ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

গত ৯ আগষ্ট২০১১ বাংলাদেশ সহ বিশ্বব্যাপী পালিত হলো আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস।বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক সম্প্রতি সবার নজরে আসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দিপু মনির মন্তব্যে।তিনি বলেন বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই;বিভিন্ন উপজাতি আছে।পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে ঢাকায় কূটনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।বিভিন্ন উপজাতি নেতারা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য ও মতামতকে প্রত্যাখান করে। উপজাতিয় নেতারা দাবী করে যে তারা আদিবাসী এবং বাংলাদেশ সরকারকে তাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

এবার এই প্রসংগে কিছু ঐতিহাসিক আলোচনা তুলে ধরা দরকার বলে মনে করছি।১৯৮৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার উত্তরে গভীর জংগলে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(পি সি জে এস এস)এক শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।ঐদিন তারা পাঁচদফা দাবি সম্বলিত একটি লিখিত দলিল পেশ করে।ঐ দলিলে তারা পার্বত্য এলাকার ভিতর বসবাসরত ১৩টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির জন্য মূখপাত্র বা প্রতিনিধি সংগঠন দাবি করে।সেই সময় বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য এলাকায় যারা বাংলা ভাষা বলত না তাদের উপজাতি লোক(TRIBAL PEOPLE) হিসেবেই সম্বোধন করতো।এবং উপজাতি লোকজন এই উপজাতি সম্বোধনে অভ্যস্ত ও ছিলো।TRIBAL PEOPLE এই ইংরেজি শব্দটি সর্বপ্রথম বৃটিশরা ব্যবহার করে।

১৯৮৭-৮৮সালের শান্তি প্রক্রিয়ার ফলস্বরুপ যথাযথ আইন প্রনয়নের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় রাঙ্গামাটি,খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পার্বত্য সরকারি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়।পাহাড়ি জনগনকে পরিচিত করার জন্য যে পরিভাষা ব্যবহৃত হত তা হচ্ছে ট্রাইবাল(tribal) বা উপজাতি।পার্বত্যচট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(PCJSS) ১৯৮৭-৮৮ সালের এই শান্তি প্রক্রিয়া এবং নির্বাচিত পার্বত্য পরিষদকে অনুমোদন করেনি। আমি উপজাতি শব্দ ব্যবহারের পরিবর্তে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র জাতি সত্তা ব্যবহারের পক্ষপাতি।১৯৭২ সালে প্রনীত সংবিধানে বাংলাদেশের সকল জনগনের জাতীয়তা বাঙালী হিসেবে অভিহিত করা হয়।এটা পার্বত্য এলাকার লোকদের পছন্দ হয়নি এবং গ্রহণ ও করেনি।যখন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবিধানে কিছু সংশোধনী আনেন তখন তিনি বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদির পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদ সংযোজন করেন।আওয়ামীলীগ ও আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজীবিরা এটা মেনে নিতে পারেনি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট বিভিন্ন অর্থ ও উদ্দেশ্য বজায় রেখে বাঙ্গালী ও বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদ দুটোই নিশ্চিত করে।সুপ্রিমকোর্ট উপজাতি বা ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠীর ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেনি।পঞ্চদশ সংশোধনীতেও এই ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। পাহাড়ি এলাকার লোকজন তাদেরকে বাঙ্গালী হিসেবে মানতে নারাজ এবং বাঙ্গালীর পরিবর্তে তাদেরকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি তোলে।
বাংলাদেশে আদিবাসী ফোরাম নামে একটি ফোরাম আছে।তারা আন্তর্জাতিক অংগনের সমর্থন পাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেদের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য গত ২০ বছর ধরে কঠোরভাবে কাজ করে যাচ্ছে ।জাতিসংঘের অংগসংঘঠন গুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা(ILO) অন্যতম।ILO ১৯৫৭ সালে “Indigenous and Tribal population Convention 107” নামে একটি সম্মেলন আয়োজন করে।এই সম্মেলনের প্রধান ফোকাস ছিল আদিবাসী ও উপজাতি লোকদের রাষ্ট্রের অন্য সাধারণ নাগরিকদের মত সমান সুযোগ সুবিধা ও অধিকার আদায়।বাংলাদেশ সহ ২৭ টি দেশ এই কন্বেংতীয়ন অনুমোদন করে।কিন্তু পরে ৯ টি দেশ তাদের অনুমোদন প্রত্যাহার করে নেয়।১৯৮৯ সালে ILO CONVENTION সংশোধন করে নতুনভাবে ILO CONVENTION 169 নামে গ্রহণ করা হয়।এতে ২২ টি দেশ অনুমোদন দেয়।কিন্তু বাংলাদেশ এটা অনুমোদন করেনি।

