ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

সেদিন আকাশ ছিল পরিষ্কার। ফাল্গুনের দুপুর,  শীতও নয়, গরমও নয়। রেসকোর্স ময়দান তৈরী হয়েছিল এক জনসভার জন্য তবে সেটা ছিল না কোন প্রথাগত জনসভা, সেদিন বক্তা মাত্র একজন – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। সভামঞ্চটি স্থাপন করা হয়েছিল বর্তমান শিশুপার্কের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে; ভাষণের নির্ধারিত সময় বেলা দুইটা; রেসকোর্স ময়দান জনসমুদ্র। জনতার ভিড় ঠেলে সভামঞ্চে আসতে বঙ্গবন্ধুর দেরী হয়; সফেদ পাজামা, পাঞ্জাবি আর হাতকাটা কালো কোট পরে বেলা ৩টা ২০ মিনিটে মঞ্চে দাঁড়ীয়ে তিনি উচ্চারন করেন ‘ভাইয়েরা আমার…’।

এর আগে ৫ মার্চ লন্ডনের গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস, দি অবজারভার এবং ৬ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকা আভাস দেয় ৭ মার্চের জনসভায় স্বাধীনতা ঘোষণা আসতে পারে; ৬ মার্চ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হয় – ‘শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল পূর্ব পাকিস্তানের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন।’

ধানমণ্ডি  ৩২ নম্বর থেকে বঙ্গবন্ধু যখন রেসকোর্স ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন তখন ভর দুপুর। মঞ্চ থেকে ততক্ষণে স্লোগান উঠছে ‘আমার দেশ তোমার দেশ-বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ‘পরিষদ না রাজপথ-রাজপথ রাজপথ’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো’,  ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। গাড়ী চালাচ্ছিলেন ব্যক্তিগত সহযোগী গোলাম মোরশেদ; বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন সাত মসজিদ দিয়ে যেতে, গাড়ীটি  সাত মসজিদ রোড দিয়ে জিগাতলা হয়ে রেসকোর্সের দিকে এগিয়ে এগিয়ে যায়। গাড়ী যখন জিগাতলার কাছে তখন গোলাম মোরশেদ জিজ্ঞেস করেন – ‘আজ কী বলবেন বঙ্গবন্ধু?’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন – ‘আল্লাহ আমাকে দিয়ে যা বলাবেন, তাই বলব।’

রওনা হবার আগে আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধুর হাতে ভাষণের খসড়া তুলে দিয়েছিলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্টেজে উঠেন হাতে কোন কাগজ ছাড়া; ভাষণ দেন মন থেকে শব্দমালা তুলে; বলেন – ‘আমরা তাদেরকে ভাতে মারবো, পানিতে মারব।’ পরের নয় মাস তাই করা হয়েছে;  পাকিস্তানের সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীকে বাংলার অনিয়মিত বাহিনী ভাতে মেরেছে, পানিতে মেরেছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন – ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না।’ কেউ পারিনি দাবায় রাখতে। স্বাধীনতা, মুক্তি দুইটিই অর্জন করেছে এ দেশের মানুষ। চূড়ান্ত নির্দেশ এসেছে ভাষণের শেষ অংশে – ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার স্বাধীনতা চাননি, বাঙালির মুক্তিও চেয়েছেন আর ভাষণ শেষ করেছেন এই বলে – ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

জয় বাংলা।
N8L3mc5EZrDi

তথ্য সুত্রঃ