ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

দেশে থাকতে চীন দেশের মানুষের সংস্পর্শে তেমন একটা আসিনি। মানে আগে তো আমাদের দেশের বিউটি পার্লারগুলো চীনা বংশদ্ভুত পরিবারগুলোই চালাতো। ছোটবেলায় যখন ধানমন্ডির মে ফেয়ার অথবা হংকং বিউটি পার্লারে যেতাম চুল কাটাতে তখন চীনা মহিলাদের দেখেছি। তাদের বাংলাতে একটা অন্যরকম টান থাকলেও, তাদের কথা বুঝতে কখনও অসুবিধে হয়নি। চেয়ার বললে চেয়ারই বুঝতাম, অন্য কিছু নয়।

প্রায় পনের বছর আগে এক লেখার কাজে এমন এক চীনা বংশদ্ভুত পরিবারের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। ঢাকার ধানমন্ডিতে একসময় অবস্থিত হংকং চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এবং বিউটি পার্লার ছিল তাদের মালিকানাধীন। সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে দেখি এক চীনা ভদ্রলোক আমাদের দেশিয় লুঙ্গি পড়ে খুব নির্বিকার ভঙ্গিতে সিগারেট টানছেন। জানিনা আমাদের ভড়কে দেয়ার জন্যই কিনা। যাই হোক, পরিবারটির সাথে কথা বললাম, তাদের ব্যবসা, কী করে এই দেশে এলেন এসব সব জানলাম। তারা পুরোনো কিছু পারিবারিক ছবিও দেখালেন। বুঝলাম যে চেহারা, গায়ের রং আর আকারেই শুধু তারা চৈনিক, মনে-প্রাণে তারা নিজেদের বাংলাদেশিই ভাবে। অতএব, বাংলাদেশে সত্যিকারের চীন দেশের মানুষের সান্নিধ্যে আমি কখনই আসিনি।

দেশের বাইরে এসে প্রথম তাদের দেখলাম। একদম ১০০ ভাগ খাঁটি চীন দেশের মানুষ, যাদের কথার ৮০ ভাগই আমি বুঝিনা, ২০ ভাগ টেনেটুনে কোনো রকমে। কপাল এমন যে যেই প্রফেসরের সাথে কাজ করবো তিনিও চাইনিজ। প্রথম প্রথম এতো অসুবিধে হতো। ওনার এক ক্লাস লেকচারে উনি বারবার বলছিলেন Effective, আর আমি বারবার শুনছিলাম Negative! একেবারে ভিন্ন অর্থ দু’টি শব্দের। লেকচারের মানেই বদলে গিয়েছিল! মানুষ পারেনা এমন জিনিষ কম আছে, কারণ কিছু মাস পর আমি ওনার “চৈনিক ইংরেজি” বুঝতে শুরু করলাম।

প্রবাসে এসে খুব বেশি বন্ধু হয়নি আমার। হাতেগোনা যে ক’জন বন্ধু হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম চেন। চায়নাতে প্রচুর মানুষের নাম নাকি চেন। চেনের ইংরেজি আমার প্রফেসরের চাইতেও ভয়াবহ। ও কি বলে আমি কিছুই বুঝিনা, মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় অনুরোধ করি যেন কাগজে লিখে দেয় ওর বক্তব্য। সদ্য চীন থেকে আসা চেন এর ইংরেজি শুধু আমি নই, অন্যরাও বুঝতে পারে না। কিন্তু কিভাবে কিভাবে এই মেয়েটিই আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী হয়ে উঠেছিল প্রবাসে। ক্লাসের পর অথবা বন্ধের দিনগুলোতে কেনাকাটা করা, বাইরে খাওয়া, বাজার করা সবই চলতো চেনের সাথে। চেনের ইংরেজি সময়ের সাথে সাথে অনেক ভাল হয়ে উঠেছিল। নির্ভুল ইংরেজি লিখতো চেন, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী ছিল সে। যতসব সমস্যা হত ইংরেজি বলবার সময়।

কিছু মাস আগে হঠাৎ ডাকে একটি খাম এসে হাজির। খুলে দেখি চেনের পাঠানো একটি মজার কার্ড। পড়ালেখার পাট চুকে গেছে বহু আগে কিন্তু বন্ধুত্বে ভাটা পড়েনি – চোখের আড়াল হলেও মানুষ হয়তো সবসময় মনের আড়াল হয়না।