ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

বর্তমানে আমাদের দেশে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী নিপীড়ন মনে হচ্ছে অনেকখানি বেড়ে গেছে। অন্ততপক্ষে মিডিয়াওয়ালাদের সুবাদে আমরা যা বুঝতে পারি তাতে এই ভাইরাস মনে হচ্ছে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

ঘটনার সত্য-মিথ্যা তো আমরা বুঝিনা, মিডিয়াওয়ালারা আমাদের যা এনে দেয় তা নিয়ে আমরা হৈ চৈ করি,প্রতিবাদ করি,শিক্ষক সমাজকে ছি: ছি: করি। আর আমাদের মওলানারা, খিলাফতওয়ালারা তো আছেন। তারা সদর্পে প্রচার করে বেড়ায় এই সব বাতিল শিক্ষাব্যবস্থা,কুফরী শিক্ষাব্যবস্থা শুধু অনৈতিকতা শিক্ষা দেয়। তাই এই সবকে সমূলে ধবংস করতে হবে।

দয়া করে কেউ মনে করবেন না যে,আমি ঐ সব কুলাঙ্গারদের পক্ষে কিছু বলতে চাচ্ছি। যারা বা যে সব শিক্ষক এই সব অপকর্ম করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আমরা সবাই চাই।আমাদের বোনদের,আমাদের বাচ্চাদের এই সব কুলাঙ্গারদের হাত থেকে অবশ্যই নিরাপদে রাখতে হবে।

এখন আমি আমার একটা বাস্তব অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।

আমি চট্টগ্রামের কাজীড় দেউড়ীতে অবস্থিত সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের একজন শিক্ষক ছিলাম। ওখানে নার্সারি থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত আমাকে ক্লাস নিতে হতো। আমি এইসব ক্লাস নিতে খুব উপভোগ করতাম।এভাবে চলছিল,অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ কেউ কোন দিন কোন বিষয়ে কোন অভিযোগ করেনি,বরং প্রশংসাই পেয়েছিলাম।

একদিন আমি ক্লাস ফোরের একটা ক্লাস(লাস্ট পিরিয়ড) নিচ্ছিলাম। ছুটির ঠিক আগ মুহূর্তে ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাগ গোছাতে গিয়ে একটু হৈ-চৈ হয়,ঠিক ঐ মুহূর্তে হৈ-চৈ এর কারনে প্রথম সারির একটা বেঞ্চ আমার পায়ের উপর এসে পড়ল। পায়ে কী পরিমান আঘাত পেলাম সেটা আর উল্লেখ নাই বা করলাম। কারন এই দেশে আমাদের দিকে তাকানোর লোক এর বড়ই অভাব।

আচ্ছা যা হোক,যথারীতি স্কুল ছুটি হয়ে গেল।আমি ঐ তিনজন ছাত্রীকে যেতে না দিয়ে একটু শাসন করলাম (জাস্ট একটু বকাঝকা আর কনে ধরানো)। তারা সরি বলে চলে গেল।
তার ঠিক ১০ মিনিট পর..

ঐ তিনজন ছাত্রীর এক জনের মা আমার সামনে এসে হাজির। উনার সাথে আমার যে রকম আলাপ হয়েছে তা আমি তুলে ধরলাম।

অভিভাবক: আপনি আমার মেয়েকে মেরেছেন?
আমি: ওরা ক্লাসে আজ একটু বেশি দুষ্টুমি করেছে,তাই একটু বকাঝকা করলাম।
অভিভাবক: না,আপনি মেরেছেন। ঐ দেখেন আমার মেয়ে এখনো কাঁদছে। আপনি জানেন,বাংলাদেশে আইন আছে যে ছাত্র-ছাত্রীদের মারা যাবেনা।আপনি জানেন,আমি এখন আপনার বিরুদ্ধে কেস করে দিতে পারি।

(উনি এরকম অনেক কথা বল-ই যাচ্ছে,ঐ দিকে আমার একটা আঙ্গুল ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। আমার পরবর্তী আরেকটা ক্লাসের সময় হয়ে গেছে)

