ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

এক হাতে তালি বাজে না – এই কথাটা বলার জন্য এরপর থেকে ফাঁসির আদেশ হওয়া উচিত। দুনিয়াতে এর চাইতে নোংরা মন্তব্য আর হয় না। রুমানা সাঈদ ইস্যুতে এত বেশি নোংরা লোকের স্বরুপ প্রকাশ পেয়েছে যে এখন থেকে দোয়া করবো ভাবছি , ” হে আল্লাহ! তুমি দুনিয়ার সকল পুরুষ শিশু, পিতা এবং ভাইকে তাদের মা , কন্যা এবং বোনদের সামনে রুমানাকে যে সামান্য আঘাত করা হয়েছে (শিশু সন্তানের সামনে চোখ উপড়ে নেওয়া) দেওয়ার ব্যবস্থা করো।” কারণ এত ভয়াবহ মানবিক অপরাধের পরে মানুষ – শব্দটাই মনে হয় সবচেয়ে নোংরা গালি।

রুমানা-সাঈদ ইস্যুতে স্পষ্ট হয়ে গেলো নারীর প্রতি বর্তমানের বাঙ্গালী, বিশেষ করে বাঙ্গালী পুরুষ মোটামুটি ইতর পশু। শিশু সিয়াম কিংবা তানহাকে হত্যায় মায়ের ভূমিকার বিপরীতে কোন নারীই কিন্তু বলে ওঠে নাই “এক হাতে তালি বাজে না” , কেন?

— উপরের মন্তব্যটি ব্লগ ও পেপারে যারা মন্তব্য দিয়েছে – তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে করা।

কারো চোখ উপড়ে নেওয়া – তাও আবার সেইটা নিজের শিশুকন্যার সামনে প্রিয়তমা স্ত্রীর চোখ – সত্যি বলতে কি – এই ধরনের একটা খবর বিশ্বাস করতে হলে মনের উপরে যেই চাপ পড়ে , সেই চাপ নেওয়া হয়ত অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। ফলে আমরা মিথ্যা কিছু দিয়ে জাস্টিফিকেশন খুঁজি। সোশাল সাইকোলজিষ্টরা হয়ত ভালো বলতে পারবেন আমার এই সন্দেহ সঠিক কি না। আমি নিজে জানি আমি অত্যন্ত ইতিবাচক মনের মানুষ বলেই এই রকম একটা সন্দেহ করতে চাই, ভাবতে চাই মানুষের “ভালত্ব” এখনো কিছু বাকি আছে। কিন্তু আমার এই ইতিবাচক সন্দেহ ধোপে টেকে না যখন দেখি

সিয়ামের বাবা কিংবা তানহার বাবার চরিত্র নিয়ে কেউই সন্দেহের আঙুল তোলে না। কেউই জানতে চায় না এই “বাবাদের চরিত্রে কি দোষ ছিলো যে তাদের স্ত্রীরা এমন ভাবে তাদের সন্তানকে খুন করতে দিতে পারলো।”

সাঈদের বাবার প্রলাপ পড়লে মনে হবে যে – চোখ উপড়ে নিলে পুরুষের চোখ অন্ধ হয়ে যায় কিন্তু নারীদের চোখ “প্রায় অন্ধ” হয়। এইটা একটা বৈজ্ঞানিক সত্য। আর শিশু সন্তানের চোখের সামনে মায়ের চোখ নিজের হাত দিয়ে খুবলে উপড়ে নেওয়া হইলো “সামান্য আঘাত”। এইটাও একটা বৈজ্ঞানিক সত্য। পিতা হয়ে পুত্রের মৃত্যু কারো সহ্য হওয়ার কথা না, কিন্তু একটা পশুর পাশবিক বিকারকে পিতৃস্নেহে অন্ধ বাপের অকুন্ঠ সমর্থন -ই প্রমাণ করে বাপ মা-ও মানুষ হইতে পারে নাই। কিংবা কে জানে, এরাই হয়ত সত্যিকারের মানুষ- আমরাই “আশরাফুল মাখলুকাত” নামক ভ্রান্তির মধ্যে বসবাস করছি।

