ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

হোসাইনী দালান ইমামবাড়া বাংলাদেশে শিয়া সম্প্রদায়ের পবিত্র স্হান প্রায় ৪০০ বছর ধরে এখানে তাজিয়া মিছিলসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চলে আসছে শান্তিপূর্ণভাবে পবিত্র মুহাররম মাসের আশুরা উৎযাপন । শুধু হোসাইনী দালান ইমামবাড়ায়ই নয় আশুরা উপলক্ষে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও সমাবেশ সহ আয়োজন করা হয় বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানের যেখানে শিয়া সম্প্রদায়ের লোক ছাড়া ও বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের লোক শরিক হন । হঠাৎ করে ই শনিবার দিনের প্রথম প্রহরে কে বা কারা গ্রেনেড হামলা চালায় হোসাইনী দালান ইমামবাড়ায় তাজিয়া মিছিল প্রস্তুতির কালে এতে ঘটনাস্হলে সাজ্জাদ হোসেন নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয় আহত হয় প্রায় শতাধিক মানুষ এরা সকলেই পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে সমবেত হন পুরান ঢাকার হোসাইনী দালানে।

বাংলাদেশে শিয়া সম্প্রদায়ের লোক খুব বেশি নয় তারপর ও তারা প্রতি বছরই উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে পালন করে আসছে পবিত্র মুহাররম মাসের আশুরার বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান সহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান। কিন্তু বাংলাদেশে এবারই প্রথম যেখানে শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রধান উৎসবে এ ধনের নারকীয় হামলা করা হলো । তাই একটু চোখ বুলাতে হয় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দেশ পাকিস্হানের দিকে । পাকিস্হান যেখানে ধর্মীয় সংঘাতে প্রতিনিয়ত ই প্রাণ দিতে হচ্ছে নীরিহ মানুষ কে । বিশেষ করে এখানে শিয়া ও সুন্নির দ্বন্দ প্রকট প্রায় ই শিয়াদের বিভিন্ন মসজিদ সহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে বোমা কিংবা বন্দুক হামলা চালিয়ে হত্যা করা হচ্ছে নীরিহ মানুষদের । এবার সেখানে তার ব্যতিক্রম ঘটনি গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সিন্ধু প্রদেশে আশুরা উপলক্ষে শিয়াদের একটি শোভাযাত্রায় ‘আত্মঘাতী’ বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় ২২ জন ।এর আগে বেলুচিস্তানে দুই দফা বোমা হামলায় নিহত হয় ২১ জন ।

পাকিস্তানে শুধু শিয়া সুন্নি দ্বন্দই নয় সেখানে কাদিয়ানি সম্প্রদায় ও প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হচ্ছে কট্টরপন্থী সুন্নি ও বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর দ্বারা। সেখানে কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে সাংবিধানিকভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে । ১৯৪৯ সালে কাদিয়ানীদের অমুসলমান ঘোষণার দাবী করে মজলিশে আহরার ই ইসলাম কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার আহবান করে। তাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের তাত্ত্বিক গুরু মৌলানা মওদুদী। তাদের প্রত্যক্ষ উস্কানীতে পাঞ্জাবে কাদিয়ানী বিরোধী দাঙ্গা শুরু হয়ে যায় দ্রুত লাহোরেও ছড়িয়ে পড়ে ক্রমে এ দাঙ্গা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে থাকে। দীর্ঘ চার বছর ব্যাপী চলার পর ১৯৫৩ সালে দাঙ্গা এমন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যে, পাকিস্তান সরকার লাহোরে সামরিক শাসন জারী করতে বাধ্য হয়। এ দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। দাঙ্গার বিষয়ে তদন্তের জন্য সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটি গঠিত হয়। আদালত বিচারে দাঙ্গায় প্রত্যক্ষ উস্কানী প্রদানের জন্য মৌলানা মওদুদীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন যা তার প্রাণভিক্ষা আবেদনের কারনে মওকুফ করা হোয়েছিল। সৌদী বাদশাহর হস্তক্ষেপে পরবর্তী সময়ে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। পাকিস্হান কখনোই কোন হামলার পর হামলাকারীদের সনাক্ত বা চিহ্নিত করতে পারে নি বা করেনি । এর পেছনে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিই মূল কারন।

