ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

অতি সম্প্রতি আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ড ও হত্যাকারীদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন ’আমরা জজ মিয়া নাটক করব না’ তাই যেহেতু জনমানুষের মনের ভিতরে ‘জজ মিয়া’ বিষয়টি রয়ে গেছে তাই জজ মিয়াকে নিয়ে একটু বলি। ২১শে আগস্ট ২০০৪ এর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার কাহীনি সবার মনে ই দাগ কেটে আছে , যে হামলায় নিহত হয় ২৪ জন আর তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা সহ আহত হয় প্রায় ৩০০ লোক। এ হামলার সুষ্ঠ তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পদক্ষের নিতে সম্পুর্ণ রুপে উদাসীন ছিল তৎকালীন বিএনপি -জামাত জোট সরকার ও আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী ।

কিন্তু আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী নিজেদের গৌরব রক্ষার জন্য এ হামলার মূলহোতা হিসেবে ২০০৫ সালে গ্রেফতার করে জজ মিয়া নামের নোয়াখালীর সেনবাগের এক সিডি বিক্রেতা যুবককে । যা পরবর্তীতে জাতির কাছে জন মিয়া নাটক নামে পরিচিত । জজ মিয়া সে সময় গুলিস্তানে সিডির ব্যবসা করতেন। গ্রেনেড হামলার কয়েকমাস পর তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাকে তুলে মালিবাগের কার্যালয়ে নিয়ে আসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। কার্যালয়ে এনে ক্রসফায়ার করে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে সাজানো জবানবন্দি দিতে বলা হয় তাকে। তার সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দেয়া তৎকালীন সিআইডির কর্মকর্তারা। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবন বাঁচাতে সাজানো সাক্ষ্য দিতে রাজি হন তিনি। সিআইডির এক কর্মকর্তা তাকে একটি কাগজে জবানবন্দি লেখে দেন। সেটি মুখস্থ করিয়ে জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জড়িত বলে ১৬৪ ধারা আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়ায় সিআইডি। এর বিনিময়ে তার পরিবারকে মাসিক হারে টাকাও দিত তারা।দীর্ঘ কয়েকবছর কারাভোগের পর একটি দৈনিক পত্রিকায় জজ মিয়ার পরিচয় নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তথ্য প্রমাণে বেড়িয়ে আসে এটি ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকারের সাজানো নাটক। এর রচয়িতা ছিলেন তৎকালীন পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

জজ মিয়া নাটকের কাহিনীটা এ করনে ই বললাম যে। দুই বিদেশী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আমাদের পুলিশের মন্তব্য “২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে যারা সহিংসতা চালিয়েছে, তারাই এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আছে ” পুলিশের এমন বক্তব্যের মাধ্যে কেমন জানি একটি রাজনৈতিক সম্পর্কের আভাস পাওয়া যায় । ইতালিয়ান নাগরিক তাভেল্লা সিজার হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া চারজনকে গ্রেফতার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহ্যিত সাইকেল উদ্ধার পরিকল্পনাকারী বড় ভাই ও অর্থের জোগান দাতাদের সন্ধান নিঃসন্দেহ বিরাট অগ্রগতি । তার পর ও কেন জানি বার বার বিশেষ কিছু প্রশ্ন মনের মাঝে ঘুর পাক খাচ্ছে ?

