ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

এই অপ্রয়জনীয় ইস্যু নিয়ে প্রয়জনীয় কিছু কথা বলা খুবই বিপদজনক। অপ্রয়জনীয়, কারণ এই একটা বিষয় নিয়ে আর কত লেখা পাঠক পড়বে? আর বিপদজনক বললাম, কারণ লেখার ভিতর কিছু স্থায়ী ক্ষমতাবান মানুষের ক্ষমতার উপস্থিতি ঘটবে।

আমাদের ঢাকা শহরে ভাড়াটিয়া বনাম বাড়িওয়ালা মধুর সম্পর্কের চেয়ে তেতো সম্পর্ক ঢের। অথচ বেশিরভাগ বাড়িওয়ালার একমাত্র আয়ের উৎস এই বাড়ি ভাড়া থেকে, আবার ভাড়াটিয়াদের নিজস্ব বাড়ি না থাকায় তারা সম্পর্ক যেমনই হোক মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে। ঢাকা শহুরে ভাড়াটিয়াদের অনেক দুর্নাম, তারা কেউ কেউ জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত, পানি বেশি অবচয় করে, মধ্যেরাতে বাসায় ফেরে, কেউ কেউ ধূমপান করে, অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে, জোরে জোরে গান গায়, উচ্চ শব্দে গান শুনে বা টিভি দেখে, ভাড়াটিয়াদের বাচ্চারা বেশি দূরন্তপনা করে, ভাড়াটিয়াদের আত্মীয়-স্বজন বেশি আসে, মোটকথা সকল মন্দ কাজের আখড়া হলো এই ভাড়াটিয়ারা।

বাড়িয়ালাদের বিপক্ষে অভিযোগও নেহাত কম নয়। বাড়িয়ালারা বাসা বানাবে, ভাড়া নিবে, কিন্তু পানি ব্যবহারে কিপটামো করে, পানির ট্যাপ থেকে শুরু করে ইলেকট্রিক সুইচগুলো নিম্নমানের হওয়ায় তা কেবল ভাড়াটিয়ারাই বদলে থাকে, বাড়িঅলা আর সংস্কার করতে আগ্রহী না, কোনো কোনো বাড়িঅলা বছরে ভাড়া বাড়াবে দুই বার, ঢাকা শহরে প্রত্যেক এলাকায় বাড়িয়ালাদের শক্ত একটা করে সমিতি আছে, ভাড়াটিয়াদের সমিতি বলেও কিছু একটা আছে যা মাঝে মাঝে প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে মানব বন্ধন করে। আসলে কি ওই সব মানববন্ধন করে কোনো ভাড়াটিয়ার কোনো উপকারে এসেছে বলে আমার জানা নাই।

এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলা যেতে পারে, ২০১৫ সালের জুলাই মাসের ২৬ তারিখের ঘটনা, এর তিন মাস আগে খুব আগ্রহ নিয়ে মোহাম্মদপুর এলাকার সেকের টেক এলাকার ৫ নম্বর রোডের এক সচিবের বাড়ির ৭ তলার একটা ফ্লাট ভাড়া নেয়া হলো,  ফ্ল্যাটে স্বামী-স্ত্রী দুজন থাকবে। বাড়িওয়ালি বেশ খুশি। পানি খরচ হবে কম, গেঞ্জাম হবে না, পানির কথা এ কারণে বললাম ওই এলাকায় পানি একটা মহা মূল্যবান বিষয় (পরে উপলব্দি হয়েছে)।

যাহোক নতুন বাসায় উঠার পর বাড়িওয়ালি তার চিলেকোঠার মানে ৬ তলা আর ৭ তলার মাঝে সিঁড়ির উপরে একটা রুম বানানো শুরু করে দিলো। (এ রকম জায়গায় রুম বানানো যায় আগে কখনোই কেউ চিন্তা করেছে কি না জানা নাই)। সেখানে তিনি তার মহামূল্যবান ব্যবহার অযোগ্য জিনিস রাখবেন, নতুন ভাড়াটিয়া বেচারা চরম বিপাকে বাসায় ঢুকতে হয় ইঁদুরের মতো করে ছাদ ঢালাইয়ের বাঁশের চিপা দিয়ে। সারাদিন মিস্ত্রিদের হাতুড়ির শব্দে ও ধূলায় বাসায় টেকা দায়। নতুন ভাড়াটিয়া কিছু বলতেও পারছে না, সইতেও পারছে না। ওযু করতে গেলে পানি নাই, গোসল তো দূরের কথা, খাওয়ার মতো পানি তাও মাঝে মাঝে দোকান থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। প্রতিমাসে পানির বিল ৮০০ টাকা, দারোয়ান বিল ৭০০ টাকা।

