ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

খোলা চিঠি 

আংকেল,

আপনার  কন্যা শিশুটিকে টিকা দিতে নিয়ে গেলে , স্বাস্থ্য-কর্মীটি  যখন তার তুলতুলে মোমের মতো শরীরে সূঁচ ফুঁটিয়ে দিতে উদ্যত হন , আপনি তা দেখে অবাক হয়ে যান, স্বাস্থ্য-কর্মী গুলো এতো নির্দয় হয় কিভাবে ! আপনি সেই অমানবিক দৃশ্যটি  সইতে পারেন না । আপনার  কন্যা শিশুটির যন্ত্রণায় আপনি কাতর হয়ে যান, যেন সুঁই ফুঁটে যাচ্ছে আপনার কলিজায়, আপনি সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন নি তবু আপনার কন্যা শিশুটির কান্না আপনাকে বেদনার্ত করে তোলে । একজন পিতা হয়ে এই দৃশ্য সহ্য করা ভীষণ কষ্টের , তাই আপনি  সেই সময় চোখ বন্ধ করে থাকেন।  আপনার মেয়েটি খেলতে খেলতে পড়ে গেলে , হাঁটুতে একটু আঘাত পায়  ‘কিছুই হয় নি বাবা’  যদিও সে বার বার বলে যায়  , কিন্তু সে ব্যথা যেন আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যায় । এতটুকু একটা শিশু ,আপনার পরীর মতন মেয়েটা হায়রে ! তার একটু লাগলে ,বুকের কতো গভীর অবধি জ্বলে , আপনি খোলাসা করে , তা পারেন না বোঝাতে বলে ,  আপনার  চোখ ভিজে যায় জলে । কেননা আপনি  বর্বর নন , মানবের চাইতেও অধিক মানবিক, আপনি  পিতা। নিজ কন্যা সন্তানটির  বিপদ আপদ একটু কিছু হলেই আপনি ডাকেন বিধাতা

আংকেল, আপনি  পিতা, পুরুষ তো বটেই, আপনি  কী মহাপুরুষ?

যদি তা হয়, কোন সুরক্ষিত ক্যান্টনমেন্ট অভ্যন্তরে অন্ধকারের রাত, জন-মানবহীন পার্বতীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম, নয়নাভিরাম অপূর্ব আদিবাসী কোন পাহাড় ,পরিত্যক্ত কোন গুদামখানা কিংবা গ্যারেজ টাইপ  বাড়ি ভীষণ নির্জন। আপনি আছেন চারদিক পুরাই ফাঁকা, কন্যা-সম মেয়েটি হেঁটে যায় একা একা । তখন?  পিতা, রক্ষা কর্তা না পুরুষ? আংকেল, তখন আপনি কী?  না সেটি  আপনি নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও, আমি জানি আপনি চাইলেই এখন মহাপুরুষ হয়ে যেতে পারেন। আপনার কন্যা-সম কাউকে অরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া মাত্রই আপনার ‘পৌরুষ জাগিয়া উঠিলে’ কী কী আপনি  পারেন তা আপনি জানেন না, আমি তার সবটাই জানি । মেয়েটিকে কিঞ্চিৎ স্পর্শ পূর্বক টানা হেঁচড়ায় ধ্বস্তাধস্তিতে ‘চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে, সে যদি দিতে বাধ্য না থাকে’ -অতঃপর যদি তার রক্তপাত পর্যন্ত হয়ে যায় , এবং যদি শেষ কালে সে  মরেও যায় , তাহলেও তাতে  এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না , আপনি আংকেল , সেটাই বিশ্বাস করেন। কারণ আপনি মনে করেন -যেহেতু আপনি পুরুষ তাই একমাত্র আপনারই  আছে  ‘খাড়ায়ে পেশাব করার’  অধিকার । তাছাড়া ইতিমধ্যে  আপনি এটাও জেনে গেছেন- যদ্যপি আপনি প্রভাবশালী কেউ না হয়েও থাকেন , যদ্যপি রাষ্ট্র যন্ত্রের চালকগণ সকলে ‘নারী’ হয়েও থাকেন , তদ্যপি এই লঘু অপরাধে , আপনার একটি মাত্র গুপ্তকেশও ছিঁড়ে  ফেলবার  ক্ষমতা রাষ্ট্র রাখে না। কেননা আপনি বিশ্বাস করেন এর জন্য দায়ী নারীর অরক্ষিত পোশাকআশাক , পরিবেশ পরিস্থিতি এবং তার আচরণ , আপনি কেবল উপলক্ষ মাত্র। আপনি মনে করেন  যুগে যুগে রাষ্ট্র , প্রাচীন শাসক , রাজা ও রাজ্য-সভাসদগণ পুরুষ শাসিত সমাজের ধারক ও বাহক । আপনার ‘পৌরুষ’ সক্ষমতা আছে কিনা শুধুমাত্র সেটা প্রমাণে ‘রাষ্ট্র’ সক্ষম , কিন্তু আপনি জানেন ‘রাষ্ট্র’ নিজেই তার নিজের ‘পৌরুষ’ সক্ষমতা প্রমাণে অক্ষম। তাই আপনি নিশ্চিত থাকেন , আপনি টেন্সনলেস থাকেন , রাষ্ট্রই আগ বাড়িয়ে এসে আপনার সুরক্ষার দেখভাল সম্পন্ন করে দিয়ে যায়।

