ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানব পাচারে জড়িতদের পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কথাটা শুনে নিজের কাছে কেমন খটকা খটকা লাগছে এবং খুব অস্বস্তি বোধ করছি! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বলেছেন যারা সাগরে ভেসে দেশ ছাড়ছে, তারা নিজেরাও জানে না যে তারা কোথায় যাচ্ছে। তাদের মৃতদেহ বনে-জঙ্গলে পাওয়া যাচ্ছে- এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। হ্যাঁ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তারা নিজেরাও জানে না যে তারা কোথায় যাচ্ছে বা তাদের ভাগ্যেই বা কী আছে!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সাগরে ভাসা মানুষগুলোর চেহারার দিকে তাকালে অন্তত একবারের জন্য হলেও আন্দাজ করা যায় যে, এ মানুষগুলো কারা। তারা কেউই সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারের কেউ নন যে দেশে বড় কোন ধরনের অপকর্ম করে আইনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য তারা নৌকায় চরে সাগর পাড়ি দিয়ে অন্য কোন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন! আর এটা তো বাংলাদেশ এখানে কোন প্রভাবশালী যত বড়ই অপকর্মই করুন না কেন আইন তাকে কোন সাজা দিতে পারে না। কারণ অর্থ-সম্পত্তির কাছে বিচারের বাণী শুধুই নীরবে নিভৃতে কাঁদে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি অবৈধভাবে বিদেশগামীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার যে নির্দেশ দিয়েছেন তার আগে কি একটু ভেবেছেন? একটু কি চিন্তা করেছেন? না! আমার ধারনা মোটেও না। হয়তো আবেগের বশে না হয় রাগের বশে আপনি এমন কথা বলেছেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের নির্বাচনি ইস্তেহারে আপনি কী বলেছিলেন? আমার মনে হয় অবশ্যই তা ভুলে যাননি প্রত্যেক ঘরে ঘরে চাকুরি হবে দেশে কোন যুবকই বেকার থাকবে না। বা খুব সুন্দর কথা আপনার। এ কথা শুনে যুবসমাজ আনন্দে আত্মহারা হয়ে আপনার দলকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসালো। আপনি দ্বিতীয়বারের মত দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন আর আপনার আশির্বাদে আব্দুর বরমান বদি হলেন কক্সবাজারের সাংসদ, যার উছিলায় আজ হাজারো মানুষ সাগরের ভাসার সুযোগ পেয়েছে। সাগরের মুগ্ধতায় যারা মুগ্ধ হয়ে অকালেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে পেরেছে।

যদিও আমার এ কথা কখনোই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কানে পৌঁছবেন না তবে তার অন্তরে ঠিকই পৌঁছবে। তাই বলছি আজ ’রেমিটেন্স’ বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারের একটি দাম্ভিক শব্দ। ’রেমিটেন্স’ শব্দের অর্থ সবারই জানা যে আমাদের দেশের নিরীহ মানুষগুলো তাদের জীবন ও যৌবন বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীর একেক প্রান্তে মাথার ঘাম মাটিতে ঝড়িয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে যে অর্থ নিজ দেশে প্রেরণ করছে তাই হলো আমাদের সরকারে সেই অহংকার, দম্ভ ’রেমিটেন্স’। কিন্তু আজ যারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছেন তাদের কয়জন বিদেশে যাওয়ার সময় সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের সুবিধা পেয়েছেন তাই একটা বড় প্রশ্ন। সবাই কোন না কোন ভাবে নিজের সামর্থের বলে জীবন বাজি রেখেই বিদেশে গিয়েছেন। কেউ বাপের জমি, কেউ স্ত্রী মা বোনের গহনা কেউ বা মহাজনের কাছ থেকে চরা সুদে টাকা নিয়ে সে টাকা দালালকে দিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন পরিবার ও নিজের ভাগ্য বদলের জন্য।

আপনার সরকারের সময় আপনার পররাষ্ট্রনীতির চরম ব্যর্থতার কারনে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড়বাজার মধ্যপ্রাচ্য আজ পুরোপুরি আমাদের হাতছাড়া । যা পুনঃউদ্ধার করা হয়তো আর কখনোই সম্ভব হবে না । হয়তো বর্তমান সময়ে সৌদি আরব সরকার কোন উপায় না পেয়ে বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তাতে যে ফলাফল কী হবে তা মোটামুটি সবারই জানা । আরবের ঐ সকল দামড়া গরুদের অত্যাচার আমাদের মেয়েরা কতটুকু সহ্য করতে পারবে তা এখন শুধু দেখার ব্যাপার।

সরকারি ভাবে অতি সস্তায় মালয়েশিয়া যাবার স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল আমাদের বেকার যুব সমাজ। কিন্তু সেই স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই রয়ে গেল । তবে ধন্যবাদ জানাতে অবশ্যই কৃপনতা করবো না। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাননীয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জনাব ইফতেখার আহম্মেদ চৌধুরিকে, যার পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থকতার কারনে দেশের বেশ কিছু যুবক EPS এর আওতায় মাত্র ছাপান্ন হাজার টাকা ব্যয় করে খুবই স্বচ্ছতার সাথে দক্ষিন কোরিয়াতে যেতে সমর্থ হয়েছে। যে প্রক্রিয়া এখনও সীমিত পরিসরে বিদ্যমান।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি খুব গর্ব করেই বলছেন, আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে, পরিসংখ্যান বলছে আমাদের বাৎসরিক আয় ১৩১৪ ডলার । খুব খুশির কথা, এত টাকা যাদের আয় তারা কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে ছোট্ট নৌকায় ভেসে বিদেশে যাবে? অবশ্যই ঐ সমস্ত মানুষগুলো মানসিক ভাবে হয়তো অসুস্থ! বাস্তবে কি তাই? না আমাদের তথাকথিত রাজনীতিজীবি আমলা ব্যবসায়িরা চুরি-চামচামি করে শত শত কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়ে প্রবাসে আয়েসী জীবন যাপন করছে, অথচ নিজের ও পরিবারে ভাগ্যের চাকা সামান্য ঘুরানোর জন্য আপনার দলেরই সাংসদ আব্দুর বরমান বদিদের খপ্পরে পরে জীবন বাজি রেখে সাগর পথে ছুটছে মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের অজানা গন্তব্যে ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার আজকের বক্তব্যে মনে হয়েছে আপনি আতর মেখে শরীরের দুর্গন্ধ সরিয়ে পুত পবিত্র হতে চাচ্ছেন ! কার্পেটের নিচে ময়লা লুকিয়ে পরিছন্ন থাকার চেষ্টা করছেন। যদিও এগুলি আমাদের পুরনো সংস্কৃতি । তারপরও আপনাকে বলতে চাই নোংড়া শরীরে আতর মেখে যেমন পুত পবিত্র হওয়া যায় না, তেমনই কার্পেটের নিচে ময়লা লুকিয়েও পরিছন্ন থাকা যায় না।