খৃস্টাব্দে আবার তা পুননির্মাণ করা হয়। ১২০৪ খৃস্টাব্দে এটি অর্থোডক্স গির্জা থেকে ক্যাথলিক গির্জায় রূপান্তরিত হয় । পুনরায় আবার অর্থোডক্স গির্জায় পরিবর্তীত হয় যার মেয়াদকাল ১২৬১-১৪৫৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত। পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন হলে এই স্থাপনাটিকে মসজিদে রূপান্তর করা হয় নাম হয় “ইম্পিরিয়াল মসজিদ”, যা প্রায় ৫০০ বছর স্থায়ী ছিল। ১৯৩৫ সালে “মুস্তফা কামাল আতার্তুক” এটিকে যাদুঘরে রূপান্তর করেন। এর গম্বুজ নির্মাণ ‘বাইজেন্টাইন’ স্থপতিদের (period of Byzantine Empire , also known as the Later Roman ) এক অনন্য উদ্ভাবন যাকে ‘পেন্ডেন্টিভ’ নামে অভিহিত করা হয়। ‘পেন্ডেন্টিভ’ হচ্ছে বৃহৎ বৃত্তাকার সারফেসের ছোট ছোট ত্রিভুজ আকৃতির তল । এই ‘পেন্ডেন্টিভ’ দ্বারা বৃত্তাকার তলে স্থাপিত গম্বুজটির সমস্ত ভর নিম্নের আয়তাকার তলে প্রতিস্থাপিত হয়। ‘হাজিয়া সোফিয়া’র গম্বুজ নির্মানে বাইজেন্টাইনরা প্রথম বারের মতো এই স্থাপত্য রীতি ব্যবহার করেন, যা স্থাপত্য ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
gh
১২০৪-০৫ খ্রিস্টাব্দ । বখতিয়ার খলজী বঙ্গবিজয় করলে সূচনা হয় বাংলায় মুসলিম শাসন । তখনই প্রথম বাংলায় নতুন করে মসজিদ নির্মাণ করার প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য হয়ে উঠে। যদিও ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিজয়ের পর শত্রুদের পরিত্যক্ত কিছু গির্জা গুলোকে মসজিদে রূপান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতবর্ষ ও বাংলায় সেটা সম্ভব হয়ে উঠে না । তার প্রধানতম কারণ মন্দিরগুলির এক অভিন্ন স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য। অধিকাংশ মন্দিরের মূল অংশে পুরোহিত দেব-দেবীর পূজো করতেন , যা ছিল সুরক্ষিত একটি আবদ্ধ ঘর , এবং ভক্তদের প্রার্থনা হতো এর বহিরাংশে । কিন্তু মুসলিমদের জন্য প্রয়োজন হতো সমবেতভাবে প্রার্থনা করার মত একটি প্রশস্ত স্থান, যেখানে মুসুল্লীদের সবাইকে প্রার্থনায় নেতৃত্বদানকারী ইমামের পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হয় । এখানে অপরিহার্য স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মিহরাব-কিবলা -দেওয়ালের গায়ে একটি কুলুঙ্গি যা ফেরানো থাকে মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র তীর্থস্থান কা’বার (দক্ষিণ এশিয়ায় পশ্চিম) দিকে।
বখতিয়ার খলজী ক্ষমতা গ্রহন করার পরপরই বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে পরিবর্তন । সমাজ ও সংস্কৃতিতে যে সকল ভারতীয় উপাদান এতদিন প্রভাব বিস্তার করেছিল তার একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব হয় । মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম উপাদান সমূহের আগমন ঘটে ফলে স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধ রীতির সঙ্গে মুসলিম উপাদানের সংমিশ্রণে এক অনন্য মুসলিম স্থাপত্যরীতির বিকাশ লাভ হয় । মুসলিমগণ নিয়ে আসে তাদের ধর্মীয় প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ গঠনশৈলী আর হিন্দু ও বৌদ্ধরা তাতে যোগান দেয় নির্মাণের কলাকৌশল। ইমারতের সদরের বহির্ভাগের কাঠামো নির্মাণে খিলান ও স্তম্ভ এবং গম্বুজ তুলে ধরার জন্য পেন্ডেন্টিভ ও স্কুইঞ্চের ব্যবহার শুরু হয় । মূলত এগুলিও মুসলিম উপাদান নয় কিন্তু মুসলিমরা প্রাক-ইসলাম যুগে প্রচলিত রোমান-বাইজেন্টীয় ও পারসিক উৎস থেকে তা আহরন করে সেই অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করার সুযোগ পায় বাংলায়। পরবর্তীতে কালের পরিক্রমায় এই স্থাপত্য রীতি মুসলিম ইমারতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় ।
 dc
কিন্তু সৌন্দর্যমন্ডিত সুবিশাল মসজিদ নির্মাণে বাংলায় ছিল নানাবিধ প্রতিকূলতা , তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মানসম্মত উপকরণের অভাব। স্থানীয়ভাবে এখানে পাথর পাওয়া যেত না। মুসলিম শাসনের শুরুর দিকে পূর্ববর্তী আমলের মন্দির থেকে কিছু কিছু পাথর সংগ্রহ করে তা নতুন করে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা ছিল খুব যৎসামান্য । ব-দ্বীপ অঞ্চলে একমাত্র সহজলভ্য আইটেম ছিল কাঁদামাটি থেকে প্রস্তুতকৃত ‘ইট’ । এর উৎপাদন টেকনোলজী ছিল খুবই সহজ এবং দামও ছিল কম । অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা অঞ্চলের স্থাপত্য নির্মাণে ‘ইট’ একটি ঐতিহ্যবাহী উপকরণ হিসেবে বিবেচিত। তাই বিকল্প ব্যবস্থা বিদ্যমান না থাকায় নির্মাণ শিল্পীরা ‘ইট’ দিয়েই মসজিদ নির্মাণে ব্রতী হলেন। মসজিদের বাইরের দেয়াল এবং ভেতরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কলাম কিংবা স্তম্ভ এবং স্তম্ভের উপরে স্থাপিত ছাদ এবং সেই ছাদে এক বা একাধিক ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইন ‘গম্বুজ’, মিরহাব , নিশ্যে , প্রবেশ পথে আর্চ , সুউচ্চ মিনার – এইরূপ যাবতীয় স্থাপতিক নির্মানে ‘ইট’ হয়ে গেলো তাদের প্রধান উপকরণ। অবশ্য ইট দ্বারা নির্মিত অংশ গুলোর বহির্দেশে পাথর এবং নানাবিধ ক্যালিওগ্রাফিক্যাল নক্সা নির্মাণেও বাংলার নির্মাণ শিল্পীরা প্রায় আন্তর্জাতিক মানের ছিলেন সেটাও পরিলক্ষিত হয়। তবে সবচেয়ে কঠিনতম কাজটি ছিল ‘গম্বুজ নির্মাণ’।
i
১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দ। ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দর শাহ নির্মাণ করেন ‘আদিনা মসজিদ’ যা পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার হযরত পান্ডুয়া বা ফিরুজাবাদে অবস্থিত। এটি কেবল বাংলায়ই নয়, গোটা উপমহাদেশের মধ্যে বৃহত্তম মসজিদ। সিকান্দর শাহ নিজেকে আরব ও পারস্যের সুলতানদের মধ্যে যোগ্যতম এবং পরে ‘বিশ্বাসীদের খলিফা’ বলে ঘোষণা করেছিলেন । তিনি সর্বদা নিজেকে দামেস্ক, বাগদাদ, কর্ডোভা অথবা