পাকিস্তানের কট্টরপন্থী সুন্নিদের মূল মদদ দানকারিই হলো সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। আর পাকিস্তানের কট্টরপন্থী সুন্নিরা কখনো শিয়া ও কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে সু-নজরে দেখে না । তাই এ সকল কট্টরপন্থী সুন্নিদের দ্বারাই সংঘটিত হচ্ছে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মীয় সংঘাতের তেমন কোন উদাহরণ নেই আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ গুলির তুলনায় অনেক ভাল । যার প্রমান সদ্য শেষ হওয়া বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গা পূজা বলতে গেলে আনন্দ ও উৎসাহর ভিতর দিয়ে ই পালিত হলো । কিন্তু বাংলাদেশে হঠাৎ এই নিরীহ শিয়া সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হামলা চালাল কারা?

আমাদের পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক মতে, জঙ্গি গোষ্ঠী নয়, স্বাধীনতা বিরোধী চক্র এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এটি একটি পরিকল্পিত নাশকতা। তাই স্বাভিক ভাবেই প্রশ্ন আসে পুলিশের মহাপরিদর্শক মহোদয় কোন তদন্তের আগেই কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে এটা কোন জঙ্গি গোষ্ঠীর কাজ নয় ? এতদিন সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা বলে আসছিলেন যে স্বাধীনতা বিরোধী ও জঙ্গি গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। কিন্তু হঠাৎ দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার দ্বায় জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস এর তথাকথিত স্বীকার করার পর থেকেই স্বাধীনতা বিরোধী ও জঙ্গি গোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ তফাৎ খুঁজে পেলেন তারা । আমরা দেখেছি বিগত দিনগুলিতে স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর জঙ্গি তৎপরতা এবং আমাদের দেশের জঙ্গিবাদের উত্থানের মূলেই স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী । বিগত বিএনপি জামাত জোট সরকারের আমলে আমাদের সংবাদ মাধ্যম জঙ্গি তৎপরতা বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশ করলেও তৎকালীন সরকার তা অস্বীকার করে এবং তা মিডিয়ার নাটক বলে চালিয়ে দিয়েছে যা পরবর্তীতে দানব রুপে সমগ্রজাতিকে চেপে ধরছে যে জঙ্গি নামক দানবের হাত থেকে জাতি কখনো মুক্তি পাবে কি না সেটাই বড় প্রশ্ন।

ইতোমধ্যে চার জন ব্লগার সহ ইসলাম ধর্মের বেশ কয়েক জন ভিন্নমতাবলম্বী পীর ও আলেমকে খুন করা হয়েছে । এরা কেউ ই রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নয় তার পর ও ধর্মীয় ভিন্নমতাবল্বী হওয়ার করনে তাদের খুন করা হয়েছে বলে জানা যায় । এমন কি শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিল এটা ও কোন রাজনৈতিক মিছিল নয় তাই এখানে কারা এই গ্রেনেড হামলা করতে পারে সেটাই প্রশ্ন ? যেখানে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সংগে জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ততা আছে সেখানে শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলে হামলা জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ততা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যারা শিয়া সম্প্রদায়ের এ ধরনের ধর্মীয় সমাবেশ ও রীতিকে বেদাত বা শিরক কাজ মনে করে, তাদের দ্বারা হামলার আশঙ্কা কি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, হোসনি দালানে হামলার ঘটনাটি নাশকতামূলক। ঢাকামহানগর পুলিশ কমিশনার বলেছেন, এটি পরিকল্পিত ঘটনা। এএসআই ইব্রাহিম মোল্লার হত্যাকারীদের কাছে যে বোমা পাওয়া গেছে, হোসনি দালান হামলায় ও সেই বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। যদি এএসআই ইব্রাহিম মোল্লার হত্যাকারীদের কাছে পাওয়া বোমা ও হোসাইনী দালান হামলায় বোমা যদি একই হয়ে থাকে তবে কেন , এই নাশকতা ঠেকাতে পুলিশ কি আগাম ব্যবস্থা নিতে পারলো না? এখন পর্যন্ত চার ব্লগারসহ দুই বিদেশি হত্যার কোন কুল কিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার সথে নতুন করে যোগ হয়েছে হোসনি দালান হামলা । এখন দেখার বিষয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসকল ঘটনার সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের হতে তুলেদিতে পারবে না আতীতের ন্যায় অপশক্তির কাছে মাথা নত করে আসল সত্যকে মাটিচাপা দিবে?