এশিয়ার একমাত্র দেশ নেপাল এটা অনুমোদন করে।২০০৭ সালের ১৩সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ এক সাধারন অধিবেশন আহবান করে।সাধারন অধিবেশন এর ৬১ তম নিয়মিত সভায় “জাতিসংঘ আদিবাসী জনগনের অধিকার ঘোষনা”(UN Declaration on the rights of indigenous people)গ্রহন করে।এটা গ্রহনের পূর্বে ভোটাভুটির সময় ৪টি রাষ্ট্র এর বিপক্ষে ভোট দেয় এবং ১১ টি রাষ্ট্র ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে।যে ৪ টা রাষ্ট্র বিপক্ষে ভোট প্রদান করে তারা হল-অস্ট্রেলিয়া,কানাডা,নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্র।বাংলাদেশ ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে।

১৯৯৭সালের ২ ডিসেম্বর এই পার্বত্য ইস্যু নিয়ে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(PCJSS)দ্বি-পক্ষীয় আলোচনা ও চুক্তি স্বাক্ষরের সময় পার্বত্য এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে আলোচনায় অংশগ্রহন করে ও চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।এবং সেই সময় পরিস্কারভাবে উপজাতি বা (tribal) শব্দটি ব্যবহার করা হয়।চুক্তির পর বিগত ১৩ বছর ধরে তারা আদিবাসী শব্দ ব্যবহারের জন্য নিজেদের আগের অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসে।

বাংলাদেশ সরকার এর উদ্দেশ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকেনি।১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির ভালোদিক ও যেমন আছে তেমনি এর দুর্বল দিক ও রয়েছে।দেশের ভিতরে ও বাইরে বহু লোক এই শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষন করে যাচ্ছে।বুদ্ধিজীবি ও সমাজের বিশিষ্টজনেরা পরিস্কারভাবে দুটি শিবিরে বিভক্ত।এক শিবির বা ডান শিবির শান্তি চুক্তির বিপক্ষে যেহেতু তারা দেখতে পাচ্ছেন এই চুক্তি বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জাতীয় অখন্ডতা হুমকির সম্মুখীন করবে।অন্য পক্ষ বাম শিবির চুক্তির পক্ষে।সামরিক বাহিনির বর্তমান ও সাবেক বিভিন্ন উচ্চ পদস্থ অফিসারদের মতে এই চুক্তি স্বাক্ষরের পুর্বে সামরিক বাহিনীর সাথে কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক আলোচনাই করা হয়নি।এবং এই কারনেই চুক্তির অনেক খুঁত থেকে গেছে।এবং আজ ২০১১ সালে এসে এই খুঁত বিশাল আকার ধারন করেছে।

