ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

Sylhet-1

মানুষরূপী দানবেরই যেন দেখা পেলাম আমরা। আজ ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে প্রথম যে পোস্টটি চোখে পড়েছিল সেটি তের বছর বয়সী রাজনের দু’টি ছবি। ছবিগুলো দেখলাম, খবরটি পড়লাম কিন্তু আমি দূর্বল হৃদয়ের মানুষ, একটি শিশুকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (দানব শব্দটি বেশি মানানসই) মেরে ফেলছে সেটি দেখা এবং সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় । আমি ভিডিওটি দেখিনি। শুধু আমি নই, আমার মত আরও অনেকই দেখেননি ভিডিওটি, না দেখেই তারা অঝোরে কেঁদেছেন। আমিও কেঁদেছি, এখনও টাইপ করতে বসে চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

দু’বছর আগে মা হবার পর থেকে এই সমস্যার শুরু। কোন শিশুর কষ্ট অথবা মৃতদেহ দেখলে দু’চোখ ভিজে উঠে। ঐ শিশুটির জায়গায় নিজের সন্তানকে কল্পনা করি। জানিনা যারা শিশুটিকে খুন করল এরা কি কারও পিতা কিনা, পিতা হলে বলতে হয়, এদের পৃথিবীর কোন শিশুর পিতা হবার যোগ্যতা নেই। পশুরাজ্যে এক পশু অন্য প্রজাতির পশুর সন্তানকে কোলেপিঠে করে বড় করেছে এমনও নজির আছে।সেখানে আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হয়ে একে অন্যকে নৃশংসভাবে প্রতিদিন মেরে ফেলি। আমাদের মানসিক বিকৃতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমরা শিশু নির্যাতন আর হত্যা করেও বিকৃত সুখ লাভ করি।

আমাদের মাঝেই যে মানুষরূপী দানবদের বাস সেটি প্র‍্যতিদিন সোশ্যাল মিডিয়াতে গেলেই বোঝা যায়। আমাদের বিকৃত মানসিকতার পরিচয় মেলে আমাদের ভাষায়। শুরু হয় কুরুচিকর ভাষা দিয়ে অন্যকে উত্যক্ত এবং অপমান করে, সময়ের সাথে সাথে সেটি শুধু ভাষাতে আর সীমাবধ্য থাকে না, পরিণত হয় অসহায়ের উপর পেশিশক্তি প্রদর্শনীতে, যার একটি হৃদয়বিদারক প্রমাণ আমরা গতকালই পেলাম — কি অপরিসীম সাহস আধুনিক (!) কালের দানবদের, তাদেরই এক দোসর খুনের ভিডিও করে তা ছড়িয়ে দিয়েছে ইন্টারনেটে। এ যেন পাশবতার উল্লাস! আমি একজন মা হয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে আকুতি করেছি, এই দানবরা যেন ইহকাল, পরকাল কোন কালেই এক মূহুর্তের জন্য শান্তি না পায়, এক মূহুর্তের জন্যও নয়।

আশা করব আমাদের আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী খুনীদের গ্রেপ্তার করে যথাযথ এবংদৃষ্টান্তস্বরূপ শাস্তির ব্যবস্থা করবেন, যেন একজন দানবের পরিণতি দেখে দশজন মানুষ সতর্ক হয়। সমস্যা হচ্ছে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অতীতে বহুবার আমাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে এবং এখনও করছে। কিন্তু কি বলুন তো তাও আশা করে আছি, হয়তো একদিন ভাল দিন আসবে…।

আরও একটি কথা না বললেই নয়। রাজনের মত হয়তো প্রাণ দিচ্ছে না কিন্তু প্রতিদিন আমাদের দেশে নির্যাতিত হচ্ছে বহু শিশু। আমাদের অনেকের বাড়িতেই যে ছোট ছেলে অথবা মেয়েটি কাজ করে তার গায়ে আমরা অনেকেই দু’বার চিন্তা না করে হাত তুলে ফেলি। সেদিন দেখলাম প্লেট ভাঙ্গার অপরাধে একটি ছোট মেয়েকে শাস্তি দিয়েছে তার ম্যাডাম। ম্যাডাম সে মেয়েটির নরম, কোমল হাত ক্ষত-বিক্ষত করেছে ভাঙ্গা প্লেটের টুকরো দিয়ে। যে শিশুটি পেটের দায়ে কাজ করছে দোকান, গাড়ির ওয়ার্কশপ অথবা রেস্টোরান্টে তার গায়েও তার মালিক অথবা বয়সে বড় অন্যান্য কর্মচারীরা অনায়াসে চড়, কিল, ঘুষি, লাথি বসিয়ে দেয় নিয়মিত। যেখানে স্কুলে যাবার কথা এই শিশুদের সেখানে তারা কোমল শরীরে ঘাম ঝরিয়ে সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করছে পেট ভরে দু’বেলা খাবার আশায়। আমরা কি পারিনা সামান্য একটু ভাল ব্যবহার করতে এদের সাথে? আসলে পরিবর্তন আনতে চাইলে নিজেকে দিয়েই আমরা পারি সেটি শুরু করতে।

লেখাটির শিরোনাম ছোটবেলায় বহুবার শোনা একটি প্রিয় গানের লাইন। ভূপেন হাজারিকার গলায় গাওয়া “মানুষ মানুষের জন্যে।” আজ এক বন্ধুর ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেখে মনে হল এর চাইতে যথাযথ শিরোনাম আজকের লেখাটির জন্য হতে পারেনা।

“মানুষ যদি সে না হয় মানুষ
দানব কখনও হয়না মানুষ
যদি দানব কখনও বা হয় মানুষ
লজ্জা কি তুমি পাবে না?”