আমি : কিছুটা উত্তেজিত হয়ে,আমার এখন আপনার সাথে কথা বলার সময় নাই,আমাকে ক্লাসে যেতে হবে।আপনার যা বলার প্রিন্সিপাল স্যারকে গিয়ে বলেন।

(আমি এটা বলে ক্লাসে চলে গেলাম।কিছুক্ষন পর আমাকে অধ্যক্ষ মহোদয়ের কক্ষে ডাকা হলো। ঐ ভদ্রমহিলা অধ্যক্ষের সামনের চেয়ারে বসা আছে,ছাত্রীসহ।)

অধ্যক্ষ : আপনি আজকে ক্লাস ফোরের (ছাত্রীদের নাম উল্লেখ করে) মেরেছেন?
আমি : না স্যার,জাস্ট বকাঝকা করেছি।
অধ্যক্ষ : আপনি মেরেছেন। ওনারা কী মিথ্যা বলছে।

(ছাত্রীটিকে এর আগে অধ্যক্ষের রূম থেকে বের করে দেয়া হলো)

আমি চুপচাপ দাড়িয়ে আছি। কারন ওনারা এখন সম্পূর্ণ মিথ্যার উপর চলে গেছে। আমাকে ঘায়েল করানোটাই এখন ওনাদের আসল কাজ। আমার মাথার ভিতর তখন শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী নিপীড়নের পত্রিকার সব নিউজ গুরুপাক খাচ্ছে। আমি জানি,ওনারা খুব প্রভাবশালী। থানায় মামলা একটা ঠুকে দিয়ে আমাকে হেনস্তা করা ওনাদের জন্য এগুলো মামুলি ব্যাপার।

অধ্যক্ষ : আপনি কী দিয়ে মেরেছেন?
অভিভাবক : হাত দিয়ে।
অধ্যক্ষ: ছি: ছি: আপনি একজন শিক্ষক হয়ে মেয়েদের গায়ে হাত দেন।আপনি কোন ধরনের শিক্ষক।আপনার তো শিক্ষকতা করার কোনো অধিকার নাই।
আমি : চুপ! একের পর এক মিথ্যা অপবাদ দিয়ে যাচ্ছে। আমাকে কিছু বলার সুযোগ দিচ্ছে না।
অধ্যক্ষ : আপনি এখন যান। ২টি দরখাস্ত লিখে নিয়ে আসেন। একটাতে আপনি যে ছাত্রিকে মেরেছেন সেটা উল্লেখ করবেন,অন্যটাতে আপনি যে তাদের গায়ে হাত দিয়েছেন। সেটা উল্লেখ করবেন।
আমি : স্যার,এইসব তো মিথ্যা। কেন আমি লিখতে যাবো?
অধ্যক্ষ্ : অন্য দু’জন ছাত্রীর অভিভাবকও থানায় যাচ্ছে আপনার বিরুদ্ধে মামালা করার জন্য। ওনাদেরকে আমি আপাতত বুজিয়ে-সুঝিয়ে রাখছি।এখন আপনি যদি এগুলো স্বীকার করে ২টা দরখাস্ত দেন তাহলে আমি দেখব।অন্যথায় যা করার আপনি-ই করবেন।
আমি: মনে মনে ভাবলাম,অধ্যক্ষ হ্য়তো আমাকে বাঁচানোর জন্য একটা কৌশল বেঁছে নিয়েছে। তাই আমি,

” ছাত্রীকে মারার জন্য ক্ষমা চেয়ে আবেদন” এবং
” ছাত্রীকে হাত দিয়ে মারার জন্য ক্ষমা চেয়ে আবেদন”

এই দুই বিষয়ে দুটি দরখাস্ত লিখে অধ্যক্ষ বরাবর দিলাম।যদিও সব মিথ্যা।আমি মনে করলাম, স্যার আমাকে রক্ষা করার জন্য এই ধরনের কিছু কৌশল আশ্রয় নিচ্ছেন।তাই ওনার উপর সরল বিশ্বাসে দুটি মিথ্যা দরখাস্ত লিখলাম।