বাংলাদেশ ১৯৮৯ সালে ILO CONVENTION 169 অনুমোদন করেনি।বাংলাদেশ ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ভোট দেয়া থেকেও বিরত থেকেছে।এখন ২০১১ সালের আগষ্টে ষড়যন্ত্রের আবহে এক অশুভ বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে।কিছুটা পেছন ফিরলে দেখা যায়-কমপক্ষে ২১ বছর আগে কিছু উত্তর-পশ্চিম ইউরোপিয়ান এবং কিছু বাংলাদেশী মিলে চিটাগাং হিল ট্রাক্টস কমিশন গঠন করে।তারা PCJSS কতৃক সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশ সরকার এবং সামরিক বাহিনীর ভুমিকার সমালোচনায় তৎপর।তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের ভালো কিছুই দেখতে পায়নি এবং সামরিক বাহিনীর কঠোর পরিশ্রমের ও মোটেও ভালো কোন দিক দেখতে পায়নি।পার্বত্য এলাকার বিদ্রোহীরা এই কমিশনকে বন্ধু হিসেবে খুঁজে পেয়েছে।জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ আদিবাসী ইস্যুর জন্য জাতিসংঘ আদিবাসী স্থায়ী ফোরাম নামে একটি ফোরাম গঠন করে।এই ফোরামে Lars-Anders Baer নামে এক ব্যক্তিকে মনোনীত করে যার কাজ হচ্ছে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা।Mr.Lars-Anders Baer কয়েক মাসের মধ্যে তার রিপোর্ট পেশ করে।স্থায়ী ফোরামের এই রিপোর্ট ২০১১ সালের ২৯ জুলাই অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধিবেশনে বিবেচনা করা হয়।স্থায়ী ফোরামের এই রিপোর্ট একটি দলিলে সংযুক্ত করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ২০১১ সালের অফিসিয়াল রেকর্ড সম্পুরক নম্বর:২৩ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।এই রিপোর্টের ১০২ নম্বর অনুচ্ছেদে Mr.Lars-Andars Baer বাংলাদেশ সরকারের জন্য কিছু নির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়। চারটি সুপারিশের মধ্যে দুটি সুপারিশ বাংলাদেশের স্বার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক আক্রমনাত্মক।এই সুপারিশের শিকড় হচ্ছে ১৯৯৭সালের শান্তি চুক্তি,১৯৮৯সালের ILO CONVENTION, ২০০৭ সালের ১৩সেপ্টেম্বরের UN DECLARATION ।

বাংলাদেশের জনগন মিডিয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত জানতে পেরেছে।বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের এ সিদ্ধান্তের সাথে ভিন্নতা পোষন করেছে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ চায় বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিক।বাংলাদেশ সরকার তা প্রত্যাখান করেছে।পাহাড়ি জনগনকে আদিবাসি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ভয়াবহতার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক মনে হচ্ছে।

পত্রিকা পাঠক,ব্লগার,ব্লগ ভিজিটর এবং সাধারন জনতা কি এই ভয়াবহতা সম্পর্কে সজাগ???আমি এ ব্যাপারে শুধু কয়েকটি কথা বলবো।যদি পাহাড়ি জনগনকে আদিবাসি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় তাহলে তিন ধরনের জটিলতা দেখা দিবে।

এক.পার্বত্য এলাকার সমস্ত জমির মালিকানা উপজাতি বা পাহাড়ি জনগনের হয়ে যাবে।বাংলাদেশ সরকার বা বাঙ্গালী জনগনের সেখানে কোনভাবেই জমির মালিকানা লাভের সুযোগ থাকবেনা।

দুই.পাহাড়ী এলাকার জন গনের অনুমতি ছাড়া পার্বত্য এলাকায় কোন ধরনের সামরিক কার্যক্রম এবং সামরিক উন্নয়ণ করা যাবে না।

তিন.পার্বত্য এলাকার ভিতর আবিষ্কৃত যে কোন খনিজ সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রে পাহাড়ী জনগন বা উপজাতিদের অগ্রাধিকার থাকবে।

অন্য আরো যে কোন জটিলতা ব্যতিরেকে এই তিনটি সমস্যাই পার্বত্য এলাকাকে বাংলাদেশের বাইরে আর একটি পৃথক রাজনৈতিক ভূখন্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথ সুগম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হবে।।যারা বাংলা ভাষা বলেনা বা বাঙ্গালি নয় তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য বাংলাদেশ সংবিধানে যৌক্তিক বিধান রাখা হয়েছে।এই বিধানকে আর ও উন্নত করা যায়।আমি পাহাড়ি জনগনের সুখ ও শান্তি কামনা করছি।

এবার প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশী যে সব বুদ্ধিজীবি পার্বত্য জনগন বা উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য মুখে ফেনা তুলছেন তারা কি এর ভয়াবহতা জেনে বুঝেই এসব করছেন নাকি বিদেশী প্রভুদের লোভনীয় প্রস্তাবে পড়ে এই ঘৃণ্য চক্রান্তে নিজেদের জড়িয়েছেন???বাংলাদেশের ভৌগলিক অখন্ডতা ও স্বার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।নইলে এর কড়া মাশূল গুনতে হবে সবাইকে।।
বিনীত,

ভাদানিক
২৮/০১/২০১২
০৪.১৫ এ এম