ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগে তৈরি হয় গণজাগরণ মঞ্চের । ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগের মুক্তচিন্তার লেখক ও ব্লগাররাসহ নতুন প্রজন্মের তরুণরা যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ রায়ের দাবিতে আন্দোলনের গণজোয়ার গড়ে তুলেছিল । সে সময় গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে প্রতিহত করতে জামাত ই ইসলাম তাদের সহযোগি হিসবে জামাত ই ইসলামের ই মদদ পূষ্ট তথা কথিত ইসলামিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম শাহবাগে আন্দোলনকারীদের ইসলামের দুশমন বলে আখ্যায়িত করে এবং যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবীতে শাহবাগে আন্দোলনরত আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে জামাত-শিবিরের সহযোগিতায় আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে । এবং তথাকথিত হেফাজতে ইসলাম সরকারের উপর চাপসৃষ্টিকরতে শুরু করে আর সরকার ও তাদের ক্ষমতা রক্ষার জন্য তথা কথিত ইসলামিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের চাপের কাছে মাথা নত করতে শুরু করে । তখন সরকারের কাছে হেফাজতে ইসলাম ৮৪ জন ব্লগারের একটি তালিকা জমা দিয়ে এদের সকললে নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি সহ বাংলাদেশে ব্লাশফেমি আইন প্রনয়োনের দাবী তোলে । তাদের দাবির কাছে মাথানত করে সরকার বেশ কয়েক জন ব্লগারকে গ্রেফতার পর্যন্ত করে ।

হেফাজতেইসলামের সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাছে জমা দেওয়া ৮৪ জন ব্লগারের তালিকা আনসার উল্লাহ বাংলা টিম নামে একটি মৌলবাদী ইসলামি জঙ্গি সংগঠন ‘হিটলিস্ট’ নামে ৮৪ জন ব্লগারসহ আন্দোলনকারীদের তালিকা প্রকাশ করেছিল। সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে উক্ত হিটলিস্ট নিয়ে সংবাদ ছাপা হয়। তালিকায় নাম প্রকাশের বিষয়ে বলা হয়েছিল ‘এরা সবাই ইসলামের দুশমন।’ ব্লগার এবং আন্দোলনকারীদের নাস্তিক উপাধি দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল, এরা ইসলাম ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা)-এর নামে কটূক্তি করে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। তালিকা অনুযায়ী একে একে ব্লগারদের হত্যা করা হবে বলে সে সময় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হুমকি প্রদান করা হয়। হুমকি অনুযায়ী আন্দোলনকারীরা সে সময় নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে খুব বেশি সর্তক না থাকায় ও সরকারের পক্ষ থেকেও ব্লগারদের নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে আততায়ীদের হাতে খুন হতে হয়েছে বেশ কয়েক জন ব্লগারকে।

৮৪ জনের তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকার, আসিফ মহিউদ্দিন, অভিজিৎ রায়, রাজিব হায়দার, শোভন, মারুফ রসুল, আরিফ জেবতিক, ইব্রাহীম খলিল, আরিফুর রহমান, অনন্য আজাদ, মাহামুদুল হক মুন্সি বাধনের নাম শীর্ষে ছিল। শীর্ষ ১০ তালিকার মধ্যে ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজিব হায়দার শোভন এবং গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়। ৮৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০১৩ সালে সর্ব প্রথম ১৪ ফেব্রুয়ারি জাফর মুন্সি, ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিকুল ইসলাম শান্ত, ২৮ ফেব্রুয়ারি মামুন হোসেন এবং ২ মার্চ জগৎ জ্যোতী তালুকদারক ও আজ সকালে অনন্ত বিজয় দাশ হত্যা করা হয়। এছাড়া ২০১৩সালের বিভিন্ন সময়ে আরিফ হোসেন দীপ এবং জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু নামে আরো দু জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়। এতে হিট লিষ্টের ৮৪ জনের মধ্যে ৯ জন ব্লগারকে হত্যা করতে সক্ষম হয় মৌলবাদী সন্ত্রসীরা ।

পুলিশ, চিকিৎসক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য থেকে জানা যায় হত্যাকারীরা ব্লগারদের একই কায়দায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে। এছাড়া প্রায় প্রত্যেককে অন্ধকারে পেছন থেকে আক্রমণ করে হত্যার কাজ সম্পন্ন করা হয়। সর্বশেষ আজ সিলেটে মুক্তমনা এবং বিজ্ঞানসম্মত লেখক অনন্ত বিজয় দাশ একই পদ্ধতিতে হত্যা করে হত্যাকারীরা। একেক জন ব্লগার হত্যার পর পর কিছুদিন সরকার, মিডিয়া সহ বিভিন্ন সংগঠন দুয়েক দিন চিৎকার চেচামেচি করলে ও অজানা কারনে খুনরা রয়ে যাচ্ছে ধরা ছোয়ার বাহিরে । গত ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৫ আমেরিকাপ্রবাসী ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ​ রায়কে হত্যার পর সারা দেশের মিডিয়া সরগরম হয় এবং এ হত্যার তদন্তের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে খোদ এফবিআই এসে তদন্ত করে গেলেও সরকার আজ পর্যন্ত খুনিদের গ্রেফতার করতে ব্যর্থ । ঠিক এই রক্তের দাগ না শুকাতেই ৩০ মার্চ ২০১৫ তেজগাঁওয়ের বেগুন বাড়িতে মৌলবাদী সন্ত্রসীদের চাপাতির কোপে খুন ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু যদিও সেদিন ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যাকারীদের মধ্য থেকে দু’জন খুনি কে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন সেখানে উপস্হিত থাকা কিছু হিজরা । তাই ওয়াশিকুর হত্যাকান্ডের “ক্লু”আমাদের সবার কাছে পরিস্কার । এই দু ‘জন হত্যাকারি জানিয়েছিল, বড় হুজুরের নির্দেশে তারা হত্যা করেছে। সেই বড় হুজুর বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য জানাল না বা হুজুরকে আজো পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করতে পারলো না ।

আজ পর্যন্ত প্রত্যেক ব্লগার হত্যার পর পুলিশ কোন ক্লু খুঁজে বের করতে না পারলেও ওয়াশিকুর হত্যাকাণ্ডের “ক্লু” পাওয়া সত্যেও কিন্তু আজো আমাদের পুলিশ তথা সরকার পালিয়ে যাওয়া বাকী খুনিদের গ্রেফতার করতে বা জঙ্গিদের মদদদাতা বড় হুজুর কে গ্রফতার করতে সম্পুর্ণ ব্যর্থ । আর সরকারে সেই ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে ই আজ সিলেটে খুন হতে হলো ব্লগার ও লেখক অনন্ত বিজয় দাশকে । জানিনা কার স্বার্থে কোন স্বার্থে আমাদের দেশের সরকার ও তার প্রশাসন মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যার ব্যাপারে নীরব ভুমিকা পালন করছে ? একাত্তরের পরাজিত শক্তি আবারো মাথা চারাদিয়ে উঠেছে বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার জন্য কিন্তু আমাদের তথাকথিত স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির সরকার ও তাদের প্রশাসন নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমিয়ে দায় মুক্তির চেষ্টা করছে ! এ ভাবে কি এ সব হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে সরকার ও প্রশাসন দায়মুক্তি পাবে? আর কতজন ব্লগার উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে খুন হলে সরকার ও তার প্রশাসনের ঘুম ভাঙ্গবে?