ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

বাংলাদেশ দিন দিন কেন জানি এক আতংক রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছে ।সমগ্র জাতি আজ স্তব্ধ ও নিস্তব্ধ সবার ভিতর ই কাজ করছে এক অজানা আতংক । মনে হচ্ছে ঘাতকের চাপাতি কিংবা বুলেট যেন সমগ্র জাতির পিছেনে তাড়া করে ফিরছে । সাম্প্রতি দেশের আরাজক পরিস্হিত তাই প্রমান করে । বছরের শুরু থেকে ই প্রকাশ্য দিবা লোকে একে একে বেশ কয়েক জন মুক্তমনা ব্লগার হত্যা ও তার সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা । যা সমগ্র জাতিকে আজ বিশেষ ভাবে ভাবিয়ে তুলেছে । জানিনা সরকার বা প্রশাসন এ নিয়ে কতটুকু চিন্তিত ? একের পর এক ব্লগার হত্যা এবং এর দ্বায় বিশেষ বিশেষ ইসলামপন্থী ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্টির স্বীকার করে নেয়া এর কোনটাই বর্তমান সরকার বা প্রশাসনের চিন্তার বিষয় হতে পারে নি বরং সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন কর্তা ব্যক্তিদের বিভিন্ন বক্তব্য আজ জাতিকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে । সরকার বা প্রশাসন এ বিষয় গুলিকে হাসির ছলে উড়িয়ে দিচ্ছে এবং তারা এ বিষয় গুলিকে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে ।বাংলাদেশে ধর্মীয় ভাবে ইসলামপন্থী তথা মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার এদেশে ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্টির আশ্রয় কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে যা বর্তমানে ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্টির নিরাপদ আবাসভূমিতে পরিনত হয়েছে । অতিসম্প্রতি নিরাপত্তার ঝুঁকির প্রশ্ন তুলে অষ্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর বাতিল করার পর থেকে বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্টির অবস্হান নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন ভাবে আলোচিত হতে যাচ্ছে । অষ্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের কাছে নাকি সুনির্দিষ্ট প্রমান আছে যে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ভ্রমন তাদের জন্য মোটে ও নিরাপদ নয় । আমরা বাংলাদেশর ক্রিকেট প্রেমীরা বিভিন্ন ভাবে অষ্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডেকে তৃষ্কার করেছে কারন আমরা আশাহত হয়েছি । কিন্তু বস্তবতা অষ্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের দাবীকে পুরোপুরি সমর্থন করছে যার প্রমান গত এক সপ্তাহে দুই বিদেশী নাগরিক হত্যা এবং পাবনার ঈশ্বরদীতে খ্রিষ্টানদের গির্জার ধর্মীয় যাজাক হত্যাচেষ্টা ও ঢাকার বাড্ডায় একজন ইসলাম ধর্মের পীরকে হত্যার মাধ্যমে । গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে গুলশানের কুটনৈতিক পাড়ায় দুর্বৃত্তের গুলিতে খুন হন ইতালীয় নাগরিক ও এনজিও কর্মী তাবেলা সিজার এর ই মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ৩ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে রংপুরে একই কায়দায় খুন হতে হয় জাপানের নাগরিক কুনিও হোশিকে । এই দুই বিদেশি নাগরিক হত্যাকান্ডের পর পর ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে খুনের দ্বায় ভার স্বীকার করে নেয় বর্তমানে সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও ভংকর আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। যদিও সরকার ও প্রশাসন বলে আসছে যে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) এর কোন অস্তিত্ব নেই । এধরনের মন্তব্য এখন যারা করছেন কিছু দিন আগে ও তাদের বক্তব্য ছিল পুরোপুরি উল্টো ।

সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা যেভাবে এ রকম আশঙ্কাকে নাকচ করে দিচ্ছেন, সেটা দেশ ও মানুষের জন্য আজ বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে । তাই বাংলাদেশে ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী উত্থান সম্পর্কে কিছু জানা দরকার । বাংলাদেশে যে সকল ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী উত্থান হয়েছে তার পুরোটাই বিদেশ নির্ভর কারন প্রত্যেক জঙ্গি গোষ্ঠী ই আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর মদদ পুষ্ট । বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের সূচনা নব্বইয়ের দশকে আর এই সূচনা লগ্ন থেকেই বিদেশি সংশ্লিষ্টতার প্রমান রয়েছে । বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের মূল উৎস ই ছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর (হুজি) । আফগান মুজাহিদদের বাংলাদেশি স্বেচ্ছাসেবীদের একাংশ ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে হুজি আর যার মূলে ছিল পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন হুজি । পাকিস্তানে হুজির কার্যক্রম শুরু হয় আশির দশক থেকে কিন্তু এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে এবং পরবর্তী কয়েক বছরে হুজির দ্রুত প্রসার ঘটে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশে । আর এর ই অংশ হিসেবেই বাংলাদেশে হুজির যাত্রা শুরু। এর পর ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠত হয় জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ।

