ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

জ্বি, আপনার হয়ত ধারণাই নাই আপনি কতখানি শক্তিশালী। নিজেকে শুধু শিক্ষকই না, একজন বিজ্ঞানী এবং গবেষক হিসেবে ভাবুন- যার হাতের কাছে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রিসোর্স- মানুষের ব্রেইন। একটু চিন্তা করুন তো, যদি আপনি কোন রিসার্চ কোম্পানির সি ই ও হইতেন আর আপনাকে ৩০-৪০ জন রিসার্চার বেতন দিয়ে রাখতে হইত, আপনাকে কত টাকা খরচ করতে হইত? মাসে ২০ হাজার টাকা বেতন হইলেও অংকটা অনেক বড়। অথচ, স্রেফ শিক্ষক হওয়ার সুবাদে আপনার হাতের কাছে , বিনা বেতনের বাচ্চা গবেষক গুলো আছে- তাও আবার পুরো এক বছরের জন্য। আপনি এদের কাজে লাগাবেন না?

ছোটবেলায় বানরের তেলযুক্ত বাঁশের আগায় উঠা আর দুধে পানির পরিমাণের অংক করতে করতে ভাবতাম- এইটা আমার জীবন এ কি কাজে লাগবে? কিংবা সুদের অংক করতে করতে মনে হইত আমি তো সুদের কারবারি হব না, তাহলে এই অংক কষে কি লাভ? আমার আশে পাশের জীবন কিংবা উপকরণের সাথে এই সব অংকের কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু কোন কাজটা করে সবচেয়ে বেশি মজা পাইতাম, জানেন? মাসে একদিন স্কুলের মাঠ পরিষ্কার করে। কারণ, ওই পরিশ্রমের ফলাফল সাথেই সাথেই নিজের চোখে দেখতে পেতাম। আরেকটা অসম্ভব প্রিয় দিন ছিলো, যখন একদিনের জন্য আমরা বাচ্চারা স্কুলের শিক্ষক থেকে সমস্ত কর্মচারীর পদ গুলো দখল নিতাম। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর উদযাপন হইলেও ঐদিন কিন্তু নিয়মিত ক্লাস হইত। পড়া দেওয়া নেওয়া চলতো। পরীক্ষাও হইত। আবার স্টুডেন্টরাই মাঠ ঘাট ঝাড়ু দিত, ঘন্টা বাজাত। এই থেকে বুঝা যায়,

গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলে, নিজের কাজের স্বীকৃতি পেলে বাচ্চারা খুব উৎসাহ নিয়ে কাজ করে।

ছাত্রছাত্রীদের হিউমেন রিসোর্স মনে করুন। ৩০টা পেট মনে না করে, ৩০টা ব্রেইন ভাবুন। ওদের কাজে লাগান।

কিছু সুদূরপ্রসারী ফলদায়ক ক্লাস/ হোম ওয়ার্কঃ

প্রথম ধাপঃ তথ্য আহোরণঃ

এক একটা বাচ্চাকে এক একটা বিষয়ের উপর ডাটা কালেক্ট করতে বলুন। যেমন- একটা বাচ্চা ক্লাসের সমস্ত স্টুডেন্টের উচ্চতা মাপবে। আরেকজন বাহুর বেড় মাপবে। আরেকজন ওজন নেবে। আরেকজন ঠিকানা নেবে। আরেকজন বাবা মায়ের পেশা নেবে। আরেকজন বড় হয়ে কি হতে চায়, সেইটা জানবে। প্রিয় কার্টুন , প্রিয় রঙ, প্রিয় ফুল – এই রকম করে প্রতিটা বাচ্চাকে একটা নির্দিষ্ট বিষয় এ তথ্য যোগাড় করতে বলুন। ২-৩ জনের গ্রুপ করেও করতে পারেন। এতে টিম ওয়ার্কের অভ্যাস হবে।

