ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ওয়ালিউল্লাহ, ছাত্র ও সাংবাদিক

জাবি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকার অদুরে সাভারে ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। মোট ৬৯৭.৫৬ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়টি মাঝে মাঝেই অন্যায়ের প্রতিবাদের সোচ্চার হয়ে উঠে। সব সময় অন্যায়, অনিয়ম, অনাচার, অবিচারের প্রতিবাদ করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। প্রতিবাদ করে কয়েকজন উপাচার্যকে পদ থেকে পদত্যাগে করতে বাধ্য করেছে তারা। এছাড়া বিভিন্ন সময় ঘটে যাওয়া ধর্ষন-সন্ত্রাস বিরোধী, সানি-কাফি বিরোধী আন্দোলনের সফলতার সাক্ষর রেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ আন্দোলন হয়েছিল অগণতান্ত্রিক উপায়ে উপাচার্যে পদ আকড়ে ধরে থাকা অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবিরের পদত্যাগের দাবিতে। দীর্ঘ দিন ধরে চলা শিক্ষক শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের ফলাফল প্রকাশিত হয় গত ১৭ মে বৃহস্পতিবার।

ফলাফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির পদত্যাগ করেন এবং একই সাথে আচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব দেন।

কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির পদত্যাগ করায় আন্দোলনকারী শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ও ক্যাম্পাসবাসী আপাত দৃষ্টিতে বিজয়ী হলেও নতুন উপাচার্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে নিয়োগ দেয়ায় জাবির শিক্ষক শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়েছেন। জাবির প্রভাবশালী কয়েকজন শিক্ষক উপাচার্য হওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গায় লবিং করার ফলে সবারই ধারণা ছিল নতুন উপাচার্য হওতোবা জাবির কোন শিক্ষক হবেন।

আবার হতাশ হওয়ারও কিছু নাই কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ র অধ্যাদেশে বলা আছে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যকে ৪৫ দিনের মধ্যে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন দিতে হবে।

অপরদিকে নতুন নিয়োগ প্রাপ্ত জাবির উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি ১৯৭৩ র অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করবেন।

তার মানে ১৯৭৩ র অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হলে তাকে অবশ্যই উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন দিতে হবে। এই উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন দিলে জাবির কোন শিক্ষক উপাচার্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সময়ই বলে দেবে কি হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বিভিন্ন সময় তার বক্তব্যে নির্বাচিত উপাচার্যের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি হয়ে তিনি সমিতির পক্ষ থেকে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন দাবি করেছিলেন। আমরা আশাকরি এবং বিশ্বাস করি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষক শিক্ষার্থী উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন দাবি করার আগেই তিনি তার কথা মর্যদা রাখতে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের আয়োজন করবেন।

অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন দায়িত্ব নেয়ার পর পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্টসহ শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে কথা বলেছেন। এ সময় আমার জানা মতে বিভিন্ন সংগঠন তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরেছেন উপাচার্যের কাছে। উপাচার্য যদি তার বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতা দিয়ে এই সকল দাবি দাওয়া মেনে ও সকলের সাথে সামঞ্জস্য রেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চালাতে পারেন তাহলে তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যোগ্য উপাচার্য বলে বিবেচিত হবেন। আর যদি তিনি মনে করেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবিরের মত যা ইচ্ছা তাই করবেন তাহলে তিনি ভুল করবেন।

বিগত তিন বছর অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির যা ইচ্ছা হয়েছে তাই করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সাথে আলাপ আলোচনার প্রয়োজন মনে করেন নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবারের কারো মতামত তিনি গ্রহন করেন নি। তার শেষ পরিনতিও খুব ভাল হয়নি। শিক্ষক শিক্ষার্থীরা মিলে একযোগে তাকে এই ক্যাম্পাস থেকে স্বৈরাচারী উপাচার্যে আক্ষা দিয়ে বিদায় করেছেন।

নতুন উপাচার্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিভাবকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালভাবে পরিচালনা করার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দেখভাল করার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্ট পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।

নতুন উপাচার্য যদি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সাথে সব কিছু মানিয়ে চলতে পারেন তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই তাকে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করবে। যদি এর বিপরীত হয় তাহলে আবারো শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে গনতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য, ক্যাম্পাসের শিক্ষার সুষ্ঠ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য এবং ১৯৭৩ র অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্দোলনে নামবে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালে ধর্ষন ও সন্ত্রাস বিরোধী আন্দোলনের মুখে তৎকালীন উপাচার্য ও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

২০০৪ সালে অগনতান্ত্রিক উপাচার্যে বিরুদ্ধে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে তৎকালীণ অগনতান্ত্রিক উপাচার্য অধ্যাপক জসিম উদ্দিনকে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছিলেন।

নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক সানোয়ার হোসেন (আহমেদ সানি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুল্লাহেল কাফির বিরুদ্ধে উঠা যৌন নিপীরণের অভিযোগ শিক্ষক শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে তদন্ত সাপেক্ষে বিচার করতে বাধ্য করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে।

২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের শৃংখলা অধ্যাদেশ নতুন করে প্রনয়ন করেছিল। সেই অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কিছু অধিকার খর্ব করা হয়েছিল বলে এক রাতেই শিক্ষার্থীরা মিছিল করে এই অধ্যাদেশ রাতেই স্থগিত করতে বাধ্য করেছিল বিশ্ববিধ্যালয় প্রশাসনকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস প্রতিবাদের ইতিহাস। যা নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার গর্ব করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যখনই কোন অনিয়ন ও অনৈতিক কর্মকান্ডের অভিযোগ উঠে তখনই শিক্ষক শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের মাধ্যমে তার বিচার আদায় করেই ছাড়ে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ পর্যন্ত যতগুলো আন্দোলন হয়েছে তার বেশীর ভাগই সফলতার মুখ দেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়তো একসাথে বিশ, ত্রিশ বা চল্লিশ বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান করতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা অধিকাংশই পাচ বছর অথবা সাত বছরের বেশী থাকতে পারে না। কিন্তু এই পাচ কিংবা সাত বছরে তারা কোন না কোন আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকে। আন্দোলনের কেউ থাকে সিনিয়র আবার কেউ থাকে জুনিয়র। এ সময় জুনিয়ররা সিনিয়রদের কাছে ভাল ভাবেই শিক্ষা লাভ করে কিভাবে আন্দোলন করতে হয় আর কিভাবে আন্দোলন করলে সফল হওয়া যায়। তাই পর্যায়ক্রমে এই শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ব্যাচই লাভ করে। আর এ জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষাসহ যেকোন অনিয়মের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা আন্দোলনগুলো এত শক্তিশালী হয়।

অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরের পদত্যাগের মূলে যে সংগঠনটি কাজ করছে সেটি হল ‘শিক্ষক সমাজ’। ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্ব^র অন্যায়ের প্রতিবাদ করার লক্ষ নিয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষক সমাজ ব্যানারের শিক্ষকরা প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাহীন গণনিয়োগের বিরোধিতা ও গণনিয়োগ বাতিলের দাবি করে আসছিলেন। পরবর্তীতে গত ৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের হাতে খুন হওয়ার ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘শিক্ষক সমাজ’ ব্যানারের শিক্ষকরাও প্রতিবাদ করেন এবং বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ‘শিক্ষক সমাজ’ ব্যানারের শিক্ষক ও ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জুবায়ের আহমেদ হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ১৩ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিস্কার করে।

পরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে আন্দোলন স্থগিত করেলেও মেধাহীন ও গণনিয়োগের প্রতিবাদে ৮ দফা দাবিতে আদায়ের লক্ষ্যে শিক্ষকদের আন্দোলন অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে ১৫ মার্চ বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে চারটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য পতনের দাবিতে দশ দিনের কর্মসূচী ঘোষনা ‘শিক্ষক সমাজ’। ১৮ মার্চ রোববার থেকে উপাচার্য পতনের আন্দোলনে নামে শিক্ষকরা।

‘শিক্ষক সমাজ’ হঠাৎ করে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে নি। প্রথমে তারা উপাচার্যের কাছে আট দফা দাবি পেশ করেন। উপাচার্য সে সব দাবি বিষয়ে তোয়াক্কা না করায় শিক্ষক সমাজের শিক্ষকরা উপাচার্য পদত্যাগের দাবিতে যান।

শিক্ষক সমাজের আট দফা দাবির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য যে দাবিটি ছিল সেটি হল ১৯৭৩ র অধ্যাদেশ মেনে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন দেয়া। অপরদিকে ‘জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট’র দেয়া এগাড় দফা দাবির মধ্যে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনটি ছিল অন্যতম এবং ছাত্র ইউনিয়নের একুশ দফা দাবির মধ্যেও উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছে।

উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন না দিলে এই সব সংগঠন আবারো আন্দোলন শুরু করতে পারে।

সুতরাং নতুন উপাচার্যকে দায়িত্ব নিয়েই তাকে উপাচার্য প্যানেলে নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং পরবর্তীদের ক্যাম্পাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অধিকার সংক্রান্ত অন্যান্য দাবি সমুহ আমলে এনে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক: ওয়ালিউল্লাহ: ছাত্র ও সাংবাদিক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়