ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

img_20161011_125150
না ঘটনা এই রকম নয়, যে আপনি একটি সিএনজি কিংবা রিক্সা থেকে নামলেন। মাঝে মাঝে আত্মীয়-স্বজন করুণা করলে ২০১৫ মডেল পার্ল কালার, আনরেজিস্টার্ড প্রিমিও থেকেও আপনি নামতে পারেন। তথাপি ঘটনা’র ফলাফল হয়ে যেতে পারে অনেকটা এই রকম –

যেন, গাঁও গেরাম থেকে নাইট কোচে গাবতলী নেমে সোজা ৬৯ নং এলিফ্যান্ট রোড , ভোর সকাল ছয়টা । এক জোড়া নারকেল, এক হাঁড়ি খেজুরের গুড় , গামছা বাঁধা পুটলিতে কেজি দুই মুড়ি আর কাঁধে কম দামী একটি ব্যাগ । এসব নিয়ে ‘পিতা’ দাঁড়িয়ে আছেন রিসিপশনে , ছেলের মা পাঠিয়েছে , কেননা সে ‘স্বপ্ন’ দেখেছে প্রিয় সন্তান তার খেজুর গুড় আর নারকেলে মুড়ি মাখা খেতে চেয়েছে । তাই ফোন ফ্যাক্স ছাড়াই সারপ্রাইজ ভিজিটে এসেছেন পিতা। সিকিউরিটি বলছে – স্যারের নাম কি, কত নম্বর ফ্ল্যাট ? পিতা বলছেন- আমার ছেলের কি নাম তা জাইনা তুমি কি করবা , এই ধরো কার্ড , গেট খোল মিয়া ভিতরে যাইতে দেও। সিকিউরিটি বলছে –স্যরি এতো সকালে স্যারের ইন্টারকমে ফোন দেয়া নিষেধ আছে। পিতা নিরুপায় সিকিউরিটি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে , চোখের জল মুছেন –আহারে কেন যে আইছিলাম!

দুর্গা পূজার গতকাল ছিল মহানবমী , বনানী মাঠ , রাত ১২-৪০ । ‘গুলশান বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন’ ইকোনমী ক্লাস গেট বন্ধ , খোলা আছে হাই সিকিউরিটি বিজনেস ক্লাস ‘ভিআইপি গেট’ । সিকিউরিটি আটকালেন – স্যার হ্যাভ ইয়ু এনি ভিআইপি পাস ? নারকেল, খেজুর গুড় , গামছায় মুড়ি নিয়ে পিতা দাঁড়িয়ে ছিলেন গেটে , তেমনি দাঁড়িয়ে গেলাম । গট গট করে পাস ছাড়াই ঢুকে গেলেন কিছু লোক– হু কেয়ার্স ! সিকিউরিটিকে বললাম না সে কথা – আপনি তাদের ঢুকতে দিলেন আমারেও দেন বাই । শুধু বললাম – ভাই অনেক দূর থেকে এসেছি মা’কে দেখবো , দুই কন্যাকে দেখিয়ে বললাম – তাদের মন খুব বিষণ্ণ হবে , দুর্গা মা কে শুধু একবার চোখের দেখা দেখেই প্রণাম ঠুকে চলে যাবো , একটুও বিরক্ত করবো নাকো , প্লিজ প্লিজ। এদিক ওদিক তাকালাম, চেনা কাউকেই পেলাম না , ঢাকা শহরের এই বনেদী জোনে কে আর আসে মরতে !

“ভিখারীর মতন ভিআইপি গেটে দাঁড়িয়ে দেখছি ভিতরে দুর্গা-উৎসব , অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা কত রকম সেলফীতে মেতে আছে , আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!”

