ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাস্থ্য

বাংলাদেশের হেলথ সার্ভিস অর্থাৎ সরকারী, বেসরকারী (স্বাস্থ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান) বা এন জি ও প্রদত্ত স্বাস্থ্য সেবা নিতে গিয়ে –

১। আপনি কি কোন বিড়ম্বনার সম্মুখীন হয়েছেন?
২। আপনি কি কোন আর্থিক, মানসিক, শারীরিক বা সামাজিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন?
৩। অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার কারণে কোন আপন জন হারিয়েছেন?
৪। অবহেলা- ভুল চিকিৎসার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বা কাউকে হতে দেখেছেন?

আমার কাছে কোন ভরসা যোগ্য দেশব্যাপী পরিচালিত জনমিতি (population statistics) নেই। কিন্তু কেন যেন মনে হয়, উপরের যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর আপনি যেই হোন না কেন, বাংলাদেশবাসী হলে, “হ্যাঁ” হবেই। আমি ১০০% নিশ্চিত। আসুন, মূল আলোচনায় যাবার আগে দেখি, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কি ধরণের সেবা পাওয়ার অধিকার আপনার আমার আছে।

বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার

চিকিৎসা একটি সেবা, অর্থাৎ Public Good। কোন ব্যবসা পণ্য নয়। এর মানে হলো, আপনি বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী স্থান, কাল, পাত্র, জাতি, ধর্ম, উপার্জন- এমন কি নাগরিকত্ব নির্বিশেষে বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত যে কোন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা সেবা পাওয়ার অধিকারী (per Section 15(A) of the Bangladesh Constitution, and develop the health and nutrition status of the people as per Section 18(A) of the Bangladesh Constitution.)

বাংলাদেশের হেলথ পলিসি আমাদেরকে বলে-

Health is defined as: “A state of complete physical, mental and social well-being and not merely the absence of disease or infirmity.”

অর্থাৎ শুধু নিরোগ হইলেই চলবে না, রাষ্ট্র আপনাকে আমাকে শারীরীক, মানসিক ও সামাজিক “ভালো থাকা”কে নিশ্চিত করতে অঙ্গীকার করছে।

সেই ভালো থাকার রূপটি কেমন?

১। Every Citizen has the basic right to adequate health care – চিকিৎসা সেবা পাওয়ার অধিকার
২। The State and the government are constitutionally obliged to ensure health care for its citizens – নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সরকারের
৩। To ensure an effective health care system that responds to the need of a healthy nation, a health policy provides the vision and mission for development. – একটি লিখিত নীতি দ্বারা উল্লেখিত
৪। Pursuance of such policy will fulfill the demands of the people of the country, while the health service providers will be encouraged and inspired. People’s physical well-being and free thought process have proved to be a precondition for the growth and intellectual enrichment in today’s human society — সেই লিখিত সনদ এর বাস্তবায়ন নাগরিকের চাওয়াকে মেটাবে, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহী করবে।

এর পাশাপাশি একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মানুষের সুস্বাস্থ্য ও স্বাধীন চিন্তা চেতনা আধুনিক মানব সমাজের উন্নয়ন ও মানসিক বিকাশের আবশ্যিক পূর্ব শর্ত।

স্বাক্ষরিত চুক্তি সমূহঃ Bangladesh expressed agreement on the declarations:

১। Alma Ata, 1978
২। The World Summit for Children 1990
৩। International Conference on Population and Development, 1994
৪। Beijing Women’s Conference, 1995

Ministry of Health & Family Welfare seeks to create conditions whereby the people of Bangladesh have the opportunity to reach and maintain the highest attainable level of people health. It is a vision that recognizes health as a fundamental human right and therefore the need to promote health and reduce suffering in the spirit of social justice

এইটা আমাদের বাংলাদেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের “vision” আর এইটা হইলো “objective”

ভিশন অনুযায়ী , তিনটা বিষয় গুরুত্ব পূর্ণ। অর্জনযোগ্য সর্বোচ্চ স্তরের স্বাস্থ্য, মৌলিক মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যয় অর্জনের সাথে দেশের স্বাস্থ্য অধিকার-সেবা – সিস্টেমকে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে ।

