ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

সূর্য সেন তখন আত্মগোপনে -এখানে সেখানে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। নেত্র সেনের স্ত্রী , যিনি সূর্য সেনের  অন্ধ সমর্থক ছিলেন , যিনি অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তার বাড়িতে সূর্য সেনের অবস্থান তথ্যটি গোপন রেখেছিলেন। কিন্তু বাড়ির মালিক নেত্রসেন মিরজাফরী করে বসলেন  একদিন। সেটি ছিল ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনা। পুলিশকে সূর্য সেনের অবস্থানের কথাটি জানিয়ে দিলেন নেত্র সেন। পরবর্তীতে এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য, একজন বিপ্লবী দা দিয়ে এক কোপে ঘাড় থেকে মাথা নামিয়ে দিয়েছিলেন নেত্র সেনের, ধারনা করা হয় এই কাজে তার স্ত্রী’র সম্মতি ছিল।

কনডেম্‌ড সেলে সূর্য সেনকে নির্জন কুঠুরিতে, রাখা হয়েছিল কড়া পাহারায় । একজন কয়েদি মেথর , সূর্য সেনের লেখা চিঠি ময়লার টুকরিতে নিয়ে জেলের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বন্দী বিপ্লবীদের দিয়ে আসতো। মৃত্যুর আগে জেলে আটক বিপ্লবী কালীকিঙ্কর দে’র কাছে সূর্য সেন পেন্সিলে লেখা একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন, সে বার্তায় তিনি লিখেছিলেন “আমার শেষ বাণী-আদর্শ ও একতা”। তিনি সংগঠনে বিভেদ না আসার জন্য একান্তভাবে আবেদন  জানিয়েছিলেন সবাইকে।

শেষ দিনগুলোতে জেলে থাকার সময় তাঁর একদিন গান শোনার খুব ইচ্ছা হল। সেই সময় জেলের অন্য এক সেলে ছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। রাত ১১টা/১২টার দিকে কল্পনা দত্ত তাঁকে চিৎকার করে বললেন – “এই বিনোদ, এই বিনোদ, দরজার কাছে আয়। মাস্টারদা গান শুনতে চেয়েছেন”। বিনোদ বিহারী গান জানতেন না। তবুও সূর্য সেনের জন্য রবিঠাকুরের “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” গানটা গেয়ে শোনালেন।

xx-001

সূর্য সেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদারকে ব্রিটিশ সেনারা নির্মম ভাবে হাতুড়ী পেটা করল প্রথমে । হাতুড়ীঘাতে মুখমণ্ডল থেঁতলে গেল তাদের , ভেঙ্গে গেল সবকটা দাঁত।  হাতের নখ উপড়ে তুলে ফেলা হল একের পর এক। হাঁটু থেকে শুরু করে সমগ্র শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে চলল নির্বিচারে আঘাতের পর আঘাত । শরীরের সকল হাড় ভেঙ্গে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। এক পর্যায়ে তারা নিস্তেজ হয়ে জ্ঞান হারালেন। তারপর মৃতপ্রায় শরীর দুটিকে টানতে টানতে , তাদের গলায় বেঁধে দেয়া হয় হল ফাঁসীর দড়ি । মৃত্যু নিশ্চিত করতে ফাঁসীর মঞ্চে ঝুলে পড়লেন সূর্য সেন এবং তারকেশ্বর দস্তিদার।

লাশ দুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টিমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হল। তারপর তাদেরকে ব্রিটিশ ক্রুজার “The Renown” এ তুলে, তাদের বুকে বেঁধে দেয়া হল লোহার বড় বড় টুকরো। জাহাজ চলে আসল বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগর সংলগ্ন কোন এক গভীর অভ্যন্তরে। অতল গভীর জলে নেমে গেলেন, সূর্যসেন ও তারেকশ্বর দস্তিদার।

১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারির ঘটনা। আজ ৮২ বছর পর -আমরা বুকে ধারণ না করি, অন্তত ফেসবুকে সূর্যসেনকে উদযাপন তো করতে পারি ! আসুন, ফেসবুক মাঠে মহাসমারোহে ভার্চুয়াল হাতি ঘোড়া মেরে প্রমাণ করি- আমরা সূর্যসেনেরই উত্তরসূরি!

 

সূর্য সেন,তারকেশ্বর দস্তিদার, তোমাদের স্মরণ করছি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।

 

সূত্রঃ উইকি, ছবি স্বত্বঃ লেখক