ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

সিরীয়ায় চার বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। এ গৃহযুদ্ধে এখন পর্যন্ত ২২০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে যার অর্ধেকই বেসামরিক জনগন। সহিংসতা থেকে বাচতে চল্লিশ লাখেরও বেশি সিরীয়ান শরণার্থী তুরস্ক, লেবানন, জর্ডান ও ইরাকসহ প্রতিবেশী দেশেগুলোতে পালিয়ে গেছে। তাদের কারো কারো শেষ গন্তব্য ককেশাস, পারস্য উপসাগর, উত্তর আফ্রিকা বা ইউরোপ। শরণার্থীদের প্রধান গেটওয়ে তুরস্ক। কিন্তু তুরস্ক দীর্ঘ দিন বসবাস করার মত কোন দেশ নয়। সিরিয়ানদের এখানে কাজ করার অধিকার নেই। লেবানন ও জর্ডানের পরিস্থিতিও একই রকম। তাই সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় হাজার হাজার শরণার্থী ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রীস হয়ে ইউরোপ যাচ্ছে যদিও সেখানের পরিস্থিতিও নাজুক।

বর্তমানের ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বালকান পাড়ি দিয়ে সিরীয়রা ইউরোপে ঢুকতে শুরু করার পর। ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে কিছু সিরীয় প্রথম ইউরোপে যাওয়ার বালকান যাত্রা পথটি খুঁজে পায়।তারা জানায় তাদের পরিচিতদের, পরিচিতরা জানায় তাদের পরিচিতদের। এই পথে শরণার্থীদের সংখ্যা জ্যমেতিক হারে বেড়ে যায় যখন ফেইসবুকে গ্রুপ তৈরীর মাধ্যমে আরও মানুষকে জানানো হয়।

বেশ কিছু উপসাগরীয়আরব দেশ বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু তারা সিরিয়ার শরণার্থীদের ঢুকতে দিচ্ছে না। এইসব ধনীদেশ প্রতিবেশীদের প্রতি ন্যূনতম সহমর্মিতা না দেখিয়ে বেহায়া উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুজে রয়েছে।বরঞ্চ এগিয়ে এসেছে মধ্য আয়ের দেশগুলো। উদাহরণস্বরূপ, জর্ডান যার বার্ষিক মাথাপিছু আয় ১১,০০০ ডলার এবং তুরস্ক যার মাথা পিছু আয় ২্‌০০০ ডলার, এখন পর্যন্ত ২৬,৩০,০০০ জন শরণার্থী গ্রহণ করেছে কিন্তু কাতার যার বার্ষিক মাথাপিছু আয় ১,৪৩,০০০ ডলার,কুয়েত যার আয় ৭১০০০ ডলার, সৌদি আরব যার আয় ৫২,০০০ ডলার, এরা কোন শরণার্থী গ্রহণ করেনি। বরঞ্চ কাতার এবং সৌদি আরব আড়াল থেকে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের অর্থের যোগান দিয়ে গৃহযুদ্ধকে উস্কে দিচ্ছে। যে মুসলিম উম্মাহ্ বা ভাতৃত্ববোধের কথা বা ইসলামের কথা উচ্চারিত হয় আরব নেতা ও শাসকদের মুখে, সেসব তারা নিজেরা আদৌ বিশ্বাস করেন না তা আর একবার প্রমানিত হলো। আরব দেশগুলোতে মূলত ভাতৃত্ববোধও নেই, ইসলামও নেই, মানবতাও নেই।

ইউরোপের ধনীদেশগুলোও অনেকদিন কাল ক্ষেপন করেছে। এই সমস্যা এড়াতে চেয়েছে। কিন্তু শেষে তাদের ঘাড়েই এসে পরেছে এই সমস্যা। ৬,০০,০০০ জনের বেশি শরণার্থী এই বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করেছে যা ২০১৪ সালের তুলনায় দ্বিগুন। এর মধ্যে সিরিয়া ছাড়াও ইরাক ও আফগানিস্তানের মানুষ রয়েছে। শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর জন্য কোটা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এর ফলে এখানে ঠাই হবে ১ লাখ ৬০ হাজার শরণার্থীর।এই সংখ্যা বেশ বড় মনে হলেও তুরস্ক,লেবানন ও জর্ডানের তুলনায় কিছুই না।

ইউএনএইচসিআর এর হিসেব অনুযায়ী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত তুরস্কে নিবন্ধিত সিরিয়ার শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় বিশ লাখ৷সিরিয়ার আরেক প্রতিবেশী দেশ লেবাননে অবস্থান করছে এগারো লাখ৷ আর জর্ডানে আছে ছয় লাখের বেশি সিরীয় শরণার্থী৷

শরণার্থী গ্রহনে ধনী দেশগুলোর নির্লিপ্ততা ইঙ্গিত দেয় যে এই কালে মানবতার আগে আসে রাজনীতি, মনুষ্যত্ব রক্ষার আগে আসে পররাষ্ট্রনীতি।

জয় হোক রাজনীতির, জয় হোক পররাষ্ট্রনীতি। ধুকতে থাকুক মানবতা, মরতে থাকুক মনুষ্যত্ব।