ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

নতুন জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি অনুযায়ী, এম বি বি এস সনদ পেতে হলে ইন্টার্ন ডাক্তারদের ১ বছর গ্রামে থাকতে হবে। সরকার এর সদিচ্ছা সম্পর্কে কোন সন্দেহ না রেখেই বলছি- আপনারা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার প্রবাদ বাক্যটা শুনেছেন?

সনদ পাওয়ার জন্য ঘাড়ে ধরে গ্রামে পাঠানোর প্রকল্পটা শেষ পর্যন্ত ঐ অবস্থাতেই পৌঁছাবে বলে মনে করছি। এখনো নতুন স্বাস্থ্যনীতি পড়ে দেখবার সুযোগ হয়নি, ওয়েবে খুজে বেড়াচ্ছি। তারপরেও, আমাকে কেউ বলতে পারেন এম বি বি এস ছাড়া বাকি যে সব ক্যাডারের পেশাজীবী স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকেন , সেই সব প্রফেশনের ব্যাচেলর গ্রাজুয়েটদের গ্রামে থাকার বিধান কি করা হয়েছে?

অন্য কারো গ্রামে থাকার প্রয়োজন নেই? একলা এমবিবিএস একাই সব করে ফেলবেন?

ডাক্তারদের ভিতরে এমবিবিএসরা সাধারণত ব্রাহ্মণ সমাজ হিসেবে স্বীকৃত, কারণ বিডিএস বা ডেন্টিস্ট, নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট কিংবা প্যারামেডিক গ্রাজুয়েটদের পলিসি বা ইমপ্লিমেন্টেশন- কোন জায়গাতেই কোন পাত্তা দেওয়া হয় না। এরা কি? এরা কেন? এরা কোন গ্রহ থেকে আসে, কোথায় থাকে- এইটা একটা বিরাট বিস্ময় বোধক চিহ্ন!

ডাক্তার, বড় জোর নার্স – এর বাইরে সরকারী স্বাস্থ্য সেবা, কিংবা এই সেবাদানে এঁদের অবদান প্রথমোক্ত দুই ক্যাটাগরির পিছনে হারিয়েই যায়।

এদেরকে বা এদের প্রতিনিধিদের আপনি কোন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পলিসি মিটিং, মতামত বিনিময় সভা কিংবা কোর্স কারিকুলাম এর মিটিং এ পাবেন না । কোন সভা সেমিনারে দেখবেন না। জাতীয় পত্র পত্রিকায়, টেলিভিশনে – স্বাস্থ্য সেবার উন্নতি- বিষয়ক কোন বক্তব্য দিতে শুনবেন না। হঠাৎ মনে হবে, পৃথিবীতে একমাত্র এমবিবিএস ডাক্তার দিয়ে ভরে ফেললেই মনে হয় সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয়ে যাবে। তার চেয়েও বড় কথা- সকলের জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত কি ভাবে করতে হবে- এইটা জানা বা বুঝার পূর্ব শর্ত হচ্ছে এমবিবিএস পাশ করা। কারণ – বাকি সবাই মূর্খ!

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ডেন্টাল কলেজ ঢাকা ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রতিষ্ঠার ৩৫-৩৭ বছর পরেও ডেন্টাল কোর্সের সিলেবাস ঠিক করে দিতেন এমবিবিএস ডাক্তার বা কর্মকর্তারা। ডিজিএইচএস এর এই অদ্ভুত খেয়াল কেন তা আজো বুঝিনি।

একই রকম ভাবে – নার্সিং, প্যারামেডিক্স , ল্যাবরেটরি কিংবা হেলথ এসিস্টেন্টদের সিলেবাসও কি এমন ভাবেই প্রবর্তিত হয়? জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে এই নন- এম বি বি এসরা কি সমান গুরুত্ব পেয়েছেন?

প্রতি একজন এম বি বি এস গ্রাজুয়েটের কাজে কর্মে সাহায্য করার জন্য প্রায় ৯ প্যারামেডিক বা প্যারা প্রফেশনাল ক্যাডারের লোক লাগে। ( এইটা ওয়ার্লড হেলথ অর্গানাইজেশনের গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে)।

বাকি নয় ধরনের লোকবল কি ইন্টার্নরা পাবেন?