মন্ত্রনালয়ের ওয়েবসাইটে আরো দেওয়া আছে এই সব ভিশন, মিশন, অবজেকটিভ, গোল ইতাদি অর্জন করার রুপ রেখা। তার ভিতরে একটি গুরুত্ব পূর্ণ সনদ হইলো আলমা আটা ১৯৭৮ । একটা চুক্তি যাতে বাংলাদেশ সরকার সাইন করে এই প্রতিজ্ঞা করেছে যে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য সেবা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। এই কারণেই প্রতিটা স্বাস্থ্য, মা, বাবা, নাতি-পুতি, বন্ধু দিবসে, নিরাপদ পানি, ভাত, পায়খানা দিবসে, এবং বিভিন্ন আমাশা, ডায়রিয়া, এইডস, ম্যালেরিয়া দিবসে ঘুরে ফিরে এই “সকলের জন্য স্বাস্থ্য” বাক্যটি বারংবার উচ্চারিত হয়।

এইবার আসুন দেখি, বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে এই সব ঘোষণা ও দিবসের কি হাল?

এইখানে ১৯৯৭-২০০৭ সন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যখাতের খরচের হিসাব আছে ।

এইখানে আছে হাসপাতাল গুলোর রিপোর্ট কার্ড ২০০৭

কারা সেবা প্রাপ্ত হয়, সেই বেনিফিশিয়ারি রিপোর্টের পিডি এফ টাই নামানো গেলো না। মুমূর্ষু পি ডি এফ নিজেই।

এত গেলো সরকারী হিসেব কিতাবে। এখন কাজীর গরু মাঠে নামলে কি দেখা যায়?

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, মেডিকেল স্টুডেন্টদের এক নম্বর পছন্দের কলেজ ঢাকা, দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা ব্যবস্থা (টারশিয়ারি) একাডেমিক মেডিকেল হসপিটাল ঢাকার রাতের অবস্থা

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে ব্লগার রেজোয়ানসহ অনেকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

বিশেষজ্ঞসহ ডাক্তাররা স্বাস্থ্যসেবার সরকারী খাত ছেড়ে পালাচ্ছেন ।

রাজধানী ছেড়ে একটু বাইরে গেলেই স্বাস্থ্যসেবা কেতাবী গরু হয়ে যায়। দূর ভোলার চিত্র কি হতে পারে? সমকালের রিপোর্ট ঝাড়ুদার যখন ডাক্তার!

ভুক্তভোগী রোগী ও দর্শক হিসেবে আমাদের কু-অভিজ্ঞতার শেষ নাই। ডাক্তাররা নিজেরা কি বলছেন?

বেসরকারি ব্যয়বহুল হাসপাতালে সুযোগ-সুবিধা বেশি, এটি সত্য। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে কোনো সরকারই চিকিৎসকদের মেধার গুরুত্ব দেয়নি। বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নে রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য হয়ে গেছে। তাই হতাশ ও বাধ্য হয়ে তাঁরা চাকরি ছেড়েছেন।

ঢাকার বাইরে বেশির ভাগ জায়গায় এখনো সপরিবারে থাকার মতো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। মূলত সে কারণেই তিনি চাকরি ছেড়েছেন।

তাঁর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ যে বিষয়ের ওপর, তা প্রয়োগের জন্য ঢাকাই একমাত্র জায়গা

কিন্তু তাঁকে বদলি করা হয় টাঙ্গাইলের একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে রোগীদের প্যারাসিটামল ও হিস্টাসিন দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ ছিল না।

চিকিৎসকদের বদলির ভয়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রভাব পড়ছে দরিদ্র সাধারণ মানুষের ওপর।

এক সময় বিএনপি-সমর্থিত ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) একজন ব্যক্তি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখন স্বাচিপের অসংখ্য দরবেশ, মোয়াজ্জিন গজিয়েছে। তাদের তোষামোদ করে চলা কোনো সুস্থ, শিক্ষিত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনিও চাকরি ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।

এর পাশাপাশি বেতন বৈষম্য নিয়ে একজন পাঠকের মন্তব্য :

একজন অধ্যাপক চিকিৎসকের সর্বচ্চ বেতন ৪০,০০০ টাকা। একজন সদ্য প্রকৌশলী তো এই বেতনে চাকরী করতে চাইবেন না।

সূত্রঃ প্রথম আলো

এবার আলোচনাঃ

উপরের উদাহরণ গুলো থেকে দেখা যাচ্ছে , স্বাস্থ্য সেবা খাতের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রদানকারী এবং রোগীরা কেউই ভালো নেই। সংবিধান এবং স্বাস্থ্যনীতি আমাদের যে “ভালো থাকার” অঙ্গীকার করে, বাস্তবে তার দেখা পাওয়া মুশকিল। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ,

