ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের মর্মান্তিক হত্যা ও অপর তিনজনের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলায় সমগ্র জাতি স্তম্ভিত, শোকার্ত। এ আঘাত জাতির মূল চেতনায় আঘাত হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছে সমগ্র জাতি । আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতাই ছিল স্বাধীনমত প্রকাশের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়া । আজ ধর্মীয় উগ্রবাদের অশুভ শক্তি আমাদের মূল ভিতের উপর বার বার আঘাত করে আসছে ।

স্বাধীনতার পর থেকেই স্বাধীনতা বিরোধী অশুভ শক্তি নানা ছলে বলে কলে কৌশলে শক্তি অর্জনে করে তাদের লক্ষে পৌছতে প্রায় সক্ষম হয়েছে । একাত্তরের বুদ্ধিজীবি হত্যার সেই অপশক্তি স্বাধীনার চোয়াল্লিশ বছর পরে ও থেমে নেই একে একের পর এক হত্যালীলায় আজো তারা লিপ্ত । সাম্প্রতি সেই অপশক্তির আক্রমনের শিকার প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন সহ আরো তিন জন । দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে চরম শোকের মুহূর্তেও অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন ” আমি বিচার চাই না, হত্যাকারীদের শুভবুদ্ধির জাগরণ চাই। আমি আইনে বিশ্বাস করি, তাই মামলা করব, কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ড নিছক ধর্মীয় বিষয় নয়, এর পেছনে আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত আছে। ” প্রত্যেক সংবেদনশীল মানুষ একজন পুত্রহারা পিতার ব্যাথায় ব্যথীত হয়েছেন সেই সাথে তার প্রতিক্রিয়াকে বাস্তব ও যুক্তি সংগত বলে মেনে নিয়েছেন । অথচ বর্তমান সরকারের কিছু সুবিধা ভোগী নেতা তার মর্মবানী না বুঝেই শুধু মাত্র নিজের স্বার্থ হাসিলের কথা চিন্তা করে একের পর এক মন্তব্য করতে দ্বিধা করে নি ।

পুত্র হারা আহত হৃদয়ের পিতার অন্তরকে আরো রক্তাক্ত করছে । ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দলের মুখপাত্রের ভূমিকা পালনকারী মাহবুব উল আলম হানিফ বিনাদ্বিধায় একজন শোকার্ত পিতাকে নিয়ে একজন প্রবীন শিক্ষকে নিয়ে উপহাস করে পুত্রশোকে কাতর পিতেকে হত্যাকারীদের দলে শামিল করে দিলেন ! হানিফ সাহেবদের হয়তো জানা নেই যে একজন শোকার্ত পিতা কখন কেন তার আর সন্তান হতার বিচার চান না ? তারা তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য যা ইচ্ছে বলতে ও করতে পারেন । অভিজিৎ রায়ের পিতা ডঃ অজয় রায় ও তার সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে মিনতি জানিয়েছিলে সরকার ও প্রশাসনের কাছে । তার পুত্রের আসল খুনিদের গ্রেফতার করতে কি তার মিনতি কবুল হয়েছে ? অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা আহমেদ স্বামীকে হারিয়ে নিজে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে ও আজ আর স্বামী হত্যা ও নিজের উপর হামলাকারীদের বিচার চান না ।হয়তো আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতিই তাদের বিচার না চাওয়ার কারণ ।হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে দীপন হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত কোনো খুনিই চিহ্নিত হয়নি। অপরাধীরা একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বিনা বাধায় পর পেয়ে নতুন নতুন হত্যাকাণ্ডের সাহস যোগাচ্ছে । নিঃসংকোচে তারা হত্যার দায় স্বীকার করে নিচ্ছে অথচ আমাদের সরকার ও আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী এব্যাপারে সম্পুর্ণ উদাসীন ।

আমরা দেখেছি এক সরকার আসে আরেক সরকার যায় কিন্তু তারা জঙ্গিবাদের নির্মূল ইস্যুকে গুরুত্ব দেয় না। যারা রাষ্ট্র চালায় তারা মনে করে যে, রাজনৈতিক বিরোধী দল ও বিরোধী মতাবলম্বী মানুষ তাদের একমাত্র শত্রু আর তাই বিভিন্ন অজুহাতে শাসক গোষ্ঠ বিরোধী মতাবলম্বীদের দমনে আদাজল খেয়ে লাগে । দীপনের হত্যার পর ও এর ব্যতিক্রম হয়নি সরকারের কর্তাব্যক্তি ও আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী যার যর মত করে বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন কেউ বলছেন এটা বিএনপি নেত্রীর কাজ , কেউ বলছেন জঙ্গিগোষ্ঠির কাজ আর এই বাক বিতন্ডই আসল আপরাধীদের আড়াল করতে সাহায্য করছে আর সেই সুযোগ কে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদ তথা জঙ্গিবাদ শক্ত অবস্হানে চলে এসেছে ।দেশে জঙ্গিরা বিভিন্ন নামে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আগে তারা রাতের অন্ধকারে খুন করত এখন দিবালোকে প্রকাশ্যে ব্লগার ও সৃজনশীলদের ওপর হামলা চালাচ্ছে আবার হালার পর সেই আমার স্বগৌরবে শিকার করে নিচ্ছে যা আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূল কারণ । একটি রাষ্ট্র ও তার সরকারের কাছে নাগরিকের প্রথম চাওয়াই হচ্ছে জীবনের নিরাপত্তা ।

যেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাই না থাকে সেখানে সব উন্নায়ন ই মূল্যহীন ।মানুষ চিনবে জানবে মত প্রকাশ করবে তার নিজের ধ্যনধারনা ও চিন্তা শক্তির প্রকাশ করবে নিজের ইচ্ছা ভিত্তিতে যদি চাপাতির কোপে রক্তাক্ত হয় সেই চিন্তার জগৎ তখনি সেখানে নেমে আসে ভয়ঙ্কর অশনিসংকেত। মানুষের চিন্তা-মননের চর্চার অধিকার মৌলিক অধিকার একে অক্ষুণ্ন রাখা ই সরকারের প্রধান দায়িত্ব।

কিন্তু যে মৌলবাদের অপশক্তি আমাদের মুক্তচিন্তা ধ্বংসের উন্মদনায় নেমেছে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত সকলকে এই অপশক্তির মূল উৎপাটন করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে ।তা না হলে অতি শীঘ্রই আমরা হারিয়ে যাবো বর্বর মধ্যযুগের কালো অন্ধকারে ।