ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ ভাষা নির্বাচন ক্ষেত্রে তার প্রজন্মের অন্যান্য নেতাদের থেকে ভিন্ন ছিলেন। দেশটির মাতৃভাষা ছিল ম্যান্ডারিন, মালয় এবং তামিল। সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী অনুভুতি লালন না করে, সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভাষা এবং সংস্কৃতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে একটি সর্বজনীন দেশ গড়ে তুলতে তিনি ও তার সহকর্মীরা একটি সর্বজনীন ভাষা বেছে নেন যা ছিল ইংরাজী।

একেবারে শুরুর দিনগুলো থেকেই লি কুয়ান ইউ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন দেশটির একমাত্র সম্পদ হল জনগন। জনগনকে শিক্ষার আলোতে আলোকিত করার নীতি মেনে চলেছেন শেষদিন পর্যন্ত। লি কুয়ান ইউ ব্রিটিশ কলনিয়াল থেকে উত্তরাধিকারি সূত্রে প্রাপ্ত শক্ত ভিত্তি পুরাদমে কাজে লাগিয়েছেন। ১৯৬৫ সালে সিঙ্গাপুর যখন মালয় ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তিনি মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে ব্রিটিশদের ও-লেভেল এবং এ-লেভেল মডেল অনুসরন করার নির্দেশ দেন তার শিক্ষা অধিদপ্তরকে। প্রাধান্য দেয়া হয়েছিলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে।

সিঙ্গাপুরের প্রাইমারী এবং সেকেন্ডারী শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের সেরা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ৭৫ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দুইটি সিঙ্গাপুরে অবস্থিত যদিও দেশটির জন সংখ্যা মাত্র পাঁচ মিলিয়ন। অন্যান্য অনেক দেশে ডিগ্রিধারী অনেক কিন্তু সিঙ্গাপুরে প্রত্যেকটি ডিগ্রিধারী প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত। ১৯৭৭ সালে লি কুয়ান ইউ একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন “শিক্ষিত মানুষ বলতে আমি বুঝি যে জ্ঞান অর্জন করতে চায় এবং কখনোই জ্ঞান অর্জন বন্ধ করে না।”

সিঙ্গাপুরের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন ভাবে পরিচালিত যা প্রতিভাবানদের দ্রুত শনাক্ত করে এবং সঠিক ভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। শিক্ষার্থীদের সরকারি বৃত্তিতে প্রতি একবছর পড়ালেখা করার জন্য বাধ্যতামূলক দুই বছর পাবলিক সেক্টরে কাজ করতে হয়। শীর্ষ শিক্ষকদের অতিরিক্ত শর্তাবলী ছাড়াই নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্কুল প্রশাসনে নীতি নির্ধারন করাতে সংযুক্ত করা হয়।

সিঙ্গাপুর স্বাধীনতা পায় ১৯৬৫ সালে। তখন দেশটি বেকারত্বে জর্জরিত ছিল। অর্থনৈতিক ভাবে ছিল অনুন্নত। ছিল না কোন প্রাকৃতিক সম্পদ। লি কুয়ান ইউ এর সরকার বিনিয়োগ করে মানব সম্পদে। প্রাথমিক স্কুল থেকেই পেশা ভিত্তিক শিক্ষা দান শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে দেশটি মানব সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যায়। শক্তিশালী মানব সম্পদ থাকার কারনে অর্থনৈতিক উন্নতি হতে থাকে অতি দ্রুত। ১৯৯০ সালে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির জন্য জ্ঞান-শ্রমিক তৈরি করার দিকে মনোযোগ দেয়া হয়। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্ম হয়ে উঠে সৃজনশীল চিন্তার অধিকারী।

শিক্ষকদের সঠিক মান নিশ্চিত করাকে সিঙ্গাপুরের শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। উচ্চ বিদ্যালয় ও স্নাতক ডিগ্রীতে একাডেমিক ভাবে উপরের এক তৃতীয়াংশ শিক্ষক প্রার্থীদের মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় এবং শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণের সময় সর্ম্পূন বেতন দেয়া হয় যা যে কোন ডাক্তার বা সরকারী চাকুরীজীবীর চেয়ে বেশী।

আসে পাশের দেশগুলো চালাচ্ছে দক্ষ, শিক্ষিত মানুষ। কিন্তু সিঙ্গাপুর অনেক আগেই ‘দক্ষ’ ও ‘শিক্ষিত’ নিশ্চিত করেছে। এখন সিঙ্গাপুরের সরকার এবং ব্যবসা বানিজ্য চালাচ্ছে একদল সৃজনশীল মানুষ। আর তৈরি করছে চিন্তাশীল কর্মী বাহিনী যাতে পরের শতাব্দীতেও তাদের কমপিটেটিভ এডভানটেজ বজায় থাকে।