প্রধানমন্ত্রীর কানের চিকিৎসা করার সামর্থ বাংলাদেশে নাই। মন্ত্রী , সাংসদসহ সকল ধনী ব্যক্তিরা পারলে বিদেশে চিকিসা নেয়। গরীব লোকেরা সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, আমেরিকা না পারুন, অন্তত পাশের দেশ ভারতের কোলকাতা, মাদ্রাজ -এ গিয়ে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই রকম হযবরল অবস্থা ও ভেঙে পড়ার কারণ কি?

অনেকেই বলেন আমাদের-

১। জনবল, যন্ত্রপাতি ও অর্থের অভাব। যথাযত পলিসির অভাব।
২। মানুষের স্বভাব চরিত্র (মূলত ডাক্তার) খারাপ, সেবা দেওয়ার সঠিক মনোভাব নাই।
৩। প্রচুর প্রস্তাবে মানুষ ভেটো দিয়ে বসে থাকে। যেমন – হাসপাতালের টিকেটের দাম বাড়ানো যাবে না অথচ এমনিতেও আগত রোগীদের পকেট থেকে শত শত টাকা খরচ হয়ে যায়।
৪। স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের জন্য অর্থ খরচের বেলায় দাতা দেশের কাছে হাত পেতে বসে থাকতে হয় অথচ সকল প্রকার চিকিৎসা “ফ্রি” ।
৫। সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বলতে কতগুলো ইটকাঠের বিল্ডিং করে রাখা হয়েছে কিন্তু সেই অবকাঠামো চালাতে হলে পারিপার্শ্বিক যেই সুযোগ সুবিধা (পলিসি, জনবল, বিদ্যুৎ, পানি থেকে শুরু করে জীবন যাপনের মৌলিক চাহিদা পূরণের উন্নত ব্যবস্থা) দরকার , সেসবের সমন্বয় করতে বলতে “ ইহা আমাদের দায়িত্ব নহে” ধরনের মনোভাব।

আমাদেরকে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, দেশের ভিতরে যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমেই দরকার হবে সেই সমস্যার আদ্যপান্ত বিশ্লেষণ করে তার সমাধানে একটি রূপরেখা । রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাই যে কোন চাহিদা পূরণে বা সমস্যার সমাধানে দেশব্যপী বাস্তবায়নের একটি পলিসি পেপার থাকে। সেই পলিসি পেপারে সমস্যার উল্লেখ, চরিত্র ও সমাধানে করনীয় মূল দর্শন উল্লেখিত থাকে। এজন্য,

প্রতিটা সমস্যার সমাধানে আমরা আগে দেখবো সেই সমস্যার ব্যাপারে আমাদের স্বাস্থ্যনীতি না পলিসি পেপারে কি বলা আছে, তারপর এর বাস্তবায়নে কি কি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা, এবং তারপর বাস্তবতার নিরিখে এর সমাধান/ প্রস্তাবিত সমাধান।

আমাদের জনবল এর অভাবঃ

সন্দেহ নেই যে আমাদের জনবলের অভাব আছে । সেইটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবী জুড়েই আছে । ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন এর এই ওয়েব সাইটে গেলে এ বিষয়ে নানা তথ্য পাবেন। বিশ্বব্যপী স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা মাপার জন্য জনপ্রতি ডাক্তারের সংখ্যা হিসাব করা হয়। পরিমাপ হিসেবে এর কার্যকারিতা খুব একটা ভালো নয়। কারণ এ

কজন ডাক্তার ঠিক কয়জন নাগরিকের স্বাস্থ্যের দেখভাল করতে পারবেন তা নির্ভর করে সেই ডাক্তার, প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো , টেকনোলজির পাশাপাশি লোকালয়ের মানুষ কে কয়জন কি ধরণের অসুখে ভুগেন তার উপর।

সুতরাং, আমেরিকা কিংবা ইউরোপে বসে আম একজন ডাক্তার হয়ত ৩০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যের দেখা শোনা করতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া কিংবা বেনিনে তা সম্ভব নয়। সুতরাং, জনবলের সংখ্যা তাত্ত্বিক হিসেব করে ডাক্তারের সংখ্যা বাড়ালেই সেবার মান বৃদ্ধি হবে না।