দ্বিতীয় ধাপঃ তথ্য সাজানোঃ

এরপর তাদের শেখান, কি ভাবে আহোরিত তথ্যকে সাজাতে হয়।

যেমনঃ তথ্য আহরণের জন্য একটা ডাটা কালেকশন শিট হতে পারে এই রকমঃ

নামঃ ক্লাসঃ সেকশনঃ রোলঃ

গবেষণার বিষয়ঃ উচ্চতা

স্যামপল সাইজঃ ৩০
সাবজেক্ট ১ঃ
সাবজেক্ট ২ঃ
সাবজেক্ট ৩ঃ

ইত্যাদি । খেয়াল রাখবেন,

বাচ্চারা যেন কারো নাম, রোল দিয়ে তথ্য প্রেজেন্ট না করে। অর্থাৎ আইডেন্টিফিকেশন ইনফো সংগ্রহ করলেও প্রেজেন্ট না করে। সংগ্রহ করা জরুরী, অথেন্টিসিটির জন্য। প্রেজেন্ট না করা জরুরী রিসার্চ এথিক্স, প্রাইভেসি ইত্যাদি রক্ষার জন্য। এই বিষয় গুলো গুরত্বের সাথে শিখান। ভালো ভাবে বুঝিয়ে বললে বাচ্চারাও এসব বুঝে। মোবাইল এর যুগে প্রাইভেসি, এথিক্স বুঝাটা জরুরী।

তৃতীয় ধাপঃ প্রেজেন্টেশনঃ

পরের স্টেপে তাদের শিখান কি ভাবে তথ্য প্রেজেন্ট করতে হয়। তাদের প্লটিং, গ্রাফ ইত্যাদি শেখাতে পারেন। সিম্পেল টেবিল করে প্রেজেন্ট করা শিখাতে পারেন। মাইক্রোসফট অফিসের বিভিন্ন এ্যাপ- যেমন এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারেন। সবার হয়ত কম্পিউটার নেই, থাকলে ব্যবহার করুন না হলে কাগজ , কলম, বোর্ড-ই সই।

শেখানোর পরে প্রতিটা বাচ্চাকে নিজের নিজের তথ্য প্রেজেন্ট করতে দিন। এইটার উপরে গ্রেডিং করুন। প্রেজেন্টশনের জন্য একটা পোস্টার তৈরী করান । এরপর ক্লাসের বোর্ডে বা দেয়ালে প্রত্যেকের পোস্টার ঝুলিয়ে রাখুন।

চতুর্থ ধাপ ঃ তথ্য সংরক্ষণঃ

ক্লাস ওয়ার্ক , হোম ওয়ার্ক এর খেলাচ্ছলে আপনি শুধু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, গবেষণা , অংক , রিসার্চ প্রেজেন্টেশনই শেখাচ্ছেন না , বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করছেন। কিছু উদাহরণ দেই, আপনি এই পদ্ধতিতে ক্লাসের বাচ্চারদের যে সব তথ্য নিয়ে কাজ করতে দিতে পারেন,

১। উচ্চতা, হাতের বেড়, শরীরের ওজন = পুষ্টির তথ্য
২। গত ৭ বা ৩০ দিনে কার কি অসুখ হয়েছে= ডিজিজ সার্ভেইল্যান্স
৩। কতজনের বাপ মার জাতীয় পরিচয় পত্র/ ভোটার আই ডি আছে= ইসি
৪। কার বাসায় সদস্য সংখ্যা কত = ডেমোগ্রাফিক সার্ভে
৫। বাবা মায়ের পেশা = ইকোনমিক সার্ভে
৬। কার গ্রামে কয়টা টিউব ওয়েল, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা আছে।

ইত্যাদি আরো অনেক গুরুত্বপূর্ন তথ্য বাংলাদেশের জন্য আপনি সংগ্রহ করতে পারেন। এই তথ্যগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করুন। এই তথ্য আপনি সরকারের কাছে দিতে পারেন কাজে লাগানোর জন্য। আপনি হয়ত জানেন না-

১। সঠিক লোকাল তথ্যের অভাবে আমাদের অনেক পলিসিতে অনেক ভুল হয়।
২। তথ্য সংগ্রহের জন্য সরকারকে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়।
৩। টাকা এবং হিউমেন রিসোর্সের অভাবে খুব ছোট স্যাম্পল নিয়ে কাজ করতে হয় যা সব সময় সঠিক তথ্য দেয় না। যেমন- জাতীয় জনমীতি ও স্বাস্থ্য সার্ভে – দেশের সবচেয়ে বড় সারভেটাও মাত্র ৮০০ পরিবার বা ১০ হাজার নাগরিকের উপরে করা হয়। যার তথ্যের উপরে ভিত্তি করে প্রায় ১৫-১৬ কোটি মানুষের জন্য পলিসি নির্ধারিত হয়।

কেন করবেন?