উপায়অন্ত না পেয়ে বাড়িওয়ালিকে দুইবার জানানো হলো, তিনি প্রতিবারই বললেন ব্যাপারটা তিনি দেখছেন। দুই মাসের বাসা ভাড়া অগ্রিম দেয়া। তাই না চাইলেও দুই মাস থাকতে হবে। এটা নাকি ওই এলাকার সমিতি থেকে বেঁধে দেয়া আইন। ভাড়াটিয়া আর কি করবে। বাসা ছাড়ার নোটিশ দিলেন। বাড়িওয়ালি গ্রহণ করলেন না। “দুই মাস আগে বাসা ছাড়ার কথা বলতে হবে। তুমি দেড়মাস আগে বললে হবে? আর তোমার দেয়া টাকা দিয়ে আমি আমার বাড়ির হাউস বিল্ডিঙের লোনের কিস্তি দিছি”।

গত ১৫ দিনের অতিথিয়তায় ভাড়াটিয়ার জীবন অতিষ্ঠ। কিন্তু কি আর করা! নতুন ভাড়াটিয়ার সামান্য আয় তা দিয়ে তিন মাসের ভাড়া গচ্ছা দিয়ে নতুন বাসা নেয়া অসম্ভব। অন্যদিকে এই নতুন অতিথি যখনি বাসার বাইরে যায় দারোয়ান বাড়িওয়ালির কাজ থেকে বাসার চাবি দিয়ে বাসায় ঢুকে ঢুকে কাপড়, টাকা চুরি করে, প্রথমে বুঝতে সমস্যা হলেও পরে বাড়িওয়ালিকে বলা হলো লক পাল্টানোর জন্য, এবারও তিনি করতে নারাজ। রমজান শুরু হয়ে গেলো। তিন মাস আর শেষ হয় না। ভাড়াটিয়া ভাবছে, গত ১৯ বছর ধরে ঢাকার আসেপাশে অথবা ঢাকায় ভাড়াটিয়া হয়ে আছি কোনো মানুষের সাথে বাসা ভাড়া সংক্রান্ত কোনো বিষয় নিয়ে কোনোদিন সমস্যা হলো না, তাহলে এখন কেন এমন হলো? কোনো হিসাব মেলে না।

একমাত্র ব্যতিক্রম শুধু বাড়িওয়ালি? এর আগে যত বাসায় থেকেছি তার সবটাইই বাড়ীওয়ালা ছিল অথবা ম্যানেজার ছিল; কিন্তু বাড়িওয়ালি ছিল না। তাহলে এটাই কি মূল কারণ? জীবনের কোনো অজানায় কিছু খুচরা পাপ করেছি, তাই এখন তার সাজা ভোগ করতে হচ্ছে। যাহোক-ভাড়াটিয়া কোনো রকম ঝামেলা এড়াতে আরো একমাস বেশি থাকতে মানুষিক ভাবে প্রস্তুতি নিলেন। এবং বিষয়গুলো একজন ছোট মাপের পুলিশ কর্মকর্তাকে জানানো হলো, ঢাকা বার এসোসিয়েশনের একজন আইনজীবীকে জানানো হলো, ছোট একটা ইংরেজি দৈনিকের সাংবাদিককে জানানো হলো। উপরের সবাই এই নতুন ভাড়াটিয়ার আত্মীয় এবং শুভাকাঙ্খী। তারা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভাড়াটিয়ার সপক্ষে থাকলেন এবং তারা কষ্ট ও ঝামেলা মেনে নিয়ে তিন মাস কাটাতে বললেন।