আমাদের যন্ত্রপাতির অভাবঃ

হেলথ টেকনোলজি বলতে আমরা অনেকেই স্বাস্থ্য খাতের ল্যাবরেটরি এবং তার যন্ত্রপাতি , সুঁচ সিরিঞ্জ বুঝি। টেকনোলজিস্ট বলতে এখনো বাংলাদেশের ডাক্তার, ডেন্টিস্ট, নার্স ও পলিসি মেকাররা ঐ ল্যাবে কাজ করেন যারা, তাদেরকে বুঝেন। আসলে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে হেলথ টেকনোলজি বলতে বুঝায়:

১। সব ধরণের ফার্মাসিউটিক্যালস । এর ভিতর ওষুধের পাশাপাশি ভ্যাক্সিন, টিকা, হোমিওপ্যাথি সব রকম কেমিকেলই পড়বে।
২। স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহৃত সকল প্রকার যন্ত্রপাতি বা ডিভাইস । সেইটা সুতাও হইতে পারে, সিটি স্ক্যানারও হতে পারে, আবার মোবাইল টেলিফোন সহ যে কোন মোবাইল ডিভাইস যা রোগ প্রতিরোধ, রোগের নির্ণয় বা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে ।
৩। যে কোন ধরনের মাইনর ও মেজর সার্জিকাল প্রসিডিউর । মানে কাটাছেঁড়ার পদ্ধতি । ট্রিট্মেন্ট প্রটোকল ( যেমন – ক্যান্সার চিকিৎসার গাইড লাইন) এবং ক্লিনিকাল গাইড লাইন।
৪। এমন কি স্বাস্থ্য সেবা কি ভাবে সাজানো গুছানো থাকবে এইটাও টেকনোলজির অন্তরভূক্ত ।

এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে এইখানে ক্লিক করুন:
health technology include the following.

• Drugs: e.g., aspirin, beta-blockers, antibiotics, HMG-CoA reductase inhibitors (“statins”)
• Biologics: vaccines, blood products, cellular and gene therapies
• Devices, equipment and supplies: e.g., cardiac pacemakers, CT scanners, surgical gloves,diagnostic test kits
• Medical and surgical procedures: e.g., psychotherapy, nutrition counseling, coronary angiography, gall bladder removal
• Support systems: e.g., electronic patient record systems, tele-medicine systems, drug formularies,blood banks, clinical laboratories
• Organizational and managerial systems: e.g., prospective payment using diagnosis-related groups, alternative health care delivery configurations, clinical pathways, total quality management programs

এখন কথা হলো,

ক) এই টেকনোলজি গুলোর কয়টা আমাদের দেশে কোনখানে কয় পিস করে লাগবে, বেশি আছে না কম, কয়টা রোগীর জন্য কয়টা টেকনোলজি আসলেই দরকার -সেই সব ডাটা সংগ্রহ করা হয় কি?

-না হয় না। এই ধরনের ডাটা কালেকশন , এনালাইসিস এবং প্রাপ্ত রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে যদি ডিসিশন নেওয়া হত তাহলে আমাদের অলরেডি অপ্রতুল রিসোর্স ( সেইটা জনবল, টেকনলজি বা অর্থ- সবই হতে পারে) কে এলোকেশন বা ভাগাভাগি করার সিদ্ধান্ত গুলো আরেকটু সঠিক হত। সম্পদের অপচয় হত না।

খ) বাংলাদেশ এখন যেই সব টেকনলজি ব্যবহার করে তাদের ভিতরে কোনটা কতটুকু নিরাপদ, কতটুকু ইফেক্টিভ ( যা করার কথা তা করে কি না) কতটুকু কস্ট ইফেক্টিভ ( সর্বনিম্ন দামে সর্বোচ্চ উপকার দেয় কিনা বা মূল্যের বিপরীতে পাওয়া উপকারের পরিমাণ) তা স্টাডি করা হয় কি না?