সরকার স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এর কথা উঠলেই কেবল এম বি বি এস শিক্ষার জন্য মেডিকেল কলেজ বাড়াবার কথা ভাবেন। কিন্তু একজন এম বি বি এস ডাক্তারের কাজে সহায়তা দিতে এবং সর্বোপরি , একজন রোগীর স্বার্বিক তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে যে আর কয়টি প্রফেশনের লোক লাগে, যেমন-

১। বিভিন্ন স্কিলের নার্স

২। বিভিন্ন স্কিলের প্যারামেডিক

৩। ভিন্ন ভিন্ন স্কিলের এসিস্টেন্ট

৪। সাপ্লাই ও ম্যানেজমেন্টের জন্য ভিন্ন ভিন্ন স্কিলের কর্মকর্তা ও ম্যানেজার

৫। সকলেরই কম্পিউটার ব্যবহারের শিক্ষা থাকা উচিত , তারপরেও ইনফরমেশন সিস্টেম ম্যানেজমেন্টের লোক ইত্যাদি ।— তাদের তৈরী করার ব্যাপারটা কি হবে?

সরকার কি সমান গুরুত্ব ও সমান মানসম্পন্ন সাপোর্টিভ হেলথ প্রফেশনালদের সৃষ্টি করার কথা স্বাস্থ্যনীতিতে রেখেছেন?

লোকবল তৈরী ছাড়াও সমস্যা হচ্ছে গ্রামে যেই জায়গায় পাঠানো হচ্ছে , সেই জায়গায় কাজ করার পরিবেশ আছে কি না।

ছোট্ট একটা বাস্তব অভিজ্ঞতাঃ
মেহেরপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখি ডেন্টিস্ট এর কক্ষে একজন কর্মচারী বসে রোগী দেখছে। ডেন্টিস্ট এর কাজ করার জন্য যে ডেন্টাল চেয়ার প্রয়োজন – তা নেই। সেখানে একটা ভাঙা চোরা পুরনো ডেন্টাল চেয়ারের মৃতদেহ পড়ে আছে। ডেন্টিস্ট নিজে শহরের বাজারে নিজের প্রাইভেট ক্লিনিকে প্রাক্টিস করতে গেছেন। ডাক্তারের কক্ষে একজন কর্মচারী কেন বসে ডাক্তারী করছেন- সে তদন্ত আর করার সুযোগ হয়নি। এখন একজন ডেন্টিস্ট এর ঠিক ঠাক মত কাজ করতে হলে চাই একটা ডেন্টাল চেয়ার, নিয়মিত অফিস করছেন কি না, সেই মনিটরিং এবং ডেন্টাল ট্রিট্মেন্ট দিতে হলে কিছু ম্যাটেরিয়ালস লাগে – সেই সব ম্যাটেরিয়ালসের নিয়মিত সাপ্লাই। পাশাপাশি, ডেন্টিস্টদের কাজে কর্মে সাহায্য করার জন্য একজন ডেন্টাল এসিস্টেন্ট। উল্লেখ্য, ডেন্টিস্ট একা কাজ করতে পারেন না। একটা ছোট খাট অপারেশন করতে হলে ( যেমন দাঁত তোলা) রোগীর মুখ থেকে রক্ত ও পানি সরিয়ে নিতে ডেন্টাল নার্স বা এসিসটেন্ট এর সাহায্য লাগে। এই পদ গুলো কি হাসপাতালে সৃষ্টি করা হয়েছে? এই ক্যাডারের লোকবল তৈরীর কোর্স সৃষ্টি করা হয়েছে?

কিছুদিন আগে ভোলার মনপুরার স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে সমকালের একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে সেখানে ডাক্তাররা বেতন তুলতে আসেন, কাজ কেউই করেন না। ইঞ্জেকশন দেয় ঝাড়ুদার। ( আমার আগের পোস্টে লিংক পাবেন) ।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে পড়ুন। পর্ব একপর্ব দুই ।

ভোলা – মনপুরা- সেইটা প্রত্যন্ত অঞ্চল। কিন্তু ঢাকা থেকে গাড়িতে মাত্র ৩০-৪৫ মিনিট দূরে, সাভারের কাকাবো গ্রামে যেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি আছে- সেইটার আঞ্চলিক নাম “ভুতের বাড়ি” । ২০০৫ সালে ৬ মাস ওখানে ছিলাম। একদিনও ডাক্তারকে বসতে দেখিনি। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ৪র্থ শ্রেনীর কর্মচারী বসে ওষুধ দেয়, মাঝে মাঝে কবিরাজি চিকিৎসা করে । ইটের বিল্ডিংটাতে শুধু কয়টা সুন্দর সুন্দর ঘর আছে, আর কিছুই নেই। না টেলিফোন, না পানির ব্যবস্থা।

এই রকম হলে চিকিৎসা দেওয়া বা নেওয়া সম্ভব?

