ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

ডিপার্টমেন্টের নাম ছিল তখন ম্যালেরিয়া, পরে এর নাম হয়ে যায় ‘হেলথ এন্ড ফ্যামিলি প্ল্যানিং’। সেই অফিসে ছোট চাকুরী ছিল বাবার। অফিস থেকে পাওয়া মেড ইন জাপান, গায়ে পিতল প্লেট, তাতে লেখা ‘দ্য মিস্টার সাইকেল’।

আমি তখন ক্লাস এইট। বাবা এখন থেকে হেঁটে অফিস যাবেন । সামনে বৃত্তি পরীক্ষা, যাতায়াত সহজ হবে আর পড়াশুনোয় অধিক মনোযোগ প্রাপ্তি হবে আমার , তাই সিদ্ধান্ত নিলেন ,সাইকেল খানা এখন থেকে আমার ব্যবহারে দিয়ে দেবেন। অত্যধিক ওজন আর অন্য সাইকেলগুলোর চেয়ে আকারেও বড় -বহু ব্যবহারে তা বর্তমানে প্রায় ব্যবহার অযোগ্য। জানি তো , আমাদের কোনদিন মনের মত কোন কিছুই হয় নি , তাই আজও হবে না। শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো । ভেবেছিলাম নতুন সাইকেল হবে , হলো না । কেমন করে বাবা এটা চালিয়ে বেড়াচ্ছেন তা তিনিই কইতে পারবেন ! ঘষা মাজা রিপেয়ার করে কিছু পার্টস পাল্টানো হলো , তাতে এফিসিয়েন্সি ঈষৎ বাড়লো যদিওবা কিন্তু রূপ ফিরলো না এতটুকুও ।

নির্দেশ অনুযায়ী গত দুই সপ্তাহ ধরে গনি মিয়ার গ্যারেজে ঘন্টায় দু টাকায় ট্রেনিং, গতকাল ছিল তার শেষদিন। আমি খুশী হইনি, বাবা বুঝেছেন, তাই অল্প করে যেটা বোঝালেন তার মানে হচ্ছে , আরও একটু বড়ো হও -তার পর সম্ভব হলে নতুন কিনে দেব। মন দিয়ে পড়াশুনা করলে একদিন গাড়িও কিনতে পারবে। মেনে নিলাম। না সত্যি করেই বলছি- বাবা আসলেই পারতেন না, জানি তো ! যদিও বলেন নি আমায় পরে আমি জেনেছি , আমি তখন ক্লাস সিক্স । আমার ফুলফ্রিস্টুডেন্ট সিপ এপ্লিকেশন নিজেই লিখে নিয়ে গেছিলেন ,  হেড স্যার বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন – ‘এসব ফ্রী ট্রী হবে নাকো, ছেলেকে ফার্স্ট হতে বলো তাহলে ভেবে দেখব – আদারওয়াইজ নট পসিবল’।  কেউ না জানুক আমি অন্তত জানি আসলেই সেরকম ট্যালেন্ট আমি নই -তবুও কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালা স্কুলে সে রকম সুপার ট্যালেন্ট না থাকায় , বনে বাঘ না থাকলে বিড়াল যেমন বাঘ হয়ে যায় , তেমনটা কেমন কেমন করে যেন হয়ে গেছিল , বেতন আর পরে শোধাতে হয় নি আমায়।

হোক না তা পুরনো সাইকেল, সেদিন বুঝিনি, যদিও পরে জেনেছিলাম মানে। সমর বলেছিল – ‘আরে এইটা তো ধ্বজভঙ্গ সাইকেল এইটা কেমনে চালাবি?’ বলেছিলাম – ‘কোথাও তো ভাঙ্গা নেইরে, বাবা রিপেয়ার করে দিয়েছেন, তুই আজাইরা দর্জাভাঙ্গা বললেই হবে নাকি?’ ধ্বজভঙ্গ শব্দটি শুনে নিয়েছিলাম প্রথম।

