ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

আজ banglanews24 এ ফটো সাংবাদিক ফারজানা খান গোধূলির একটি লেখা পড়লাম। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত গোধূলির নাম হয়তো আমরা অনেকেই শুনেছি, পত্রিকায় দেখেছি। “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ!” শিরোনামে তার লেখাটির বক্তব্য জোড়ালো এবং সাহসী মনে হয়েছে। তিনি তার লেখায় সাগর-রুনির হত্যার ব্যাপারটি তুলে ধরে জানতে চেয়েছেন, কেনো উনি এসবের পরও একজন সাংবাদিক হয়ে দেশে ফিরে আসবেন তার স্বামী এবং ১৭ মাস বয়সী কন্যাসহ। লেখাটির ব্যপারে আর বিশেষ কিছু না বলে পাঠকদের পড়বার জন্য ওয়েব লিঙ্কটি এখানে দিয়ে দিচ্ছি।

লেখাটি পড়ে মনে হয়েছে, সত্যিই তো বলেছেন গোধূলি। শুধু দেশের ভেঙে পড়া আইনী ব্যবস্থার জন্য অনেক প্রবাসীই দেশে আসতে সাহস করেন না। তারা তাদের জান-মালের নিরাপত্তার কথা ভাবেন। ভাবা ভুল না। আপনি যেই দেশের নাগরিকই হন না কেন, আপনার নিজের নিরাপত্তার কথা ভাববার অধিকার আপনার আছে। দেশে সৎ সাংবাদিকের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারত যদি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারতেন সরকার।

জ্বী, জানি সাংবাদিকতায় প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু একজন সাংবাদিকের যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ এক ব্যপার এবং নিজের বেডরুমে সন্তানের সামনে স্বামীসহ পৈশাচিকভাবে খুন হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা ব্যপার বলেই মনে করি।

ছোটবেলায় ইচ্ছে ছিল সাংবাদিক হব। স্কুল থেকে তার প্রস্তুতি হিসেবে পত্রিকায় লেখালিখি করেছি। এখনও সময় পেলে করি। কিন্তু সেটি সাহসী সাংবাদিকতা বলতে যেটি বোঝায় তেমন কিছু না। শুধু সাংবাদিকতার টানে আমেরিকাতে এসে ম্যাস কমিউনিকেশনসে মাস্টার্স করেছি। সাংবাদিকতা আমার কপালে জোটেনি। দেশে ফিরে সাংবাদিকতা করবার সাহস আমার নেই। তাই এখন লেখালিখি একটি ইংরেজী পত্রিকা এবং ব্লগিং এ সীমাবদ্ধ। নিজেকে তেমন মেধাবী বা সাহসী কোনটাই মনে করি না কিন্তু খারাপ লাগে ভাবতে সেইসব মেধাবী তরুণ-তরুণীদের কথা যারা শুধু নিরাপত্তার অভাবে অনেক সময় সাংবাদিকতা পেশার সাথে নিজেদের যুক্ত করে না।

অনেকে বলেন প্রবাসীরা অন্যের দেশে দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক হয়ে বসবাস করেন। আমি দ্বিমত পোষন করি কারণ আপনার যদি মেধা এবং শিক্ষা থাকে আপনি অনেক দেশেই তাদের চোখে মনি হিসেবে কদর পাবেন। এই কদরটা আপনি আপনার দেশে অনেক সময়ই পাবেন না। আর পাবেন না বলেই আপনার চাইতে অনেক কম মেধাবী একজন মানুষ ভাল চাকরি করে, ভাল গাড়ি হাঁকাবেন, ভাল খাবেন এবং ভাল একটি বাসায় থাকবেন। ভাবছেন হয়তো, “এই মেয়ে স্বার্থপর, নিজের আরাম আয়েসের কথা ভাবে, ভাবে না নিজের দেশকে কিছু দেবার কথা।” সত্যি কথা বলতে কি, ভাবি। ভাবি দেশে চলে যাব। কিন্তু যখন ভাবি দেশে সৎ মানুষদের কদর নেই তখন আর ইচ্ছে করে না।

ছোট্ট দু’টি ঘটনা লিখে এই লেখাটির ইতি টানছি। ২০০৯ সালের কথা – ঢাকায় বেড়াতে গেছি। উত্তরার আমেরিকান বার্গারে খাওয়া অর্ডার দিয়ে টাকা দিলাম কিন্তু রিসিটের কোন নামগন্ধ নেই। রিসিট চাইলাম, ক্যাশিয়ার লোকটি মহাবিরক্ত হয়ে বলল, “রিসিট লাগবে??!! কেউ তো রিসিট চায় না।” আমি বললাম, “কিন্তু আমার দরকার।” আমি মোটামুটি হলফ করে বলতে পারি সেই লোক মনে মনে আমাকে গাল দিয়েছিল। যাই হোক, রিসিট দিল। বার্গার নিয়ে বাসায় এসে দেখি দু’টো পোড়া বার্গার এলুমিনিয়াম ফয়েলে মুড়ে দেয়া হয়েছে আমাকে। আমেরিকান বার্গারে ঢাকায় থাকাকালীন বহুবার খেয়েছি, তাদের খাবারের মান সবসময় ভালই মনে হত। এই প্রথম এমন একটি ঘটনার মুখোমুখি হলাম, কেন হলাম সেটিও জানলাম। ভ্যাট ফাঁকি দিতে যেন না পারে সেই জন্য রিসিট চাওয়ায় নির্দ্বিধায় তারা আমাকে দু’টো পোড়া বার্গার প্যাকেটে মুড়ে দিয়েছেন। যেহেতু সেখানে বসে খাই নি তাই সেটি ফেরত নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয়নি।

অন্য ঘটনাটি সংক্ষেপে বলি। নানীর জন্য ফার্মেসীতে গিয়েছি ঔষধ আনতে। লম্বা লাইন। ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে আছি। দোকানওয়ালাদের বিন্দুমাত্র তাড়া নেই। হেলেদুলে তারা ঔষধ প্যাকেট করছেন। হঠাৎ লাইন ভেঙে এক লোক আমাদের সামনে চলে গেল। আমি লোকটিকে যেই বললাম, আমরা প্রায় আধাঘন্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি আর আপনি এভাবে লাইন ভেঙে সামনে চলে গেলেন, কি ব্যাপার? বুঝতেই পারছেন তারপর কি হল। বিশাল ঝগড়া বেঁধে গেল আমার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে, কেন একটা মেয়ে মানুষ এত কথা বলবে? লাইন ভাঙা কোন অপরাধ না ইত্যাদি।

জানিনা এই দেশে দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক হিসেবে আছি কিনা কিন্তু গত তিন বছরে কেউ অসম্মান করেনি, কোথাও সুযোগবঞ্চিত হইনি। যতটুকু প্রাপ্য ততটুকু পেয়েছি। তারপরও আমার মত বহু প্রবাসীর দেশে ফিরে যেতে মন চায় – নিজের দেশ বলে কথা! কিন্তু পত্র-পত্রিকা আর টেলিভিশনের ভয়াবহ খবরগুলো পড়ে আর দেখে মনে হয়, ধূর ছাই! এই তো বেশ আছি। কেন যাব দেশে জানটা হারাতে অথবা রাস্তাঘাটে অসম্মানিত হতে?