কায়রোর খলিফাদের সঙ্গে তুলনা করতেন তাই ওই সকল রাজধানী শহরের মসজিদগুলির আকার ও আড়ম্বরের সঙ্গে তুলনীয় করে ‘আদিনা মসজিদ’ নির্মাণ করেছিলেন তিনি । বিস্ময়ের ব্যাপার হলো , শুধু আকার-আয়তনেই নয় আদিনা মসজিদ নকশা ও গুণগত দিকেও ছিল বিশ্বের সেরা মসজিদগুলির সমকক্ষ । দৈর্ঘ্যে ৫৬৪ ফিট এবং প্রস্থে ৩১৮ফিট অর্থাৎ এই মসজিদের আয়তন প্রায় ১লক্ষ ৮০হাজার বর্গফুট , উচ্চতা ছিল প্রায় ৬০ ফিট। এর বিস্তারিত সমীক্ষার অনুপস্থিতিতে, প্রস্তর স্তম্ভসমূহের দ্বারা গঠিত বর্গক্ষেত্রগুলির উপর নির্মিত মসজিদের গম্বুজের সংখ্যা ৩০৬ এবং ৩৭০ বলে অনেকের ধারণা। স্তম্ভগুলি ভিত্তিমূলে বর্গাকার, মধ্যস্থলে গোলাকার এবং উপরে শীর্ষস্থানের দিকে বাঁকা। প্রার্থনা কক্ষের উত্তরে খিলান দ্বারা আচ্ছাদিত পথের উপরের কয়েকটি ছাড়া গম্বুজগুলি ত্রিকোণবিশিষ্ট পেন্ডেন্টিভের উপর সংস্থাপিত। বর্তমানে ‘আদিনা মসজিদ’ পতিত স্থাপনা ,যার অনেক কিছু ধ্বংস-প্রায় ।
 j
১৪৩৫ -৫৯ খ্রিস্টাব্দ। সুলতান নসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে খান আল-আজম উলুগ খানজাহান সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে এক রাজ্য গড়ে তোলেন, যার নাম হয় ‘খলিফাবাদ’ । ধারনা করা হয় ১৫শ শতাব্দীতে বৈঠক করার জন্য তিনি একটি ‘দরবার হল’ নির্মাণ করেন। বর্তমান বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে যার অবস্থান। স্থাপনার গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। এ মসজিদটি বহু বছর ধরে ও বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। তাঁর নির্মিত সেই ‘দরবার হল’ টিই হচ্ছে আমাদের ‘ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ’ । ইউনেস্কো ‘লিস্ট অব ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটস ইন বাংলাদেশ’ এর তিনটি স্থানের একটির মধ্যে এর অবস্থান । মসজিদটি সাতটি আইল ও ১১টি ‘বে’তে বিভক্ত। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ‘বে’টি প্রশস্ততর। এই কেন্দ্রীয় ‘বে’টি সাতটি পৃথক আয়তাকার অংশে বিভক্ত। এগুলির প্রতিটি অংশ চৌচালা আকৃতির ভল্টে আচ্ছাদিত। দেয়ালগুলো প্রায় ৮•৫ ফুট পুরু। মসজিদের ৪ কোণে ৪টি মিনার আছে যা ক্রমশ উপরের দিকে সরু হয়ে গেছে। এদের কার্ণিশের কাছে বলয়াকার ব্যান্ড ও চূঁড়ায় গোলাকার গম্বুজ আছে। মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলার আছে। এই ৬০টি স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালের ওপর তৈরি করা হয়েছে গম্বুজ। মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ হলেও প্রাপ্ত গম্বুজ সংখ্যা ৭৭টি। ৭৭টি গম্বুজের মধ্যে ৭০ টির উপরিভাগ গোলাকার, আবার মিনারে গম্বুজ আছে ৪ টি । সেই সব মিলিয়ে হিসেব করলে গম্বুজের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ৮১ ।
k
Architecture starts when you put two BRICKS together, there it begins.