তিন মাস শেষ, অপেক্ষার পালা বুঝি শেষ হলো, এই জেলখানা ছেড়ে নতুন বাসায় উঠার পালা, ২৬ জুলাই ২০১৫ শুক্রবার সকালে বৃষ্টি পড়ছে, বাসার সকল মালামাল ভ্যানে উঠানো হচ্ছে। সেই মুহূর্তে বাড়িওয়ালি থেকে ফরমান এলো— “২৬ তারিখে বাসা পরিবর্তন করলে পাশের লোকজন বাড়িওয়ালা কে খারাপ ভাববে, বাসা হোয়াট ওয়াশ করতে হবে এবং সকল ইলেকট্রিক সুইচ কিনে দিয়ে যেতে হবে অথবা ১০ হাজার টাকা দিয়ে যেতে হবে অন্যথায় বাসা থেকে যেতে দেয়া হবে না। বলে রাখা ভালো, ওই বাসায় আগে কিছু উপজাতি থাকতো, তারা নিয়মিত সিঁদল খেত, শুটকি খেত, তারা চলে যাওয়ার পরে এই নতুন ভাড়াটিয়া অন্তত ১০ দিন কাজের মানুষকে টাকা দিয়ে সাবান দিয়ে পুরা বাসা ওয়াশ করার পরও দুর্গন্ধ ছিল, যেটা এই নতুন ভাড়াটিয়ার করার কথা নয়। আর বিদ্যুতের সকল সুইচ সকাল পর্যন্ত ব্যবহার হয়েছে এবং ঠিক আছে।

পাঠক আপনি হয়তো ভাবছেন, ওই ভাড়াটিয়া রাগের বসে আসলেই সবকিছু নষ্ট করেছে অথবা ভাবছেন আইনের আশ্রয় নিলো না কেন? আপনাকে বলছি, বাস্তবে তা নয়, ওই ভাড়াটিয়া দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কোনো একটা থেকে তার পাঠ সেরেছেন। তিনি উত্তম আর অধমের গল্পটা ভালো করেই জানেন, অনেক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

এবার আসি গল্পের বাকি অংশে:

ভাড়াটিয়া উপায়অন্ত না পেয়ে উপরে উল্লিখিত পুলিশ, আইনজীবী ও সাংবাদিককে খবর পাঠালো, আইনের আশ্রয় নিতে আদাবর থানায় জানানো হলো, অভিযোগ লিখা হলো, একজন এএসআই, আইনজীবী ও সাংবাদিক গেলেন ওই বাড়িয়ালীর সাথে কথা বলতে। যথারীতি বাড়িওয়ালি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করলেন, সচিব সাহেব তখন বাসায় ছিলেন না। তিনি যেখানে ছিলেন সেখান থেকে আদাবর থানায় ফোন করা হলো, ওসি সাহেব ভাড়াটিয়ার অভিযোগে আসা এএসআই কে থানায় ফেরত যেতে বললেন। অভিযোগপত্র ছিড়ে ফেলা হলো। থানা থেকে নতুন দুইজন এসআই আসলো। তারা এসেছে মূলত সচিব সাহেবের পক্ষ হয়ে, কিছু টাইম দেন-দরবার হলো আত্মীয়-পুলিশ-কর্মকর্তা-আইনজীবী ও সাংবাদিক সাহেবের সাথে। ওই ভাড়াটিয়াকে থানা থেকে তার অভিযোগপত্র লুকিয়ে রাখতে বলা হলো।

ইতোমদ্ধে সচিব সাহেব চলে এলেন। আসার পর পরিস্থিতি পুরাটাই বদলে গেলো। সাংবাদিক, আইনজীবী ও সেই আত্মীয় পুলিশ কর্মকর্তা সবাই ভড়কে গেলো। আদাবর থানা থেকে আসা পুলিশ কর্তাগণ ভাড়াটিয়ার অভিযোগ সম্পর্কে বেমালুম উল্টা কথা বলা শুরু করলো। এলাকার ছোট খাটো আওয়ামীলীগ নেতারাও এলেন আইনজীবীর পরিচিত হয়ে। কিন্তু ভাড়াটিয়ার কোনো কথাই সচিব সাহেব অথবা থানার কর্তাগণ কেউ শুনলেন না, উপরোন্ত ভাড়াটিয়াকে ক্ষমা চাইতে হলো, ভাড়াটিয়া আজও জানেন না তিনি কেন ক্ষমা চেয়েছিলেন? কেন তাকে ক্ষমা চাইতে পুলিশের লোকজন বাধ্য করেছিল? ভাড়াটিয়া হয়ে অভিযোগ করে আইনি সহায়তা চাওয়া কি অন্যায় হয়েছে?