না হয় না । আমরা অন্ধের মত উন্নত বিশ্বের দেওয়া প্রেস্ক্রিপশন অনুকরণ করি। যদিও তাদের প্রেক্ষাপটে যা অমৃত , আমাদের প্রেক্ষাপটে তা বিষ হতে পারে। আবার, দামী দামী অনেক যন্ত্রপাতি কিনে এনে চালাতে পারি না, ফেলে রাখি। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক যন্ত্র অনুদান দেয়, যা অনেক সময় আউট ডেটেড বা সমস্যাযুক্ত।

প্রচুর প্রযুক্তি দাতা দেশের কোন কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে । যেমন ভিটামিন যুক্ত ফর্টিফায়েড বিস্কিট কিংবা প্লাম্পি নাট

মানুষের খাবার উৎপাদন কিংবা ক্রয় ক্ষমতা অর্জনে উপার্জনের ব্যবস্থা না করে ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করে এই নাট কেন খেতে হবে ? আবার, সবার জন্য নিরাপদ পানির সরবরাহে দেশীয় বিনিয়োগে পানি শোধনাগার স্থাপন না করে কেন কলেরা ভ্যাক্সিন উৎপাদন করতে হবে?

এই গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালা কর্মকান্ড গুলার কারণ হইলো সঠিক এভিডেন্স বেজড ডিসিশন মেকিং প্রসেসের অভাব।

গ) টেকনোলজি গুলোর দাম কি আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত?

এক ওষুধ ছাড়া আর কিছুই আমাদের দেশের জন্য উপযুক্ত দাম নিয়ে আসে না। ওষুধ দেশীয় কোম্পানি গুলো তৈরী করে বলে তাও কিছুটা গা সোয়া। আগের ওষুধ নীতি অনুযায়ী উৎপাদন মূল্যের উপরে মাত্র ২০% লাভে ওষুধের দাম নির্ধারিত হত । পরে ওষুধ কোম্পানি গুলোর লবিং এর কারণে পলিসিতে পরিবর্তন করা হয়, এখন কোম্পানি গুলো ইচ্ছামত দাম নির্ধারণ করতে পারে। বিদেশে নতুন ওষুধ গবেষণায় বিলিওন বিলিওন টাকা ইনভেস্ট করে বলে কোম্পানি গুলোকে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে যাতে গবেষণায় উৎসাহ পায়। কিন্তু বাংলাদেশের কোন কোম্পানিরই রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট এ কোন বিনিয়োগ নেই। এরা সকলেই জেনেরিক ড্রাগ বা অন্যের আবিষ্কার করা ফর্মূলায় নিজেদের ওষুধ উৎপাদন করে। সুতরাং, এই ইচ্ছেমত দাম নির্ধারণের সুবিধা পাওয়াটা এক রকম সাংবিধানিক অধিকার লংঘন করে নাগরিকের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।

ঘ) টেকনোজির দাম সহনীয় রাখতে দেশে উৎপাদন সম্ভব?

অবশ্যই সম্ভব। এমন অনেক টেকনোলজি আছে যেইটা দেশেই উৎপাদন করা যায়, আমদানি করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু উদ্যোগ। কিন্তু হায় হতিস্মি! দেশে একটা কম্পিউটার উৎপাদনের কোম্পানি নেই, কিন্তু বুয়েটসহ সকল টেকনিকাল ভার্সিটিতে সবাই হাক ডাক দিয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ায়। অথচ একটা ভার্সিটিও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে না। আমাদের ছেলে মেয়েরা নাসার জন্য রোবট বানাইতে খুবই উৎসাহী কিন্তু দেশের ১৬ কোটি মানুষের ব্যবহারে লাগবে এমন হেলথ টেকনোলজির কোটি কোটি টাকার মার্কেট পড়ে আছে অবহেলিত।

ডাক্তারদের গালি দেওয়ার লোকের অভাব নাই। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বলা যায়, ডাক্তাররা যদি এক একটা কসাই হয়, তাহলে দেশের হেলথ টেকনলোজির অবহেলিত মার্কেটের জন্য ইঞ্জিনিয়াররাও এক একটা কসাই। চাঁদের দেশে মাটি কেমনে তোলা যাবে- এইটা নিয়ে চিন্তা করতে ভালো লাগে , কিন্তু নিজের দেশের মাটির প্রতি কোন দায় দায়িত্ববোধ এদের নাই। কেন বলছি? বুয়েট আর ঢাকা মেডিকেল পাশাপাশি। যতদিন ঢাকা মেডিকেলে ছিলাম, বহুবার বুয়েটের বন্ধুরা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে, বেড়াতে, সিঙ্গারা খেতে, প্রেম করতে এসেছেন- কিন্তু আজ পর্যন্ত দেখিনি বা শুনিনি কেউ এসে বলেছেন – মেডিকেলের এই সমস্যাটার সমাধান এই ডিজাইন দিয়ে করা যায়- কিংবা, ঐ সমস্যাটার একটা টেকনোলজিকাল সমাধান সম্ভব! এই অভিযোগ আমার নিজের বন্ধুদের বিরুদ্ধেও। কষ্ট লাগে যখন ভাবি,

