ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

আমি আর আমার ছোটবেলার এক বান্ধবী প্রতিবছর দু’টো দিন আলাদা করে রাখি নিজেদের মত ঘুরব বলে- এ যেন একেবারে ছোটবেলার ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা’ ধরনের এক রকম অপার আনন্দ, সীমাহীন উচ্ছাস! নিজের প্রতিদিনকার জীবন থেকে একটি বিরতি। মায়েদের জন্য বিরতির কতটা প্রয়োজন সেটি কোন ফুলটাইম মা’কে জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারবেন। আমার কাছে মনে হয়েছিল দু’দিনের একটি বিরতি আমাকে আরও ভাল মা হতে বরং সাহায্য করবে। কারণ আমি বিশ্বাস করি, শুধু একজন সুখী মা পারেন একটি সুখী সন্তান গড়ে তুলতে।

যাই হোক, যখন পরিবারের মুরুব্বীদের বলেছিলাম যে আমি দু’দিনের জন্য ছুটি কাটাতে নিউইয়র্ক যাব আমার ছোটবেলার বান্ধবীর কাছে, তারা অবাক হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। আমাদের কালকচারে সাধারণত মেয়েরা স্বামী-সন্তান ছাড়া হলিডেতে যায়না। প্রথম বছর অনেকরকম কথাও শুনেছিলাম: আড়াই বছরের বাচ্চাকে বাবার কাছে রেখে কেন যাবে ঘুরতে? কেউ যায়? আমরা এত যুগ সংসার করলাম, কখনও সন্তানদের রেখে কোথাও ঘুরতে যাইনি, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমি বলেছিলাম, “যেটি তোমারা করতে পারনি সেটি আমি করে দেখাতে চাই, তোমাদের ইচ্ছে ছিল কিন্তু পারিবারিক এবং সামাজিকসহ নানা কারণ তোমাদের জীবনের অনেক ছোটখাট ইচ্ছেও অপূর্ণ থেকে গেছে। আমি চাইনা আমার ছোট-ছোট ইচ্ছেগুলো আজীবন ইচ্ছেই থেকে যাক।”

আর আমি জানতাম আমার কন্যা তার বাবার কাছে খুব ভাল থাকবে, বিদেশে বেশিরভাগ বাবারা ছোটবেলা থেকে সন্তানদের সাথে প্রচুর সময় কাটায় (আমি আমার আশেপাশে তাই দেখেছি)। ডাক্তাররাও বলে দেন এটি করতে। এটির সবচেয়ে ভাল দিক হচ্ছে এতে বাবা আর সন্তানের মধ্যে এক ধরণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। আমরা যেমন বাবাদের অসম্ভব ভয় পেতাম, সন্ধ্যায় কলিং বেলের টুং টাং শব্দে দুষ্টুমি ছেড়ে পড়িমরি করে পড়ার টেবিলে বসতাম অথবা টিভি অফ করে দিতাম, এখানের বাচ্চাদের তা করতে দেখিনা। আমরা সারাদিনের খুটিনাটি গল্প বাবাদের সাথে শেয়ার করতাম না, সব আবদার করার জন্যও একটিই মানুষ ছিল- মা। এখানে আমার মেয়ে বাবার অফিস থেকে ফেরার জন্য বরং অপেক্ষা করে, ঘরে ঢোকার সাথে সাথে গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে! অতএব আমি জানতাম আমার মেয়ের বাবা, যে তার সন্তানের জন্মের প্রথমদিন থেকে তার সন্তানের যত্নআত্তিতে আমাকে প্রতিনিয়ত সাহায্য করে গেছে, সে তার মেয়ের কোন অযত্ন করবেনা। আমার ধারণা সত্যি ছিল।

আমি মহা উৎসাহে প্রতিবছর এই ছুটির জন্য অপেক্ষা করি, দুই বান্ধবী মিলে প্ল্যান করি কোথায় কোথায় ঘুরব, কি কি খাব, শপিং করতে কোথায় যাব, ইত্যাদি। দু’টো দিন কি করে যেন নিমেষেই শেষ হয়ে যায় ম্যানহ্যাটনের রাস্তা, পাতাল রেল, রেঁস্তোরা, কফি হাউজ আর দর্শনীয় স্থানগুলোতে গল্প করতে করতে, হাসতে হাসতে। এ যেন হারিয়ে যাওয়া কৈশরকে নতুন করে ফিরে পাওয়া। দিনের শেষে এক কাপ চা যেমন আপনাকে চাঙ্গা করে তোলে, গত তিনবছর ধরে নিজের মত করে কাটানো দু’টো দিনের এই বিরতি আমাকে ঠিক একইভাবে সঞ্জীবিত করে। একই সাথে আমাকে এটিও বুঝিয়ে দেয় যে আমার নিজের সংসার আমার কাছে কতটা প্রিয়, কারণ সন্তান আর তার বাবাকে মিস করতে শুরু করি, তারাও আমাকে মিস করতে শুরু করে।

আর কেউ আপনাকে মিস করছে এটি ভাবার মধ্যেও এক রকমের আনন্দ আছে, তাই না? আমরা অনেকসময় একজন মানুষের মূল্য তখনই বুঝতে পারি যখন সে কাছে থাকেনা। আর পুরুষ হোক বা নারীই হোক, আমি বিশ্বাস করি আমাদের সবার অধিকার আছে অবস্থা বুঝে নিজের মত করে ক’টা দিন কাটানোর- হতে পারে কোন বন্ধুর সাথে অথবা আত্মীয়র সাথে। একেবারে শহর ছেড়ে বা দেশ ছেড়ে খুব দূরে কোথাও সবসময় চলে যেতে হবে সেটিও নয় কিন্তু। একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন, একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবন থেকে ছোট্ট একটি বিরতি। কে জানে, নবশক্তির সঞ্চার হলেও হতে পারে!