সিকিউরিটিকে আবার শুধালাম –ওহে ভাই একটু বিবেচনা চাই শুধু , চাই একটু করুণা , সারা দিন প্রতীক্ষায় মেয়ে দুইখানি মোর , না চাই করিতে মোর আর্নেস্ট রিকোয়েস্ট , অনুমতি প্রার্থনা – আজ যদি মা দুর্গাকে না পায় দেখতে –মেয়ে দুটি মা হারা হয়ে যাবে আমি থাকতে , আমি বাবা দিয়ে কি ঘন্টা বাঁধিবে তাহারা , চাই অল্প একটু পারমিশান আপনারা আছেন যাহারা।

বরফ গলিল বোধ হয়, আচমকা এদিক ওদিক চেয়ে একজন বলে দিলো– ঢুকে যান কুইক কুইক।
ঢুকতে পারলাম , ঢুকেই বুঝতে পারলাম –আসলেই এই অঞ্চল কেন ভিআইপি ! অপরূপ সাজ সজ্জা , কান্তজীর মন্দির আদলে পূজো মঞ্চ তাতে হরেক রকম বাত্তি -একবার তাহা জ্বলে , একবার তাহা নেভে , একবার তাহা ফাল পাড়িয়া উঠে । আমার জাত ভাই সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী আছেন যাহারা –সবাই দেখলাম হেডাম অলা এক আমি চক্কোত্তি ছাড়া ! আর আমিও জাতে উঠিয়া বলতে চাইছিলুম ‘হত দরিদ্র জাত ভাই দেখে দেখে –আর বলবেন দাদা একেবারে টায়ার্ড হয়ে গেছিলুম যেন’ । একজন হেডামকে পেলাম , লেমিনেটেড বাহারি কার্ড ঝুলানো , দেখে মনে হল ইনাকে অন্তত বলা যেতে পারে অন্তরের কিছু কথা ,এবং বলেও দিলুম যদিও ছিলেম ভয়ে কিঞ্চিৎ তটস্থ – কাকা মায়ের ভোগ কিংবা প্রসাদ কিছু কি আছে বন্দোবস্ত ?
তিনি বিগলিত হলেন– ও ইয়েস ইয়ু আর অলোয়েজ ওয়েলকাম !

ভেতরে ডেকে নিয়ে গেলেন , মন্ডপের পেছনেই সারি সারি টেবিল সাজানো অতি মনোরম । এখন অনেক রাত , পাঁচ ছয় জন পাওয়া গেল ডিনারে। বুফে সিস্টেম , টেবিলে ঢাকনাযুক্ত স্টিল পাত্রে সাজানো খিচুড়ি প্রসাদ গরমা-গরম , সেখানে উর্দি পড়া ওয়েটারগণ –পরিবেশনে নিয়োজিত , অনন্য অতি সুস্বাদু এই ‘খিচুড়ি প্রসাদ’ অন দ্য স্পটে খাইতে যদি মন নাহি চাহে, সুদৃশ প্যাকেট সাজানো আছে , নিয়ে আসুন প্যাকেট, খিচুড়ি প্রসাদে ভর্তি করে অতঃপর সেই প্যাকেট বাড়ি নিয়ে যান ,যতো খুশি , নো পোবলেম এট অল !

01_durgapuja_shashthi_bananimandap_191015_13

মা ‘দুর্গা’ ব্রহ্ম শক্তি স্বরূপিনী তুমি বিভাসিতা মাতৃশক্তি, জগজ্জননীরূপে সর্বভূতে তুমি বিরাজমান। সকল প্রাণীতে চেতনারূপে, বুদ্ধিরূপে, শক্তিরূপে, শান্তিরূপে, শ্রদ্ধারূপে, দয়ারূপে, নানারূপে তুমি আছো ‘মা’ । সর্ব অকল্যাণ সর্ব অশান্তি বিরুদ্ধে তুমি কল্যাণময়ী তুমি শান্তিময়ী । দুর্গতিনাশিনী তুমি , তোমার আশীর্বাদের করুণাধারায় সিক্ত হতে চেয়েছি প্রতিটি শরতে , তোমাকে গ্রাম ,মহল্লা , ইউনিয়ন , থানা , মফস্বল কিংবা উপশহরে কতোই না খুঁজে বেড়িয়েছি মা গো –তোমায় পাইনি তেমন করে ! অথচ এই ঢাকায় লক্ষ কোটি চিটিং বাটপারে ভরপুর শহরে তোমায় আজ পেলাম -কিন্তু  তুমি একা ।  আছে মহিষাসুররা সব দলে দলে, জানতুম না কিছুই তার, আজ ভিআইপি না হলে !