গ্রীক রোমান বাইজেন্টাইন পার্সিয়ান ‘স্থাপত্য ও নির্মাণ’ সম্পর্কে এই বাংলা তখন গভীর অন্ধকারে। তথাপি নির্মাণ শিল্পীরা ১,৩,৭,৯, ১৬, ৭৭, ৮১, ৩৭০ সংখ্যক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন এবং তা আজ থেকে প্রায় ছয়শত বছর আগের কথা ! বাংলায় ইট দ্বারা গম্বুজ প্রচলিত রীতিতে নির্মিত হলেও তার সাথে দিল্লির তুগলক স্থাপত্যরীতির উল্লেখযোগ্য প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। স্থাপনাগুলোর বহির্দেশ হেভি থিক ব্রিক্স ওয়াল যা ৬ থেকে ৮’ পুরু এবং আভ্যন্তরিন স্তম্ভগুলোও ইট দ্বারা নির্মিত । ছাদে গম্বুজটি মূলত বহির্দেশে চারটি স্তম্ভ কিংবা দেওয়ালের উপর স্থাপিত হয়। স্টেপ বাই স্টেপ ‘ইটের উপরে ইট’ এই পদ্ধতিতে এর নির্মাণ কাজ সম্পাদিত হয়। ইট দ্বারা অর্ধ বৃত্তাকার পথে রিং নির্মাণ করাটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ । গম্বুজের উপরের অংশের কম্প্রেশন লোড সর্বদা তার পার্শ্বে সমর্থিত হয়, তাই জ্যামিতিক মাপ-পরিমাপে কোন ত্রুটি না থাকলে ধীরে ধীরে নির্মীয়মান রিং-টি নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্ট্যাবল স্ট্রাকচারের রূপ পরিগ্রহ করে । সম্পূর্ণ গম্বুজটি নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু ফলস সাপোর্ট দ্বারা ইটের গাঁথুনি কে আটকে রাখা জরুরী। অর্ধবৃত্তাকার অংশটি সম্পূর্ণ নির্মাণের পর ফলস সাপোর্ট গুলোর আর কোন কাজ নেই খুলে ফেলা হয়। একাধিক গম্বুজ হলে প্রতিটি বে’তে অন্যান্য গম্বুজ গুলো নির্মাণ শেষে কেন্দ্রের বড় গম্বুজটি নির্মাণ করা হয় । বৃহৎ আকারের গম্বুজ নির্মাণ – আদতে এক এডভান্সড গণিত আর জ্যামিতির সংমিশ্রণ । সাইজ অব রেক্টেংগুলার বেস , ভার্টিক্যাল হাইট , এংগেল অব পেন্ডেটিভ , ডায়া অব সার্কুলার বেস , রেডিয়াস অব কার্ভ , পিক পয়েন্ট টু বেস লেংথ , গম্বুজের অভিকর্ষ ভর ইত্যাদি ইত্যাদি -এসবের রহস্য উন্মোচন করতে গনিতবিদ স্থপতি ও প্রকৌশলীদের হাজার বছর পর্যন্ত প্রতীক্ষা করতে হয়েছিল , কেবল এতটুকুই জানা যায় !
 el
“I don’t know why people hire architects and then tell them what to do” ফ্র্যাংক গ্যারি , মার্কিন স্থপতি।
হাল আমলের প্রকৌশলী এবং স্থপতি গণ আরসিসি এবং স্টিল স্ট্রাকচারেই প্রভূত পান্ডিত্য অর্জন করেছেন –আসলে বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের যেমনটা পড়িয়েছে তেমনটাই আর কি ! ইটের লোড বেয়ারিং ওয়াল দ্বারা কি কি স্থাপত্য ও নির্মাণ সম্ভব এসবে আমাদের অভিজ্ঞতা বলা যেতে পারে স্ট্রেইট জিরো । যেহেতু এই টেকনোলজী বর্তমানে ইউজলেস এবং ভ্যালুলেস , তাই এই নিয়ে গবেষণা করাটাই সময়ের অপচয়। জানতে ইচ্ছে হয় -বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা গুলোর নির্মাণ কলাকৌশল এবং স্থাপত্য নিয়ে উল্লেখ করার মতো কোন জর্নাল বা পাব্লিকেশন আদতেই কি কিছুই আছে ? গুগুল মেরে মেরে আজ কত বছর ধরেই তো দেখছি -একই তামাশা ! কিচ্ছু নেই, আছে কেবল হাজার হাজার ছবি ! কিন্তু ঐতিহাসিক স্থাপনা সমূহের শুধুমাত্র দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ – এতটুকুও দাগ কেটে দেখানো নেই কোথাও ! কে করবে এসব, সরকার না বিশ্ববিদ্যালয় ? জানা নেই। অথচ এই সব স্থাপনা সমূহের এজবিল্ট নক্সা তৈরি – অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তা কোন কোটি কোটি টাকার মামলাও নয়। হতে পারে আমি ভুল বকছি। নিশ্চয়ই আছে প্রচুর গবেষণা দিস্তা দিস্তা , যতনে রেখেছি বাক্স বন্দী তা বস্তা বস্তা । তাহলে আর কি চিন্তা ? আসেন সেগুনো বালিশের তলায় রেখে ঘুম পাড়ি ।
বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ডিজিটাল ওয়েব সাইট , সেখানে ঢুকুন , পরথমেই আপনি দেকবেন –মহান পরিচালকের একখানা ফটুক । ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’ এই চ্যাপ্টারে কি লেখা আছে একটু হোনবেন বাই ? জ্বীণ পরীর আছরের গল্প সাথে কিছু আষাঢ়ের গল্প , কপি পেস্ট করে দিলাম একটু হোনেন বাই “জনশ্রুতি আছে যে, হযরত খানজাহান (রঃ) ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণের জন্য সমুদয় পাথর সুদুর চট্রগ্রাম, মতান্তরে ভারতের উড়িষ্যার রাজমহল থেকে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা বলে জলপথে ভাসিয়ে এনেছিলেন”। যেখানে ওইকিপিডিয়া বলছে ‘পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। তুঘলকি ও জৌনপুরী নির্মাণশৈলী এতে সুস্পষ্ট” ।
২০১৩-২০১৭ খ্রিস্টাব্দ। ২০১ গম্বুজ মসজিদ। মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ নয় , টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে এর অবস্থান । মসজিদের গম্বুজের সংখ্যা ২০১টি এবং মিনারের উচ্চতা হবে ৪৫১ ফুট। ইটের তৈরি দিল্লীর কুতুব মিনার ২৪০ ফুট ,আর বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনারটি মরক্কোর কাসাব্লাংকায় দ্বিতীয় হাসান মসজিদ উচ্চতা ৬৮৯ ফুট। মিহরাবের দুই পাশে লাশ রাখার জন্য হিমাগার তৈরি করা হবে। ছাদের মাঝখানে থাকবে ৮১ ফুট উচ্চতার একটি বড় গম্বুজ এবং চারদিকে থাকবে ১৭ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ২০০টি গম্বুজ। মূল মসজিদের চার কোনায় ১০১ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট চারটি মিনার থাকবে। পাশাপশি আরো চারটি মিনার থাকবে ৮১ ফুট করে উচ্চতা বিশিষ্ট। এই মসজিদটিতে একসাথে প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। মসজিদের দেয়ালের টাইলসে অংকিত থাকবে পূর্ণ পবিত্র কোরআন শরীফ।
এই মসজিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হচ্ছে – এর উত্তর ও দক্ষিণ পাশে নির্মাণ করা হচ্ছে আলাদা আলাদা পাঁচতলা বিশিষ্ট ভবন। সেখানে থাকবে দুঃস্থ মহিলাদের জন্য বিনামূল্যের হাসপাতাল, এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের পূণর্বাসনের ব্যবস্থা। নিঃসন্দেহে এটি একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ । ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টে’র চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের নিজ উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে এই মসজিদ নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। আশা করা হচ্ছে, ২০১৭ সালের মধ্যে মসজিদের কাজ শেষ হবে ।
 The DOME – SYMBOL OF POWER. ১৪৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪৪ ফুট প্রস্থের আরসিসি স্ট্রাকচারে নির্মিত এই মসজিদে এতোগুলো গম্বুজ কেন , তাদের উপযোগিতা কি , আর্কিটেকচারাল ফাংশন কি , ২০১ এটি কি শুধুই একটি সংখ্যা? না কি আছে কোন অন্তর্নিহিত রহস্য? তা জানার জন্য তাদের ওয়েব সাইট , ফেসবুক ও গুগুল ভেরিফাইড পেজ তন্ন তন্ন করে খুঁজে, কোথাও পেলাম না স্থপতি , প্রকৌশলী কিংবা পরামর্শকের নাম। ওয়েব সাইট বলছে ” It will be the first mosque with the highest number of domes & this will be the highest minaret of Bangladesh and second highest brick build minaret in the world.
(Ref. Wikipedia, Banglapedia , Islamic art heritage of Bangladesh -Enamul Haque , Google , 60 domes Mosque plan by me.)