অভিভাবক চলে গলেন।আমিও অধ্যক্ষের রুম থেকে বের হয়ে এলাম।
রাগে,ক্ষোভে,অভিমানে তৃতীয় দরখাস্ত (রিজাইন লেটার) লিখতে বসে গেলাম।আমার অন্য কলিগরা ঘটনা বুঝতে পেরে বলল,
“আপনি যদি রিজাইন লেটার দেন,তাহলে এখন যে দুটি দরখাস্ত লিখেছেন,সে দুটিকে ডকুমেন্ট হিসেবে ধরে আপনাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করবে।চুপচাপ এবং স্বাভাবিক থাকেন”
আমি ওনাদের কথা শুনে চুপচাপ এবং স্বাভাবিক ছিলাম।এভাবে প্রায় ১৫ দিন চলে গেল।
একদিন ক্লাসে ঐ ছাত্রীদের অন্য দু’জনকে প্রশ্ন করলাম,
“আমি যে একদিন তোমাদের বকাবকি করেছি এবং কানে ধরে দাড় করিয়ে রেখেছিলাম সেটা কি তোমাদের মা-বাবাদের বলেছিলে?”
তারা বলল,”না,স্যার,মা-বাবাদের কেন বলতে যাব?আমরা অন্যায় করেছি তাই আপনি আমাদের শাসন করেছেন।”
তারা আমার পায়ের অবস্তা জানতে চাইল এবং আবারও সরি বলল।
তাদের এই আচরণ দেখে আমার চোখ দিয়ে অশ্রু নামল।
তাহলে ঐ দিন অধ্যক্ষ এই দুইজন ছাত্রীর অভিভাবকদের সম্পর্কে যা বললেন সব মিথ্যা।

একটা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে কিভাবে এই রকম ব্যক্তিত্বহীন লোকের মত আচরন করলো আমার বোধগম্য নয়।
এখন আমার প্রশ্ন—

১) ঐ অভিভাবক কী নিজের বাচ্ছা মেয়েটিকে জরিয়ে কিছু খারাপ কথা বলে পত্রিকার হেডলাইন হতে চেয়েছিলেন?

২)অধ্যক্ষ কেন আমাকে দিয়ে দুটো মিথ্যা দরখাস্ত লিখালেন? ওনি কী ঐ অভিভাবকের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে ভয় পেয়েছিলেন? নাকি আমার মতো একজন সাধারণ শিক্ষককে হেনস্তা করে নিজের ব্যক্তিত্ব জাহির করতে চেয়েছিলেন?

৩) এই সব কোমলমতি বাচ্চাদের যেখানে এইসব ঘটনা থেকে দূরে রাখতে হবে সেখানে কেনো তাদেরকে জরিয়ে এগুলো রটানোর চেষ্টা অভিভাবক এবং অধ্যক্ষের? কার স্বার্থে,কিসের প্ররোচনায়?

আমি এই লেখাটা শুরু করেছি আমাদের দেশে চলমান কিছু ঘটনার উল্লেখ করে এবং শেষ করলাম আমার একটা ব্যক্তিগত ঘটনা এবং কিছু প্রশ্ন দিয়ে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু কুলাঙ্গার আছে। আরেক শ্রেণি আছে যারা শুধু শিক্ষাটাকে নিয়েছে টাকা কামানোর অস্ত্র হিসেবে। কিন্তু এর বাইরে বিশাল এক শ্রেণি আছে যারা শিক্ষাকে পেশা এবং নেশা হিসেবে নিয়ে পরম মমতায় আগলে আছে।শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে সন্তানতুল্য।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের কাছে তীর্থস্থান। আমাদের এই সব ত্যাগী শিক্ষকগণ যেন তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু পায়। সামান্য কয়েকজন কুলাঙ্গার এবং শিক্ষা ব্যবসায়ীর জন্য যেন আমাদের সম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার উপর কলঙ্কের কালি না পড়ে।

আমার অনেক পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আছেন ওনাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করে আজকের লেখাটি শেষ করলাম।