যাক এসব নিয়ে মন খারাপের সময় এখন নয় । যার যা খুশি বলুক, আজ একটু বাদেই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ । “গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল, অসংখ্য নক্ষত্রের রাত; সারা রাত বিস্তীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে; মশারিটা ফুলে উঠেছে” , আর একবারের জন্যেও চোখের দুই পাতা এক হয়নি গতরাতে, সমস্ত শরীর জুড়ে চলছে চরম উত্তেজনা । স্কুলে যাওয়ার জন্য হাসি হাসি মুখে নিদারুন অস্থিরতায় কখনো থাকে নি আগে , এটা হচ্ছে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছি আর অধিকার অর্জন করতে শিখছি । ঠাকুমা বললেন -‘ফুল দুব্বা সিঁদুরে ফোঁটা দিয়ে দিয়েছি , আর চিন্তার কিছু নেই , সাবধানে চালাস’ । ক্যারিয়ারে শক্ত করে আটকে নেয়া হয়েছে স্কুলের ব্যাগ । আসলে কি জানেন তো , যাকে দেখেছি -একটু লেগেছে ভালো , তাকেই বেসে ফেলেছি ভালো , তাই প্রথম প্রেম, প্রথম সিগরেট কিংবা প্রথম আরো অনেক অনেক কিছু , এত দিন বাদে মনে নেই কিচ্ছু । কিন্তু মনে আছে এখনো, সেই দিন , যদিও তা সাদা-কালো ।

bicycle


ভগবানের নাম নিয়ে গলি থেকে রাস্তায় নেমে গেলাম , দ্যাট ওয়াজ দ্যা ফার্স্ট ডে ইন লাইফ ‘দ্যা মিস্টার সাইকেল এন্ড মি’। কিছুটা হাঁটিয়ে নিয়ে , ফাঁকা রাস্তায় সুযোগ দেখে – প্রথমে হাফ প্যাডেল মেরে কিছুটা স্পীড বাড়িয়ে নিলাম, আচমকা হেলে দুলে পড়তে পড়তে গিয়েও না পড়েই দুম করে উঠে বসলাম সীটে। সো এক্সাইটিং ! ‘দ্যা মিস্টার সাইকেল এন্ড মি’ নাউ ইন টাউন । সামনে কিছু রিক্সা , গোটা পাঁচ সাইকেল একটা বেবি ট্যাক্সি  , পাশ কাটিয়ে চলছি -ক্রিং ক্রিং বাজাতে ভুলেই গেছিলাম , দিয়ে দিলাম কয়েক বার । শুনেই সামনের রিক্সা সাইড দিয়ে দিল , বাহ দারুণ তো ! নো প্রোবলেম এটঅল । দেখতে দেখতেই চলে এলাম , স্কুলের কাছাকাছি । আচমকা হুজুর স্যারের চোখে চোখ পড়ে গেল , বিধি মোতাবেক হাত তুলে ‘আদাব স্যার’ বলতে গিয়ে -হ্যান্ডেল থেকে হাত গেল ফসকে -পথচারীরা চেঁচিয়ে উঠল ‘এই রে গেলরে গেল’ ! জানেন তো কুমিল্লা শহরের এই ড্রেনটাকে না ,ড্রেন না বলে খাল বলা বেটার । বর্ষা কালে টুবুটুবু পানি -ছোট জাল ফেলে মাছ ধরে লোকে , এখন অবশ্য এখানে শুধু কালো পানি । সড়সড়িয়ে হনহনিয়ে কিংবা বলা যেতে পারে আপোষে আলগোছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নেমে গেলাম ড্রেনটায় । ‘দ্যা মিস্টার সাইকেল এন্ড মি’ নাউ ইন ড্রেন ।

