ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

আমার কোরিয়াতে আসার বয়স ১ বছর। এই এক বছর এত দ্রুত চলে গিয়েছে ভাবতেই অবাক লাগছে। কোরিয়াতে আসার আগে এখানকার পরিশ্রমী মানুষগুলো সম্পর্কে হালকা ধারণা পেয়েছিলাম আমার ডিপার্টমেন্টের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহোদয়দের কাছে। উনারা পরামর্শ দিয়েছিলেন পরিশ্রম করার ব্যাপারে। এখানে আসার পরে দেখতে পেলাম যে সত্যিকারের পরিশ্রম কাকে বলে।

বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও দমে যাননি এই আজুম্মা

ছবি: বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও দমে যাননি এই আজুম্মা

এখানের প্রফেসর শুরুতেই সতর্ক করে দিয়েছেন যে তোমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। এখানে সময় খুব দ্রুত চলে যায়, পরিকল্পনা মাফিক সবকিছু করে যাবার পরামর্শও দেন তিনি।  সে সব কথা শুনে একটু আশ্চর্যই হয়েছিলাম বটে। সময় দ্রুত যেতে পারে কিভাবে! বাংলাদেশেও ১ দিন সমান ২৪ ঘন্টা, এখানেও ২৪ ঘন্টা। তবে দ্রুত যায় কিভাবে?

পেলাম সব প্রশ্নের উত্তর। পেলাম ভালোভাবেই। কিন্তু উত্তর পেতেই ১ম ও ২য় সেমিস্টার শেষ হয়ে এল। এবার হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি হলো দ্রুত সময় কেটে যাবার ব্যাপারে। আজুম্মায় ফিরে যাই। কোরিয়ান ভাষায় আজুম্মা মানে হল বয়স্ক মহিলা। তবে আজুম্মায় ফিরে যাবার আগে ছোট করে নিজের বর্তমান বাসস্থান নিয়ে কিছু বলতে চাই।

আমি থাকি কোরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে। গোয়াংজু শহরের ছমদান এলাকায়। ক্যাম্পাসের আশেপাশে অবসর সময়ে বাইসাইকেল নিয়ে ঘুরার সময় এখানকার আজুম্মাদেরকে দেখার সুযোগ হয়। এরকমি একদিন চলার পথে দেখতে পেলাম বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একজন বয়স্ক মহিলাকে যিনি রাস্তার পাশে পেঁয়াজ-রসুনের চারা লাগাচ্ছিলেন। দেশে থাকার সময় অনেকের কাছে শুনেছিলাম যে তাদের শখ বাগান করা। অনেক সৌখিন বাঙালি নারী-পুরুষের শখ বাগান করা। আমরা ছোটবেলায় বাংলা বা ইংরেজীতে শখ নিয়ে রচনা, প্যারাগ্রাফ পড়ে এসেছি, লিখেছি হয়তবা যে আমার শখ বাগান করা।

আমার গল্পের আজুম্মা হয়তোবা ছোটবেলায় লিখে এসেছেন যে তার শখ পেঁয়াজ-রসুনের চারা লাগানো। দূর থেকে দেখে উদ্ভট মনে হলেও কাছে গিয়ে সত্যি বিমোহিত হয়ে পড়েছিলাম। সেই মহিলার বয়স এতই বেশী যে তিনি ভালোমতো হাঁটতেই পারছিলেন না। মহাসড়কের পাশের ফাঁকা জায়গায় চেয়ারে বসে বসে চারাগুলো লাগাচ্ছিলেন। উনাকে মাঝে মাঝে সহযোগিতা করছিলেন আরেক যুবক। যুবকটি হয়তোবা মহিলার নাতি গোছের কেউ হবেন। ধৈর্য্য সহকারে বৃদ্ধ মহিলাকে দেখছিলেন। তার চোখে মুখে কোন অবহেলার বিন্দুমাত্র চিহ্ন ছিলনা। বৃদ্ধ মহিলার শখের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই হয়তোবা এমনটি। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এল। পাঠক ভাবুন তো ঐ একজন বৃদ্ধ মহিলার পেঁয়াজ-রসুনে আমার আপনার কিইবা হবে। তবুও কেন?

