ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

করমজলে কংকালটি ছিলো বর্তমানে উধাও !

চামড়া তো বটেই সেই সাথে বাঘের নখ থেকে মুখের গোঁফ সবই অনেক দামি। আন্তর্জাতিক চোরাই বাজারে চীনসহ বিভিন্ন দেশে বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লাখ লাখ টাকায় কেনাবেচা হয়। ওই বাজারে আমাদের দেশ থেকেও পাচার হচ্ছে বাঘের হাড়-চামড়া।

‘কলাগাছিয়া বন অফিসের মাটির নিচ থেকে বাঘের কংকাল লাপাত্তা’ এরকম একটি খবরের সূত্র ধরে হাজির হওয়া সাতক্ষিরার কলাগাছিয়া’য়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বললেন, হাতি বাঁচলে লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা, এই গল্প শুনেছি এখন শুনছি মৃত বাঘ কোটি টাকা !

সন্ধান মিলেছে গত দশ বছরে নানাভাবে মারা যাওয়া ২৬টি বাঘের কবরে আর ওদের হাড়গোড় নাই। তা গেল কোথায়? সুন্দরবন ও প্রাণীবিশেষজ্ঞরা জানান, স্তন্যপায়ী প্রাণীর কবর ও কবরে থাকা হাড়-গোড় নিয়ে কোনধরনের গবেষনা আজও হয়নি, অবশ্য মাটির নীচে স্তন্যপায়ী প্রাণির হাড় হাজার বছর পর্যন্ত প্রায় অক্ষত অবস্থায় থাকে বলে জানালেন প্রাণিবিদ ডক্টর গাজী আসমত, ডক্টর মোস্তফা ফিরোজ ও প্রতœতত্ত্ববিদ ডক্টর সীমা হক।

নজরদারি নাই বুড়িগোয়লিনীতে
সাতক্ষিরা বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জ অফিসে দায়িত্বরত সহকারি বন সংরক্ষক তৌফিক সাহবের উল্টোসুর। বললেন, মাটির নীচে হাড় থাকবে না কেন ? মাটির নিচেই আছে। কখনও দেখেছেন তা আছে কিনা? সাফ কথা তৌফিকের, ওসব দেখার কি আছে! এ জীবনে এরকম কথা শুনি নাই। শুধুমাত্র বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জের কলাগাছি বন অফিসে চারটি মৃতবাঘ মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো এখনও মাটির নীচে আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় মাটি খুঁড়ে তা দেখা। কিন্তু তার জন্য উচ্চপর্যায়ের অনুমতি দরকার।

গত দশ বছরে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগে ১৪টি বাঘ মারা পড়ে। তথ্যনুসারে চলতি বছরের একটি বাঘসহ চারটি বাঘের কবর রয়েছে কলাগাছিয়া বন অফিস চত্বরে। তবে কোথায় মৃত বাঘের কবর? বলতে পারলেন না কলাগাছি বন অফিসে দায়িত্বরত আবুল কামাল। তিনি বললেন সিডর বা আইলাতে কবর-টবর কোথায় ভেসে গেছে তা কে জানে? তার সাথে একই সুরে কথা বললেন, কলাগাছির সকল বনকর্মী। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবী, সিডর, আইলা জলোচ্ছাসসহ সকল দূর্যোগ সুন্দরবনের মাটি ওলোট-পালোট করলেও কংকালগুলো ভেসে না গিয়ে মাটির আরো গভীরেই চলে যাবে। তাহলে তো বাঘ-হাড় মাটির নীচেই থাকার কথা, এবার নিরুত্তর বনকর্মীরা।

তবে গাবুরা ইউপি সদস্য দাবী করলেন, সাত-আট ফুট মাটির নীচ থেকে বাঘের কংকাল তুলে নেয়া হয়েছে। যিনি দেখেছেন চারটি বাঘ মাটি চাপা দেয়ার কাজ। তার দাবী মানতে নারাজ বনরক্ষক আবুল কামাল । তাহলে কার তথ্য সঠিক? মাটি সরিয়ে বাঘের কঙ্কাল দেখার কথা বললে কামাল হোসেন বললেন, এসব কি বলেন!