প্রথমত প্রশ্ন জাগছে এত বড় একটি হ্ত্যাকান্ড ঘটিয়ে খুনিরা নিশ্চিন্তে ঢাকার শহরে অবস্হান করছিল আর আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী এক ই দিনে ৪ জনকেই গ্রেফতার করে ফেলল ? অথচ গ্রেফতারকৃতদের পরিবারের দাবী সম্পুর্ণ ভিন্ন গ্রেফতারকৃত শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরীফের ভাই মো. সোহাগের দাবী শরীফকে ১৪ অক্টোবর রাতে মধ্য বাড্ডা থেকে মোটর সাইকেলসহ ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তামজীর আহমেদ রুবেল ওরফে শুটার রুবেল ১২ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে বাড্ডা থানায় জিডি করা হয়। রাসেল চৌধুরী ওরফে চাক্কি রাসেলের মায়ের দাবী রাসেল চৌধুরীকে দক্ষিণ বাড্ডার বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ১০ অক্টোবর। আর মিনহাজুল আরেফিন ওরফে ভাগ্নে রাসেল যিনি ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি বর্ণনা করেছেন । রাসেলের বাবা ভাষ্য অনুযায়ী গত ১২ অক্টোবর মধ্য বাড্ডা থেকে তাকে ডিবি পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৬ অক্টোবর বাড্ডা থানায় জিডি করা হয়। কিন্তু আমাদের ডিএমপি কমিশনার বলছেন, তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে ২৫ অক্টোবর ।

এখানে গ্রেফতারকৃতদের পরিবারের দাবী ও আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহীনির দাবীর সাথে মিল না থাকার আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর এত বড় সাফল্য কিছুটা প্রশ্নের মুখো মুখি হয়েছে । কারন ইতোমধ্যে আগে গ্রেফতার করে পরে দেখানোর বহু নজির পুলিশ প্রতিষ্ঠিত করেছে । পুলিশের দাবি, সিসিটিভি-র ফুটেজে যাদের দেখা গেছে আটকদের মধ্যে তাদের তিনজন আছে ৷ তারা হলো, ‘‘চাক্কি রাসেল, ভাগ্নে রাসেল ও তামজীর আহমেদ রুবেল ওরফে শুটার রুবেল ৷ ”মামলার তদন্তকারীদের একজন গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মাহফুজুল ইসলাম ডয়চে ভেলের কাছে দাবি করেন, ‘‘এই তিনজনের চেহারা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি৷ এছাড়া আমরা তাদের আটক করেছি মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ৷ তাই তাদের আগে আটকের কথা ঠিক নয় ৷ এরা পালিয়ে থাকায় তাদের পরিবারই হয়ত এ কথা ছড়িয়েছে ৷”মোটর সাইকেলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে রংগ লাল আর জব্দকৃত মোটর সাইকেলের রং সিলভার কালার তাই সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে সঙ্গে জব্দকৃত মটর সাইকেলের রংগের মিল না পাওয়া যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, আটক মটর সাইকেলটিই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে ৷ রঙের বিষয় নিয়ে ভাবছি না ৷” এখানে হয়তো এমন টি ও হতে পারে যে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে অস্পষ্ট থাকার করনে হয়তো কিলভার রং ই লালের মত মনে হয়েছে । তাই স্বাভিক ভাবে প্রশ্ন আসে যে ঐ অস্পষ্ট ফুটেজ দেখে কি করে অপরাধীদের ‘চেহারা’ বুঝা সম্ভব হলো, যে খানে সিলভার রংগের মোটর সাইকেল লাল দেখাচ্ছিল তা পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন ছিল আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী। বিএনপির পক্ষ থেকে সরকার ও আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর দাবী হুকুম দাতা হিসেবে যে বিএনপি কে জরানো হচ্ছে তা সম্পুর্ন উদ্দেশ্য প্রনোদিত । দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকান্ড যা আমাদের রাষ্ট্রীয় মান সম্মান ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের সাথে ওতোপ্তো ভাবর জড়িত । তাই আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী দুই বিদেশী নাগরিক হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে সাফল্যের কাহিনী রচনা করেছে তা সত্যি ই আমাদের জন্য গর্বের বিষয় । তবে কোন ভাবেই আশা করি না যে আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী কারো রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আমাদের ই গর্ব ম্লান করে দিয়ে অতীতের ন্যায় যাতে নতুন কোন জজ মিয়া নাটকের জন্ম না দেয় ।