আমি বলছি না যে উপরে উল্লেখিত সার্ভে গুলোর বদলে আপনার বাচ্চাদের সংগ্রহ করা তথ্য কাজে লাগানো হবে। বদলে না হলেও, সহযোগী হিসেবে এইটা অনেক বড় সাহায্য করতে পারে। আজকের যুগে ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার বলা হয়। আর আপনি সেই ইনফরমেশন যোগাড় করছেন। এখন এই ডাটা আপনি স্থানীয় সরকারকে দিতে পারেন। রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে নিজেরাই কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন। যেমন, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে দিতে পারেন।

পুরো কাজটা বাচ্চাদেরকে দিয়েই করান। তাহলে ওরা একই সাথে অংক শিখবে। তথ্য সংগ্রহ করা শিখবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি শিখবে। ডাটা এনালাইসিস কি ভাবে করে শিখবে। কি ভাবে রেজাল্ট বের করতে হয় শিখবে। কি ভাবে রেজাল্ট প্রেজেন্ট করতে হয় শিখবে। কি ভাবে ডাটা আর্কাইভ করতে হয় শিখবে। বাচ্চাদের শেখাতে গিয়ে হয়ত নিজেও শিখবেন।

১। পার্সোনাল ডেভেলপমেন্ট- বাচ্চারা এবং আপনার নিজের স্কিল বাড়বে।
২। ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট- এই স্কিল গুলো আপনার এবং বাচ্চাদের সারাজীবন কাজে লাগবে।
৩। তথ্য গুলো কাজে লাগালে স্থানীয়, গ্রাম-ইউনিয়ন-উপজেলা-জেলা-বিভাগ- জাতীয় পর্যায়ে উপকার করা হবে। দেশের উন্নতিতে কাজে লাগবে।
৪। এই কাজটা করার জন্য কোন বিশাল দক্ষ যজ্ঞ করার প্রয়োজন নেই। কোন নতুন পলিসির দরকার নেই। মন্ত্রী মিনিস্টার এর দরকার নেই। আমরা আমরাই করতে পারি।

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপঃ ফ্রম লোকাল টু গ্লোবালঃ

আমরা বেশির ভাগ মানুষই সব কিছু নিয়ে একটু বেশি বাগাড়ম্বর করতে ভালোবাসি। জাতীয় পর্যায়ের সার্ভে মানেই কোটি কোটি টাকা, দেশী- বিদেশী কনসাল্টেন্ট, মিটিং- সিটিং- ইটিং। আবার দেশপ্রেম বা বাংলাদেশের জন্য কিছু করতে হবে মানেই টিভি মিডিয়া সার্কাস, মানব বন্ধন, হরতাল মিছিল- এবং আবারো টাকা- কনসাল্টেন্ট- মিটিং।

আসলে দেশকে যদি ভালোবাসি তো এত বাগাড়ম্বরের দরকার নেই। তাছাড়া, দেশের খেয়ে, দেশের পরে দেশের জন্য কিছু করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। সুতরাং, সামান্য হোম ওয়ার্ক , ক্লাস ওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে কিছু একটা করা আসলে খুব কঠিন কিছু না। মনে করেন,

১। প্রথমে ক্লাসের ভিতরেই ৩০-৪০ জনের ডাটা প্রেজেন্ট করলেন। এইটা ইন্ডিভিজুয়াল লেভেল। সবাইকে ৩ কপি করে রিপোর্ট জমা দিতে বলুন। এবার পুরো ক্লাসের রিপোর্ট গুলো একসাথে করে একটা বই বানাতে বলুন। বাড়াবাড়ি করবেন না। বাচ্চাদেরকেই দায়িত্ব দিন, কভার, আঠা ইত্যাদি দিয়ে নিজেরাই বই বানাতে। ওরা যেমন ইচ্ছা করুন। আপনি শুধু সাহায্য করেন। ৩টা বই হবে। একটা ক্লাসে রাখুন, ভবিষ্যতের স্মৃতি হিসাবে। ১টা স্কুলের লাইব্রেরীতে দিন, রেফারেন্স হিসাবে। একটা পরের লেভেল এর প্রতিযোগিতার জন্য।