বাঘ-হাড় যায় কোথায় ?
‘টিএমসি’ ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন অব চীন। প্রায় ২ হাজার ৩০০ শ বছর থেকে ঐতিহ্যবাহী চীনা টোটকা চিকিৎসায় বাঘের অঙ্গ-প্রতঙ্গের ব্যবহার হয়ে আসছে। মানব শরীরের চিকিৎসায় ওষুধ বানাতে ব্যবহার হয় বাঘ। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান এসবের আমল দেয় না।

চীনের মতো একই বিশ্বাস রয়েছে হংকং, জাপান, কোরিয়া এবং তাইওয়ানে। ইনভায়রনমেন্ট ইনভেষ্টিগেশন এজেন্সি বা সংক্ষেপে ইআইএ’র তথ্য মতে বিশ্বে বাঘের বিভিন্ন অংঙ্গ-প্রতঙ্গের জন্য প্রতিদিন একটি করে বাঘ হত্যা করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এক কেজি বাঘের হাড়ের গুঁড়ো প্রায় এক হাজার ৭০০ ডলার বা লাখ টাকার বেশি। মাটির নীচে থাকা একটি বাঘের কংকালের ওজন বয়স অনুসারে প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ কেজি পর্যন্ত হয়। এই হিসেবে একটি বাঘের কংকালের দাম প্রায় ৩০ লাখ টাকা। চলতি বছরে ১৭ মার্চ শরণখোলার বাংলাবাজারের জামাল ফকির কাছ থেকে ৩২ কেজি বাঘের হাড়, বাঘের চামড়া ও মাথা আটক হয়। শুধু হাড় নয়, বাঘ হত্যার পর তার সকল অঙ্গ-প্রতঙ্গ বিশেষকরে চোখ, গোফ,
পায়ের নখ, দাত এবং যৌনাঙ্গ ও রক্ত পর্যন্ত ব্যবহার হয় টিএমসি’তে। একারণে বাঘের মরদেহ মাটি চাপা দেয়া হলেও মাটির নীচ থেকে তা দ্রুত উধাও হয়ে যায়।

স্পর্শকাতর এলাকার নাম শরনখোলা
ইতিমধ্যে সুন্দরবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে পরিচিত শরনখোলা। বাঘ হত্যা করে এই এলাকা দিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলে যায় বাঘের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ তারপর আর্ন্তজাতিক বাজারে। স্থানীয়রা এসব জানলেও রেঞ্জ অফিস অন্ধকারে। শুধু তাই নয়, শরণখোলা রেঞ্জে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত রেঞ্জার শহিদুল হক জানেন না অফিস চত্ত্বরে হত্যা হওয়া বাঘের কবরটি কোন স্থানে। শুধু তাই নয়, করমজলে একটি বাঘের হাড় দর্শকদের জন্য সাজিয়ে রাখা হলেও চারটি বাঘের কংকালের কোন সন্ধান নেই। কেন নেই? উত্তর মেলেনি।

উত্তর নেই বন্যপ্রাণি সার্কেল প্রধানের
‘বাঘ-হাড়ের কি অনেক দাম?’ বললেন বন্যপ্রানী সার্কেলের প্রধান তপন কুমার দে। যত্রতত্র বাঘের কবর দেয়া হলেও পরে আর কোন খবরদারি থাকে না বলে তিনি জানান। যদিও তিনি মনে করেন, বিগত বছর গুলোতে মারা যাওয়া বাঘের কংকালগুলো তুলে এনে সংরক্ষন করা দরকার। কিন্তু সন্দেহ থেকেই যায় কংকালগুলো এখনও কি মাটির নিচে খনন কাজের জন্য অপেক্ষা করছে কিনা? সেটিই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন মূল্যবান বাঘের কংকাল মাটি থেকে তুলে এনে জনসমক্ষে তুলে ধরা হোক। সেই সাথে এই কংকালগুলো কোথায় রাখা হবে অথবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দান করা হবে কিনা সে বিষয়ে সুনিদৃষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।

এই লেখাটির বেশিরভাগ প্রকাশ হয়েছিলো সমকাল পত্রিকায় ।