সরকারের কাছে অনুরোধ , ইন্টার্নরা এমনিতেই অন্য অনেক বড় বড় ডাক্তারের চেয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে বেশি উৎসাহী থাকে। পাশ করা ডাক্তাররা পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি করে – সেই ভয় ইন্টার্নদের নিয়ে নেই।

গ্রামে প্লেসমেন্ট এর এক বছরে প্রতিটা রোগীর তথ্য এবং চিকিৎসার ফলাফল জমা দেওয়ার নিয়ম করলে আশা করি ভুল চিকিৎসাও কেউ দিতে চাইবেন না।

কিন্তু ইন্টার্নরা শিক্ষানবিশ বলেই তাদের সব সময় একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অধীনে এবং তত্ত্বাবধানে কাজ করা উচিত।

এই নিয়মিত পরামর্শের কাজটা তারা কি ভাবে করবেন? কেস নিয়ে কার সাথে, কি ভাবে আলোচনা করবেন?

সরকার টেলি -মেডিসিন বা ই-হেলথ এর উপরে খুব জোর দিচ্ছেন। এই কার্যক্রম সফল করতে হলে যা প্রয়োজন-

১। ইউনিয়ন সেন্টার গুলোতে বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করুন ( লাইন দিয়ে বা সোলার প্যানেলের মাধ্যমে) ।

২। ডাক্তাররা যাতে ল্যাপটপের মাধ্যমে তাঁর সুপারভাইজারের সাথে কেস নিয়ে আলাপ করতে পারে- সেই ব্যবস্থা করুন।

৩। ওষুধ , যন্ত্রপাতি ইত্যাদি সরবরাহের লজিস্টিক ও ম্যানেজমেন্টকে শক্তিশালী করুন।

৪। রোগীর ডাটা রিপোর্টের সুবিধার জন্য এম আইস এস বা ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের ব্যবস্থা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র / ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে নিশ্চিত করুন। যাতে একটা সাধারণ ল্যাপটপ বা স্মার্ট ফোনের মাধ্যমকে সহজেই ডাটা বেজে রোগীর রোগ ও ট্রিট্মেন্টের তথ্য রেকর্ড/ এন্ট্রি করা যায়।

৫। রোগীর প্রেসক্রিপশন প্রিন্ট আউটের মাধ্যমে দেওয়া বাধ্যতামূলক করে দিন। রোগ, রোগী, ওষুধ বিতরণের হিসাব দিনেরটা দিনেই পেয়ে যাবেন তাহলে । আলাদা করে রিসার্চ করা লাগবে না।

৬। অনেক ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে ডাক্তার-নার্স- প্যারামেডিকদের থাকার খুব অসুবিধা। যদি সম্ভব হয় , স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে

ক) পানি,

খ) বিদ্যুৎ,

গ) টেলিফোন

ঘ) ইন্টারনেট ( লাইন বা ফোন মডেম যেইভাবে দ্রুত হয়), এবং,

ঙ) রাতে ঘুমানোর কক্ষের ব্যবস্থা করে দিন । ছেলেদের রুম, মেয়েদের রুম আলাদা করে – একটা বেডের উপরে আরেকটা বেড (দুইতলা বেড) দিয়ে ব্যবস্থা করলে খুব বেশি রুম / জায়গা লাগবে না। এতে করে, ডাক্তার- নার্স -প্যারামেডিকরা স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই থাকবেন। ২৪ ঘন্টা অন কলে থাকতে পারবেন। ইমার্জেন্সি রোগীকে সাথে সাথে চিকিৎসা দেওয়া যাবে।

সংশ্লিষ্ট সকলকে একটু ভেবে দেখতে অনুরোধ করি। পাঠকের কাছে আরো পরামর্শের অনুরোধ রইলো ।