ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে যতটা নিষ্পাপ মনে হয় ততটা ঠিক নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে আসে ‘নির্মম প্রবৃদ্ধি’ যেখানে ধনীরা আরও ধনী হয় এবং গরীব আরও গরীব হয়। আসে ‘অপসংস্কৃতির প্রবৃদ্ধি’ যেখানে মানুষ নিজের সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে ভুলে যায়। আরও আসে ‘ভবিষ্যতহীন প্রবৃদ্ধি’ যেখানে বর্তমান প্রজন্ম ভবিষ্যত প্রজন্মের সম্পদ অপচয় করে। এগুলো ‘uneconomies’; বাংলায় অপঅর্থনীতি। গত ত্রিশ বছরে শক্তির দক্ষতা, বুদ্ধির দক্ষতা চমকপ্রদভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মনে হচ্ছে এই শক্তির দক্ষতা, বুদ্ধির দক্ষতা দিয়ে আরও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা নাও হতে পারে কারণ প্রাকৃতিক সম্পদ চিরদিন থাকবেনা। মানব জাতি ইতিমধ্যে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের একটা বিশাল পরিমান ব্যবহার করে ফেলেছে। ভবিষ্যতে উৎকৃষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি তৈরী হবে কিন্তু তারা প্রাকৃতিক সম্পদ পাবে না কিছুই। প্রাকৃতিক সম্পদের এই সঙ্কট একটা নিম্নগামী প্রক্রিয়া যা আমাদেরকে ক্রমশ দেউলিয়াপনার দিকে ধাবিত করবে।

‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ মূলত একটি ভাবাদর্শ বা আইডিওলজি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটা দেশের আপারময় মানুষের অর্থ ও সুখ নিশ্চিত করতে পারেনা। অনেক উদাহরণ আছে যেখানে একটা দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌছানোর পরেও সাধারণ সুখ শান্তি বৃদ্ধি হয়নি। যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো আবাসনসহ নির্মাণ খাতে চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ করেছে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়ে তাদের কর্মতৎপরতা বাড়িয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে সমষ্টিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মান ভালর দিকে যায়নি। এর কারণ মাত্রা অতিরিক্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লোভে ব্যাংকগুলো বর্ধিত অর্থের চাহিদা মিটিয়েছে কিন্তু অর্থ ফেরত পায়নি। ফলে অর্থসংকট দেখা দিয়েছে। অন্য দিকে চায়নার প্রবৃদ্ধি ১০%, ইন্ডিয়ার প্রবৃদ্ধি ৮% । বেড়েছে জীনযাত্রার ব্যয় যার সাথে পাল্লা দিয়ে এগোতে পারেনি দেশ দুটির দারিদ্র্যপীড়িত ও নিম্নআয়ের বিশাল জনগোষ্ঠী। এর ফলে ধনী-গরীব বৈষম্য অনেক বেড়েছে।

আফগানিস্তানের ব্যপারটাও চমকপ্রদ। ২০০২ থেকে ২০১২ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নিট রফতানি বেশ ভালো ছিল। জিডিপি প্রবৃদ্ধি তো ছিল ১০% এর উপরে। কিন্তু বাস্তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওষুধ দিয়ে সামাল দিতে পারছে না বোমার আঘাতে আহত মানুষদের।আফগান সরকার প্রাকৃতিক সম্পদ রফতানি করছে আর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনছে। কিন্তু জীবনযাত্রার মান যেমন ছিল তেমনই আছে। মান বেড়েছে শুধু সামরিক বাহিনীর। পাকিস্তানের কথাও উল্লেখ করা যায়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছে নিয়মিত রফতানি আর আফিম, হিরোইন, ইয়াবার রফতানির সাথে সাথে। কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো বোমার আঘাতে, জঙ্গির আঘাতে, এবং দারিদ্র্যর আঘাতে জর্জরিত। মান বাড়ছে শুধু ক্যান্টনমেন্ট এবং এর আশেপাছে গড়ে উঠা শহরের।

ব্যক্তি জীবনে যেমন মানুষ যখন পাওয়ার নেশায় মেতে উঠে সেই সময় সে কম সুখী থাকে কারণ সে তখন অতিরিক্ত পরিশ্রম করে, সঞ্চয়ের নেশায় মেতে উঠে এবং সুখ ধরতে গিয়ে নিজেই সুখকে দূরে সরিয়ে দেয় তেমনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মোহে উন্নয়নশীল দেশগুলো শিল্প সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ, সাস্ট্যানেবল উন্নয়ন ও ধন-সম্পদের সুষমবণ্টন কে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। শিল্প সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ, সাস্ট্যানেবল উন্নয়ন ও সুষমবণ্টন ছাড়া প্রকৃত সুখ আসে না, আসবে না।

তাই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সকল শ্রম ও মনযোগ না দিয়ে তা ধন-সম্পদের পুনর্বণ্টন, ন্যায ব্যবসা বাণিজ্য ও প্রাকৃতিক মূলধন পুন: প্রতিষ্ঠায় দেয়া প্রয়োজন।