এবং আংকেল, সেই সাথে  আপনার অতি আদরের কন্যা শিশুটির এক চুল পরিমাণ ব্যথা কিংবা আঘাত পাবার ঘটনা সমূহ এক্সট্রিম্‌লি বিবেচনা করতেও আপনি ভোলেন না, এবং অন্য কিছুর সাথে তা এক পাল্লায়  মাপা এই অনধিকার চর্চাসমূহকেও  আপনি অনুমোদন দেন না ।

আংকেল , আপনি বাসে ‘মহিলা’ সংরক্ষিত আসনে , বীর-দর্পে বসে যেতে পারেন অবলীলায় । পাশ দিয়ে একটি মেয়ে মটর বাইক চালিয়ে যাচ্ছে দেখলে -আপনি যথেষ্টই  ক্ষুব্ধ হন। এই নিয়ে বাকীরা ঠাট্টা মশকরা করলে , আপনি সেই আলোচনায় অংশ গ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। যদি আপনি এইসব কাজ নাও করে থাকেন , ভীষণ গো-বেচারা টাইপ সাদা সিদা টাইপ হয়েও থাকেন , তবুও আপনি আমার পিতা নন পিতৃ সম হতে পারেন বড়জোর , যদিও আমি আপনাকে আংকেল বলছি নির্দ্বিধায় , তবুও আমি আপনাকে বিশ্বাস করছি না , কারণ আপনি একজন পুরুষ।

আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এই চিঠি লিখছি, আমি ভালো আছি , তবে সম্ভবত আমার মৃত্যু আসন্ন , কিছুক্ষণ বাদেই আমি অন্ধকারে হারিয়ে যাবো , যাবার আগে আমি লিখে গেলাম এই চিঠি, আপনার কন্যা শিশুটিকে  পড়ে শোনালে খুব খুশী হব , তার পিতাকে সে যেন একটু চিনে রাখে ,  জাস্ট এতটুকুই।

আপনার একান্ত অনুগত

‘লক্ষ্মীকিংবা সরস্বতী‘ 

a_

দামিনী, তনু, লক্ষ্মী কিংবা সরস্বতী

আমরা মোমবাতি মিছিল করেছি।
রং-বেরঙ-এর মোমবাতি চার্চের সামনে,
সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর যুগে
ছবির গুরুত্ব অপরিসীম।
ছবি তুলেছি তাই অনেক দামিনী।
ব্লগ লিখেছি, তর্ক করেছি, প্রশাসনের
বাপ-মা এক করেছি।
তুমি মৃত্যুশয্যায় দোষীদের শাস্তি
চেয়েছিলে দামিনী।
আমরা তাদের লালন করেছি সযত্নে,

আমাদের যত রাগ শুধু ক্যামেরার সামনে,
কবিতার খাতায়।
আমরা গালাগাল করব মিডিয়ায়,
আর বাসে, ট্রেনে, মেট্রোয় মেয়েরা কেন
জেনারেল সেকশনে এই বলে ঝগড়া করব।
‘এই জন্যেই তো এরা মরে।’ বলে রাগ করব।

দামিনী, তনু, লক্ষ্মী কিংবা সরস্বতী

 আমরা তোমাকে বলব,
‘Do not resist! Enjoy!!’
এই বিজ্ঞাপনের সময়ে তোমার শরীর
তো শুধু পণ্য।
উপভোগ করতে শিখলে প্রাণটা
তো বাঁচে। ……….

আবার আবার প্রতিবাদে ব্লগ করব বা
মৌন-মিছিল মোমবাতি হাতে।

দামিনী, তনু, লক্ষ্মী কিংবা সরস্বতী

বিশ্বাস কর আমরা সবাই
তোমার পাশে আছি।
ঘরে আগুন লাগলেও কেউ না কেউ
নেভাবে ভেবে
আমরা দিব্যি পাশ ফিরে শুয়ে আছি।

কবিতা: ‘ঊনত্রিশে ডিসেম্বর’ – শুভজিৎ সাহা , ছবিঃ ইন্টারনেট ।

*দিল্লীতে গণধর্ষণের শিকার মেডিকেল ছাত্রী দামিনি , ১৩ দিন তিনি হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ,২৯ শে ডিসেম্বর ২০১২ মারা যান।