এটাতো গেল শুধুমাত্র একজনের কথা। চলার পথে অনেক বেশি বয়স্ক আজুম্মাদেরকে দেখেছি রাস্তার বা আশেপাশের ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করতে। যাদের হাঁটা চলাই কষ্ট তাদের এই পরিশ্রম দেখে নিজের সাথে মিলাই। সেই বয়সে আমি বা আমরা কী করব?

স্ট্রিট মার্কেটে এভাবেই পসরা সাজিয়ে বসেন আজুম্মারা

ছবি: স্ট্রিট মার্কেটে এভাবেই পসরা সাজিয়ে বসেন আজুম্মারা

রাস্তায় চলার পথে দেখবেন আজুম্মা আজশিদেরকে ছোটখাট দোকান চালাতে। রাস্তার পাশে ফলের পসরা সাজিয়ে, কম মূল্যের পোশাকের দোকান বানিয়ে দিব্যি ফুরফুরে মনে দেখতে পাবেন তাদেরকে। ডরমিটরিতে ক্লিনার হিসেবে দেখতে পাবেন অনেককে। এপার্টমেন্ট রং করার কাজেও দেখেছি কিছু আজুম্মাকে আজশিদের (বয়স্ক পুরুষ) সাথে কাজ করতে। মহিলা হবার কারণে আবার বয়স্ক হবার কারণে এসব দেখে খুবি অবাক হয়েছি। কিন্তু কিভাবে সম্ভব এতকিছু?

আমরা অনেকেই আড্ডাবাজির সসময় বলে থাকি কোরিয়ান সমাজ, শিক্ষাব্যাবস্থার কথা। চাপ, এই টার্মটি আমাদের খুব পরিচিত। আামরা তুলনা করি যে কে কতটা চাপে থাকি এখানে পড়তে এসে। ক্লান্ত হয়ে যাই চাপের কারণে। এই চাপটুকুকে মানিয়ে নিয়ে যেমন এখানে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন অনেক বাংলাদেশী ভাইবোন, তেমনি অল্প কিছু সংখ্যক আবার ঝরেও পড়েছেন। কিন্তু কোরিয়ান ছেলে-মেয়েরা এসব চাপ ছোটবেলা থেকেই অভ্যস্ত। বাধ্যতামূলকভাবে লম্বা সময় ধরে ক্লাসে বসে থাকা, স্কুলে অনেক রাত পর্যন্ত থেকে পরিশ্রমী মানসিকতা গড়ে উঠে তাদের। এসব কারণে কিছু মজার অভ্যাসও গড়ে উঠে। একারণে ল্যাবের চেয়ারে বসে কিংবা ক্লাসে বসে দিব্যি ঘুমাতে দেখবেন অনেককে।

দোকানের পণ্যের যত্ন আত্তিতেও কম জাননা তারা

ছবি: দোকানের পণ্যের যত্ন আত্তিতেও কম জাননা তারা

এই অভ্যাসে গড়ে উঠা মানুষগুলো যখন আজুম্মা-আজশিতে পরিণত হন তারা নিষ্কর্মা হয়ে বসে থেকে কারো বোঝা হতে চাননা। কিছুনা কিছু করার চেষ্টা করেন। অনেকে শখের বশে পেয়াজ রসুনের বাগান করার মতও ছোটখাট কাজগুলো করেন। এভাবেই পরিশ্রমী জাতি হিসেবে গড়ে উঠেছে কোরিয়া সহ উন্নত দেশগুলো। আমাদের দেশের মানবসম্পদকে যদি এভাবে গড়ে তোলা যেত হয়ত আমরাও হতে পারতাম এদের মত। জানা-অজানা অনেক কারণেই আটকে আছি আমরা। তবুও আমি হতাশ নই। স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশকে নিয়ে। আমরা ফিরব। দেশে ফিরব। শুধু অর্থ নয়, অর্জনের তালিকায় থাকবে এই সুন্দর অভিজ্ঞতাগুলোও। হয়তোবা শেষ বয়সে মনে পড়বে রাস্তার পাশে চেয়ারে বসে কাজ করতে থাকা আজুম্মার কথা। আর হ্যাঁ, তখন হয়তো হাতে তুলে নিব ফুলের চারার সাথে কয়েকটা পেঁয়াজ-রসুনের চারাও।

লেখক-
শিক্ষার্থী (মাস্টার্স),
গোয়াংজু ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি
দক্ষিণ কোরিয়া