হুজুর স্যার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী , এগিয়ে এসেই বলতে লাগলেন -‘তুই একটা গাঁধাও নোস তুই একটা বন্য শুয়োর বড়জোর , সাইকেলে বইসা সালাম দিতে, এই বেয়াদপী কে শিখাইছে তোরে? স্যারেরে সম্মান দেখানোর জন্য কি ভীষণ মরিয়া, বাইট্টা হুজুর কইয়া ডাকোস যাই যখন সড়িয়া , মনে কি করস জানি না এইসব? বান্দর আর বদমাইশের হাড্ডী সব!’ হাত বাড়িয়ে ধমক দিয়ে বললেন -‘ধর আমায়’ । আজই যেন প্রথম দেখলাম হুজুর স্যারের হাত ধবধবে ফর্সা দুধ সাদা। বুক সমান ডুবে আছি, হায়রে কিছুক্ষণ আগেও আমি ছিলাম এই শহরের অধিপতি -শহরের প্রত্যেকটা লোকের যাবতীয় হাগু মুতু এই পথ দিয়েই নাকি নদী হয়ে সমুদ্রে যায় -তাহলে আমি কি এখন নিজেই নিজের বর্জে ডুবে আছি? ছে ছে ছে ছে ! কেউ একজন এগিয়ে এসে বললো -‘হুজুর করতাছেন কি? তারে ধইরেন না , ধইরেন না -সব গুয়ের পানি’ । স্যার জবাব দিলেন -‘ঐ মিয়া তোমারে কি আমি ডাকছি, না শুনতে চাইছি কোনটা গু আর কোনটা শরবত, ছাগল কোনহান কার!’ স্কুল বারান্দা থেকে ইতোমধ্যেই আমাকে দেখে ফেলেছে অনেকে, আর যারা ছিল স্কুল পথে তারা সহ অন্য পথচারী, ভিড় বাড়ছেই,এ এক নিদারুণ তামাশা!

ক্লাসে আমার প্রবল প্রতিপক্ষ আবুল আর রাজেশকেও দেখলাম , হেসে যেন গড়াগড়ি, পারলে হাত তালি দেয়। লজ্জায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে , সাথে অনেক ব্যথাও অনুভব হচ্ছে এখন, যন্ত্রনায় নীল হয়ে যাচ্ছিলাম কিনা জানি না। আচমকা কিছু না বলেই দুম করে হুজুর স্যার পায়জামা গুটিয়ে এক লহমায় টান দিয়ে তুলে নিলেন আমায়। তিনি মূলত ইসলাম ধর্ম পড়ান, আর নেন শারীরিক শিক্ষার ক্লাস। প্রতি সপ্তাহের রুটিনে ‘শারীরিক শিক্ষার’ ক্লাস মানেই অটো ছুটি, শুধু বাৎসরিক স্পোর্টস এর আগে কদিন কিছুটা কসরত করতে হয়, এই যা -তার মানে সব মিলিয়ে গোটা দশ ক্লাসে তিনি আমায় পড়িয়েছেন।

স্কুলের নীচে মহেশ ভট্টাচার্য্য এন্ড কোং থেকে একজন যেন ডেকে নিয়ে আসলেন, তাকে কী কী প্রয়োজন বলে দিলেন। হাত আর পা’র অনেকটুকু ছিলে রক্ত ঝরছে , সে নিয়ে আসলো, স্যার একটা শিশি খুলে ক্ষত স্থানে একটা কিছু লাগিয়ে দিলেন, আর দুই পুড়িয়া সাথে তিন ডোজ জিহ্বায় ঢেলে দিলেন ,একটু বাদেই শক্তি ফিরে এলো প্রাণে। স্যার হোমিওপ্যাথি ডাক্তারী বিদ্যা  জানতেন,  জানা ছিল না আমার। জানতে চাইলাম -‘স্যার আমার সাইকেল’ । ধমক দিলেন- ‘রাখ তোর সাইকেল, আগে বাইচ্চা ল, পরে দেখিস সাইকেল’ । রাজেশ’কে আপাতত তামাশা না দেখে সাইকেল ধুয়ে মুছে স্কুলের গেইটে নিয়ে আসতে নির্দেশ দিয়েছেন স্যার – রাজেশ ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেই কাজটাই করছে এখন। স্যারের পাঞ্জাবী পায়জামা জুতো কালো ময়লা কাদাজলে সয়লাব। সেই মোতাবেক আবুল কে বলা হয়েছে , সে পরিষ্কার পানি নিয়ে এসেছে , স্যারের পায়ে ঢেলে দিতে যাচ্ছিল আবুল, স্যার থামিয়ে বললেন ‘আগে ওরে পানি দে’, আবুল পানি ঢেলে দিচ্ছে আমার চরণে।