এরপর আপনি যে কয়টা সেকশনে পড়ান, সেই কয়টা সেকশনের তুলনা করে একটা প্রেজেন্টেশন রিপোর্ট তৈরী করলেন। এইটাও বাচ্চারাই করবে। এইবার প্রতিটা সেকশন থেকে নিয়ে গ্রুপ হিসেবে।

২। এর পরের স্টেপে বিভিন্ন ক্লাসেরটা তুলনা করে রিপোর্ট তৈরী করান । এরপর পুরো স্কুলের।

৩। আশে পাশের স্কুলকে একই কাজ করতে বলুন এবং তাদের রিপোর্ট এগ্রেগেট করে গ্রাম/ ওয়ার্ড লেভেলে রিপোর্ট তৈরী করুন। নিজে না, বাচ্চারাই করবে।

৪। একটা তথ্য মেলার আয়োজন করে ইউনিয়ন লেভেলে বাচ্চাদের রিপোর্ট প্রেজেন্ট করতে দিন। কোন সমস্যা চিহ্নিত করতে পারলে বাচ্চাদেরকেই বলুন সমাধান প্রপোজ করতে। শিক্ষকেরা বসে রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে কোন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারেন।

৫। ইউনিয়ন/ওয়ার্ড লেভেল এর বেস্ট প্রেজেন্টারকে উপজেলা লেভেলে প্রেজেন্ট করতে দিন। এইটাও নিজেরা নিজেরা ছোট খাট আয়োজন করেই করতে পারেন। এলাহি কান্ড করার দরকার নাই।

৫। একই ভাবে উপজেলার বেস্ট প্রেজেন্টারদের দিয়ে জেলা পর্যায়ে প্রেজেন্ট করুন। মনে রাখবেন, প্রতিটা ধাপে আগের ডাটা গুলা কিন্তু এগ্রেগেট হবে। এবং অন্য সবার রিপোর্ট থেকে বেস্ট প্রেজেন্টার পরের লেভেল এর রিপোর্ট তৈরী করবে। শিক্ষক সাহায্য করবেন। স্বাভাবিক ভাবেই – প্রিয় ফুল রং এর মত বিষয় নিশ্চয় তথ্য মেলার জন্য নিবেন না। কিন্তু স্বাস্থ্য, ডিজিজ, ন্যাশনাল আই ডি, পেশা ইত্যাদি রিপোর্ট নিতে পারেন।

৬। জেলা পর্যায়ের প্রেজেন্টারদের নিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে আয়োজন করুন। প্রতি ধাপে প্রেজেন্টারদের সংখ্যা কমে আসবে। সুতরাং, খরচও কমে আসবে।

৭। বিভাগীয় পর্যায়ের বেস্ট প্রেজেন্টারদের নিয়ে ন্যাশনাল পর্যায়ে আয়োজন করুন। বেস্ট প্রেজেন্টার ও তার শিক্ষকের জন্য পুরস্কার রাখুন। আয়োজনটা প্রতি বছর করতে পারেন।

বেস্ট কিভাবে নির্বাচন করবেন।

ক্লাসের ভিতরে সকল ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকদের ভোটে। সেকশন পর্যায়ে প্রতি সেকশনের প্রেজেন্টার ও শিক্ষকদের ভোটে। স্কুল পর্যায়ে অন্যান্য প্রেজেন্টার ও শিক্ষকদের ভোটে। প্রতি প্রেজেন্টার নিজেকে একটা এবং অন্য মাত্র একজনকে ভোট দিতে পারবে। তার মানে, প্রেজেন্টারদের নিজেদের ভোটেই নিজেরা সেরা নির্বাচিত হবে। যদি টাই হয়, তাহলে একজন প্রেজেন্টার বিতর্ক করবে কেন তার প্রতিপক্ষের জেতা উচিত। দুইজনের বিতর্ক শুনে আবার ভোট হবে।
—————————————————————–

কেউ কি করাবেন এমন অদ্ভুত হোম/ক্লাস ওয়ার্ক? রিসার্চ মেথড, রিসার্চ এথিক্স ইত্যাদি নিয়ে কোন সাহায্য লাগলে আমি অবশ্যই করবো। স্রেফ মেইল করুন।

আমি বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। দেখি কিছু স্বপ্নবাজ শিক্ষককে।