১৯৯৬ সালের ১৯ জানুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়ায় হুজির ৪১ জন কর্মী সশস্ত্র অবস্থায় আটকের পর ই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠীর শক্ত অবস্হানের প্রকাশ পায় । এর পর থেকে আরো বাংলাদেশে শক্ত অবস্হানে আসতে শুরু করে ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী ও তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগিরা । বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠীর শক্ত অবস্হানের বিষয়টি আমরা আরও জানতে পারি ২০০৮ ও ২০০৯ সালে। ২০০৮সালে আবদুর রউফ দাউদ মার্চেন্ট ও জাহেদ শেখ নামে দুজন ভারতীয় জঙ্গি আটক হয় বাংলাদেশে । ২০০৯ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ভারতীয় কথিত আরেফ রেজা কমান্ডো ফোর্সের মুফতি ওবায়েদুল্লাহ ও হাবিবুল্লাহসহ আটক হন মোট ছয়জন, তাঁদের মধ্যে একাধিক জঙ্গি ই স্বীকার করেন যে তাঁরা দীর্ঘ দিন যাবৎ বাংলাদেশে বাস করছেন । ওবায়েদুল্লাহ ১৯৯৫ সালে ও হাবিবুল্লাহ ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশে আছেন বলে দাবি করেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পর্কের বিষয়টি আরো পরিস্কার হয়। এবং একে একে আনসার উল্লাহ বাংলাটিম , হিযবুত তাহরীর, শাহাদাত-ই-আল হিকমা, জামায়াতে মুজাহেদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি) ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), জইশ-ই-মোহাম্মদ, আল্লার দল, হিযবুল মুজাহিদিন, কালেমা-ই-জামাত, আনছারুল্লাহ বাংলা টিম ও হিযবুল মাহাদীর সহ নানা নামে নানা সময় জন্ম নেয় ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী । আর একে একে সাড়া দেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সভা সমাবেশে বোমা হামলায় সাধারন মানুষ হ্ত্যার মাধ্যমে এসকল দেশী ও আন্তর্জাতিক ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠীর শক্ত অবস্হানের জানান পায় জাতি ও সমগ্র বিশ্ব । ২০০৪ সালে সিলেটে তৎকালিক বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরির উপর হামলা চালিয়েছিল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী এর পর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সমগ্র বাংলাদেশে একযোগে ভয়াবহ সিরিয়াল বোমা হামলা চালায় জেএমবি । এর পর থেকে মৌখিক ভাবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্হান নিতে শুনা যায় সরকার ও প্রশাসনকে । কিন্তু বর্তমান সময়ে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পর আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) স্বীকার উক্তিকে আমাদের সরকার ও প্রশাসন যে ভাবে উফাস করছে তাতে আমাদের কে আরো দুশ্চিন্তায় ফেলেছে ।

গত ২১ জানুয়ারি ২০১৫ ভারতীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় ” আইএস জঙ্গির খোঁজে অভিযান বাংলাদেশে ” শিরোনামে এক সংবাদ প্রকাশ হয় তাতে বলাহয়েছিল যে বাংলাদেশের গোয়েন্দা ও র‌্যাব (র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন) আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কাছ থেকে খবর পেয়েছে যে টুঙ্গির তুরাগ নদীর তীরে ধর্মীয় সম্মেলন বিশ্ব ইজতেমার সুযোগেই পাকিস্তান হয়ে অন্তত ৩৬০ জন আইএস জঙ্গি ঢুকেছে । এবং সে সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ি ও খিলক্ষেত এলাকায় অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন চার আইএস জঙ্গিকে গ্রেফতারের খবর ওপ্রকাশ করেছে পুলিশ এমন টি ই দাবী ছিল পত্রিকা টির । এ ছাড়া ও বছরের বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্হানে জঙ্গি গ্রেফতারের ঘটনা আমরা দেখছি এমন কি দেশ থেকে পালিয়ে সিরিয়ায় যেয়ে আইএস এ যোগদানের কথা ও শুনা গেছে। এমন কি গত ২/১০/২০১৫ তারিখে ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জ থেকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সমর্থক সন্দেহে মোহাম্মদ ফাহিম আল ফয়সাল ইবনে মূসা বিন জুলকারনাইন ওরফে কিং ফয়সাল নামে এক কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ । যে ভাবেই হউক আর যে নামে ই হউক বাংলাদেশে ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠীর শক্ত অবস্হান আছে এটাই বাস্তব সত্য । তার পর ও আমাদের কর্তাব্যক্তিরা বিনা দ্বিধায় বলে আসছে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কোন অস্তিত্ব নাই যা হস্যকর উক্তিতে পরিনত হচ্ছে । তাই মনে হয় বাংলাদেশ আজ আর কোন মানুষের জীবন ই নিরাপদ নয় জুজুর ভয় যেন সমগ্র জাতিকে তাড়া করে ফিরছে । বাংলাদেশ আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় মাতৃভূমি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর আড়াই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময় অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি , এটা কখনোই কোন ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্টির আস্তানাতে পরিনতে হয়ে একটা মৃত্যুর কুপে পরিনত হউক এটা এদেশের কোন বিবেক বান মানুষ কোন ভাবেই মেনে নিতে পারে না বা পারব না । জঙ্গিবাদের রাহুর গ্রাস থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতণার অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলি । তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্হান , আফগানস্হান কিংবা সিরিয়ার মত করুণ পরিনতি আমাদের ও গ্রহন করতে হতে পারে ।