বুয়েটের বন্ধুরা প্রয়োজন হলে মেডিকেলে এসে বন্ধুর জন্য রক্ত দিয়ে গেছে – অথচ তাদের মাথায় একবারো আসে নাই যে তার শিক্ষা ও জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রটাও তো হতে পারে ঢাকা মেডিকেল! আমি ডাক্তার হয়ে যখন নিজে হেলথ টেকনোলজি নিয়ে শিক্ষা লাভ করলাম, তখন জানলাম , আমার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুদেরও অনেক কিছু করার ছিলো , আছে- কিন্তু তারা এসব নিয়ে ভাবেই না! টিকেটিং সিস্টেম, পেশেন্ট রেকর্ড, পেশেন্ট ডাটাবেজ, মনিটরিং সিস্টেম, ড্রাগ ডিস্পেন্সারী ও কন্ট্রোল, ডিউটি রোস্টার, কমিউনিকেশন, লজিস্টিক্স , ম্যানেজমেন্ট — কত কিছুই না ইঞ্জিনিয়ারদের উপর নির্ভরশীল, টেকনোলজিস্টদের উপরে নির্ভরশীল- কত্ত কিছু করার আছে!

আমাদের অর্থের অভাব:

এইটা একটা আরোপিত জুজুর ভয় জনিত সমস্যা । সন্দেহ নাই যে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের হার্টের একটা করে পেস মেকার, একবার করে এম আর আই / সিটি স্ক্যান কিংবা ৩০টা করে সিপ্রোফ্লক্সাসিন দেওয়া মত টাকা আমাদের নাই। কিন্তু এইটা মোটেই সত্যি কথা না যে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে অর্থ দিয়ে চিকিৎসা সেবা কেনার সামর্থ নাই। আগেও বলেছি , হাসপাতালে আসতে যাতায়াতে, আসার পরে বিভিন্ন টেস্ট আর ওষুধের পিছনে মানুষের শত শত টাকা খরচ হয়।

কিন্তু টাকার কোন হিসাব নিকাশ নাই। এইটা কতিপয় কর্মকর্তা কিংবা দোকানীর পকেটে না ঢুকে সিস্টমেটিকালি সরকারী রেভেনিউ খাতে ঢুকলে হাসপাতাল গুলো অন্তত এখনকার চেয়ে বেশি ভালো ভালে পরিচালিত হতে পারত ।

দেখুন, আমাদের দেশের মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব । এর জন্য যদি প্রতিনিয়ত দাতার কাছে ভিক্ষা চাইতে হয়, সে তো কুকুর লেলিয়ে দেবেই। তখন সেই কুকুরকে ডগ বিস্কিট খাওয়াতে আমাদের ঋণের অর্থ শেষ হয়ে যাবে। ঠিক এই কারণেই কষ্ট করে হলেও আমাদের উচিত স্বাস্থ্যখাত পরিচালনার পয়সাটা সঠিক জায়গায় দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এখন, সেই দেওয়াটা কি ভাবে হবে ট্যাক্স নাকি হেলথ ইন্সুরেন্স – এইটা আলোচনার দরকার আছে ।

অনেকেই মনে করেন, এখনকার পরিস্থিতিতে আমার যখন দরকার হচ্ছে আমি শুধু তখনই , নিজের জন্য টাকা খরচ করে চিকিৎসা নিচ্ছি । আর দরকার না হলে খরচ করছি না। এতে খুউউউউব লাভ হচ্ছে। কিন্তু সত্যি কথা হলো , ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে আপনাকে যখন চিকিৎসা নিতে হচ্ছে- সেইটা জীবনে একবার হলেও – আপনি এক সাথে এত বেশি টাকা খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন যে ঐ একবারেই আপনাকে পথে বসে যেতে হতে পারে।

***
চাই ‘সমান উন্নয়ন সবার জন্য’, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ পাল্টে – পর্ব ২

***
ফিচার ছবি কৃতজ্ঞতা: জামাল ভাস্কর।