সম্পূর্ণ ঘটনায় আমার একটাই মাত্র আফসোস যে সাঈদ এবং তার পরিবারের পাশবিকতা এবং যথেচ্ছ মিথ্যাচার আদালতে নথিভুক্ত হবে না। আমি চাই সাঈদের মরনোত্তর বিচার হোক। বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য, নারীদের সাবধান হওয়ার জন্য , ডমেস্টিক ভায়োলেন্স রুখে দেওয়ার জন্য এর খুবই প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে জাপানের উদাহরণ দেই- এক অপরাধী এঙ্কাউন্টারে মুমুর্ষ (সেও আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলো) হলে তাকে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বাঁচিয়ে তুলে বিচার করে তারপর ফাঁসি দেওয়া হয়। আত্মহত্যা করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তাকে দেওয়া হয় নাই। তাতে এই সত্যি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে – জাপানে যদি কেউ অন্যায় করে, অপরাধ করে- তাকে বিচারের এবং শাস্তির মুখোমুখি হতেই হবে। কেউই , এমন কি, আত্মহত্যার মাধ্যমেও পালাতে পারবে না।

আমি সকলের কাছে অনুরোধ করছি- সাইদের মরণোত্তর বিচারের জন্য আওয়াজ তুলুন। এই বিচার না হওয়া মানে বাংলাদেশের ক্ষতি, বাংলাদেশের হেরে যাওয়া।পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যু হলে সেইটা সাঈদের লাভ, আমাদের ক্ষতি। সাঈদের প্রতি , আমাদের প্রতি অন্যায় তো বটেই। লোকটা কিন্তু পালিয়ে বেচে গেলো।আর পুলিশি অন্যায়ের কথা তো লিখে শেষ করা যাবে না।

সবচেয়ে বড় কথা – তদন্ত হোক। আমি চাই না সাঈদ মরে গেছে বলেই তদন্ত, বিচার থেমে যাক কিংবা ধামা চাপা পড়ুক। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না- সাঈদের বাবা যে সব অভিযোগ করছে মিডিয়ার কাছে- সেই সবের প্রমাণ যদি আদালতে দিতে হয় তাহলে তাদের হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর (আমার ধারণা) । তদন্ত – বিচার ইত্যাদি না হলে সাঈদের পরিবারেরই লাভ বেশি। তদন্ত থেমে গেলে রুমানার ক্ষতি, সাথে সাথে পুরো বাংলাদেশের সমাজের জন্য , রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতি। মরণোত্তর হইলেও এই মামলা চলুক, তদন্ত হোক, বিচার হোক। রুমানার বাবা যদি কোনভাবে জড়িত থাকে তো তারও বিচার হোক।

কেউ যদি এই মামলা চালাতে না চায় তাহলে রাষ্ট্রের উচিৎ নিজ দায়িত্বে এই মামলা চালানো। রুমানার মেয়ে একদিন ঠিকই জবাব চাইবে, কি হয়েছিলো? কেন হয়েছিলো? (যদি মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে আদৌ বড় হইতে পারে)।

ব্রিটেনে এখন একটা মামলা চলছে। বাবা আর ছেলে বৃটেনে এসাইলাম চেয়েছিলো এবং বৃটিশ সরকার তাদের আবেদন প্রত্যাখান করে আফ্রিকার সেই যুদ্ধরত দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ফেরত পাঠানোর আগের দিন বাবা আত্মহত্যা করেন এবং চিরকুটে লিখে দিয়ে যান তার ছেলেকে যেন ব্রিটেনে থাকতে দেওয়া হয়। কেন? কারণ ব্রিটেনের আইন বলে এসাইলাম সিকার শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার মত বাবা বা মা যদি তার নিজের দেশে না থাকে তাহলে এডাল্ট হওয়া পর্যন্ত তাকে ব্রিটেনে থাকতে দিতে হবে। আমি খালি ভাবি- এই বাবাও বাবা, সাঈদও বাবা।

রুমানা বা হেমা মানুষ হিসেবে কেমন ছিলো এইটা যারা তাকে ছোটবেলা থেকে বড় বেলা পর্যন্ত চেনে তারা সবাই জানে। তাদেরই একজন সায়ান, ব্লগ স্পটে তার তিনটি লেখা আছে হেমাকে নিয়ে। আপনারা নিজেরা পড়ুন আর সিদ্ধান্ত নিন। বিশেষ করে “এক হাতে তালি বাজে না” লেখাটি এই ব্লগের ব্লগারদের পড়ার অনুরোধ থাকলো।

হেমা’র চোখ
হেমার চোখ – ‘এক হাতে তালি বাজে না !!’
হেমা এবং কিছু খাপছাড়া গল্প