ঐদিন থেকে ভাড়াটিয়া তার দেশের আইন, ক্ষমতায়নের বাস্তবতায় কিছু উপলব্ধি হয়েছে-

১. যারা ক্ষমতাবান তাদের দ্বারা নির্যাতিত হলেও কোনো বিচার চাইতে যাওয়াটা অন্যায়
২. আর্থিক সামর্থ না থাকলে অভিযোগ, বিচার, অধিকার এসব অনর্থক
৩. একজন শিক্ষিত ও সোচ্চার ব্যাক্তির জীবনে যদি এরকম ঘটনা ঘটে তাহলে যারা কম শিক্ষিত গরিব তারা কি পরিমাণ নির্যাতিত হচ্ছে সমাজের আনাচে কানাচে!
৪. পুলিশ জনগণের বন্ধু – এটা যে চিন্তা করে তারমতো বেওকুফ দ্বিতীয়টা নেই, কারণ এটা সম্ভব নয়। পুলিশ তার অর্পিত দায়িত্ব পালন করলেই সাধারণ জনগণ খুশি। বন্ধু হলেই বরং অশনি সংকেত।
৫. একজন সচিবের এতো ক্ষমতা! তাহলে একজন মন্ত্রীর কত?
৬. বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে কোনো দিনেই মধুর সম্পর্ক ছিল না। সম্ভব নয়। পুরাটাই আর্থিক লেন-দেন, বাড়িঅলা তার সার্ভিস দিতে বাধ্য, অন্যদিকে ভাড়াটিয়াও ভাড়া দিতে বাধ্য।

ঢাকা শহরে গুটিকয়েক জঙ্গির আচরণে ব্যাচেলররা বাসা ভাড়া পায় না, তাদেরকে সমাজের অপাংতেয় মনে করে বাড়িওয়ালারা, যারাই বা দেয় তারা উচ্চমূল্যে ভাড়া নিয়ে থাকেন। অথচ অনেক বাড়িওয়ালা বা বাড়িওয়ালির দেখার কেউ নাই, শারীরিক অবস্থা ভালো নয় বা সন্তান রা দেশে থাকে না, তাদের দেখা শোনার অনেক মানবিক অংশই এই ব্যাচেলর ভাড়াটিয়ারা করে থাকে

মানুষ মাত্রেই তার কিছু ভালো-মন্দ থাকবে, বাচ্চারা হৈ-হুল্লোড় করবে, আত্মীয়রা তার প্রিয়জনের কাছে আসবেই, প্রয়োজনে বাসায় ফিরতে দেরি হবেই। তাই সে বাড়িওয়ালা হোক আর ভাড়াটিয়াই হোক। আসলে প্রয়োজন উভয় পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ। ভাড়াটিয়া মানেই রাস্তায় থাকা গৃহহীন মানুষ নয়, অনেক ভাড়াটিয়ারই যে সম্পদ আছে তা দিয়ে অনেক বাড়িওয়ালাকে কিনতে পারবে, তাই বলে বাড়িওয়ালার প্রতি খারাপ আচরণ করা যাবে না। বাড়িওয়ালা মানে ব্রাহ্মণ/রাজা ভাবার কিছু নাই।

১. আমি মনে করি ঢাকা শহরে স্থানভেদে বাসার কোয়ালিটি অনুযায়ী বাসা ভাড়ার একটা তালিকা থাকা উচিত,
২. বাসার আধুনিকায়ন ও বাসাভাড়া বৃদ্ধিরও সময় ও শতকরা হার নির্ধারণ করা যেতে পারে,
৩. বাড়িওয়ালা তার বাসা ভাড়া দেওয়ার সময় নিজের সার্ভিস ও ভাড়াটিয়ার অবশ্য পালনীয় বিষয়গুলো লিখিত আকারে চুক্তিপত্র থাকতে পারে।
৪. উভয়পক্ষের অনাকাঙ্খিত আচরণের জন্য আইনী বিষয় স্থানীয় প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে।
৫. ভাড়াটিয়ারা যাতে আইনি সহায়তা পেতে পারে সে ব্যাপারে থানা থেকে একটা সার্ভিস ডেস্ক চালু রাখতে পারে, কেননা ভাড়াটিয়াদের কোনো স্থানীয় জনসমর্থন থাকে না তাই থানাই একমাত্র আইনি সহায়তা কেন্দ্র।
৬. বাসা ভাড়া লেনদেন অবশ্যই রশিদের মাধ্যমে হতে পারে।