ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

কিছুদিন আগেই আন্তর্জালের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে পৃথিবী জুড়ে আন্দোলন হয়ে গেলো বড় সড়। এর আঁচ এসে লেগেছিলো বাংলাদেশেও। মূলত আমাদের নীতিনির্ধারক মহলের কাজ কর্মের উপর সাধারণ মানুষ তথা নাগরিকের ভরসার পরিমাণ খুবই কম। হওয়ারই কথা। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলে সরকারী বিজ্ঞাপন বা টাকা দিয়ে স্বাধীনতা হরণের উদাহরণ তো বাংলাদেশের সরকারেরই, তাই না? খোলামেলা ভাবে কথা বলার খুব বেশি জায়গা আসলে কোন নির্দলীয় ( কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, পত্রিকা বা ডিজিটাল মিডিয়ার সাথে যারা যুক্ত নন), নিরপেক্ষ মানুষের নেই। মূলত আন্তর্জাল তথা ব্লগিং এর সংস্পর্শে এসে মানুষ প্রথম বুঝতে পারে, ব্যক্তিপরিচয়বিহীন ভাবে (কিছুটা নিরাপদে) স্বাধীন সমালোচনার সুযোগ আন্তর্জালেই সম্ভব। একটি দলিত, মথিত, শোষিত, অন্যায়ভাবে বঞ্চিত এবং জীবনের পদে পদে অবদমিত সমাজের জন্য এই স্বাধীনতার মূল্য যে কি তা সত্যিকার অর্থেই অপরিমেয়।

বাংলাদেশের মানুষ সামাজিক ভাবে, অর্থনৈতিক ভাবে, রাজনৈতিক ভাবে, অধুনা সাংস্কৃতিক ভাবেও “ভাবে স্বাধীন কিন্তু আসলে পরাধীন”। উপরে উল্লেখিত সকল কারণেই আন্তর্জাল নামক একটি মাত্র স্বাধীন মঞ্চকে নিয়ন্ত্রনের কথা শুনলে তাই বেশির ভাগ মানুষের বুকেই জুজুর ভয় চলে আসে। পরাধীন নয়, নিয়ন্ত্রণ। স্বাধীনতা হরণ নয় বরং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাধীনতা রক্ষা। একটু ভেবে দেখুন তো, একটা স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশে কেন আইন, বিচার, প্রতিরক্ষা বাহিনী থাকে? আপনি যদি যা ইচ্ছা তাই করার জন্য স্বাধীন হোন, তাহলে কেন এই নিয়ন্ত্রন আরোপ করা হয়? অপরাধ ঠেকানোর জন্য। যাদের কর্মকাণ্ড আপনার সাংবিধানিক অধিকার হরণ করে বা আদায়ে বাধা দেয়, তাদের প্রতিরোধের জন্য। সুস্থ, সুন্দর, স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্বাধীনতা হইলো আপনার সাংবিধানিক, মানবিক এবং জন্মগত অধিকার। কেউ যখন আপনাকে বেঁচে থাকতে, উপার্জন করতে, চলাফেরা করতে, সম্মান নিয়ে জীবনযাপন করতে বাধা দেয়- সে কিন্তু আপনার স্বাধীনতাই হরণ করে। আপনার স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে তাই এই সব অপরাধীকে সমাজে, দেশে দেশে আইনের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।

আন্তর্জালের “সোসাল মিডিয়া” বা “কমিউনিটি” কোন ভাবেই এর ব্যতিক্রম নয়। আমরা যেমন আন্তর্জালে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করি, উপার্জন করি, উপভোগ করি- আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কাজ কর্ম করি (বা করতে চাই), সেই রকম সাইবার ক্রিমিনালরাও তাদের লোভ, লালসা, বিদ্বেষ, রিপু তাড়িত অপরাধ গুলো করে (বা করতে চায়)। দুঃখজনক সত্য হলো, বাস্তব সমাজের মত আন্তর্জালিক সমাজেও কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষ (নারী, দরিদ্র, কম ক্ষমতাসম্পন্ন, সংখ্যালঘু, শিশু ইত্যাদি) অন্যদের তুলনায় বেশি নির্যাতিত হন। এই মানুষ গুলো বিভিন্ন ধরণের আক্রমণের স্বীকার হন বলেই তারা অন্যদের মত স্বাধীনভাবে আন্তর্জাল ব্যবহার করতে পারেন না, আন্তর্জালিক বিভিন্ন সমাজে স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। এদের অবস্থা দেখে অন্যরা ভয়ে আন্তর্জালেই আসেন না।

উপরের অবস্থা বিবেচনা করে আন্তর্জাল নামক দুনিয়াতে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধের জন্য উন্নত সব দেশেই ক্রিমিনাল আইন হয়েছে এবং সে সব আইনের প্রয়োগও হচ্ছে। এতে যাদের প্রতি অপরাধ করা হচ্ছে তাদের স্বাধীনতা রক্ষা হচ্ছে। কেউ পাবে আর কেউ পাবে না-র বৈষম্য দূরের চেষ্টা চলছে।

নিচের ভিডিওটা দেখুন আর নিজেকেই প্রশ্ন করুন, আমাদের আন্তর্জাল, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম কি নারীদের জন্য, শিশুদের জন্য নিরাপদ?

টেড টক ভক্ত মাত্রেই জানবেন সারা পৃথিবী জুড়ে মানুষের কল্যাণে, মানব সভ্যতার বিকাশে কাজে লাগার মত “আইডিয়া” গুলো নিয়ে যারা কাজ করছেন, সফল হয়েছেন, তারা তাদের চিন্তাভাবনা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেন বাৎসরিক টেড কনফারেন্স এ। তাসলিমা অনেক বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে সফল হয়েছেন। কিন্তু একজন উদ্যোক্তা নয়, নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তাকেও দাবী করতে হচ্ছে নিরাপত্তা – যা কিনা বাংলাদেশের একজন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে তার আপনিই প্রাপ্য ছিলো।

সাগর-রুনি দম্পতিকে নিয়ে যা হচ্ছে তার পরেও কি আপনার মনে দ্বিধা থাকা উচিত কেন আইন থাকা উচিত? কেন নিয়ন্ত্রন থাকা উচিত? কেন অপরাধীকে ধরে শাস্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত? পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া যদি হত্যা হয়, আন্তর্জালের পৃথিবী থেকে কাউকে বিদায় নিতে বাধ্য করাটাও হত্যা। ওটাও অপরাধ।

পরিশেষে তাসলিমার সাথে কন্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই, সাইবার ক্রাইম, অনলাইনে সেক্সুয়াল হ্যারেস্মেন্ট প্রতিরোধে মোবাইল কোম্পানি, ফেসবুক কিংবা ডিজিটাল মিডিয়াকে দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করুণ। আমার স্বাধীনতা রক্ষার নামে আমাকে পরাধীন করে রাখবেন না।