ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ই ছিল গনতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ,বাকস্বাধীনতা কিন্তু স্বাধীনতার চৌয়াল্লিশ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা পুরোপুরি অর্থহীন অসার রুপেই পরে আছে । যদিও আমারা নিজেদের গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে দাবি করে আসছি তার পর ও আমাদের গনতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতার যে কি অবস্হা তা কম বেশি সবারই জানা আছে । গনতন্ত্রের মূল মন্ত্র ই হলো বাকস্বাধীনতা তথা মুক্ত চিন্তার। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা সত্যিকার গনতন্ত্রের কি বিপরীতে নয় ? স্বাধীনতার চৌয়াল্লিশ বছর পর ও আমাদের বাকস্বাধীনতা তথা মুক্ত চিন্তার প্রকাশের দ্বার বন্ধ প্রায় । আমাদের দেশে মুক্তচিন্তা বা স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য আজো মুক্ত চিন্তার ধারক ও বাহকদের পদে পদে অপমান ও হামলার শিকার হতে হয় । তাই আমার মনে হয় আমাদের দেশে গনতন্ত্র আজ সম্পুর্ণ ভাবে ই অর্থহীন ।

আমাদের বাকস্বাধীনতা তথা মুক্ত চিন্তা প্রকাশের বড় অন্তরায় ই হলো ধর্মীয় উগ্র মৌলবাদ আর তার সাথে সরকার তথা রাষ্ট্রযন্ত্র । প্রথমেই বলতে হয় ধর্মীয় উগ্র মৌলবাদ আমাদের স্বাধীনতা তথা মুক্ত মত প্রকাশকে বিশেষ ভাবে বাধা গ্রস্হ করেছে । ধর্মীয় রাজনৈতিক ও ভৌগলিক কারনে আমাদের দেশে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা শক্ত খুটি গেঁথে আছে একের পর এক মুক্তচিন্তার ধারকের হত্যা ও হামলার মাধ্য দিয়ে আমাদের বাকস্বাধীনতা টুটি চেপে ধরার জন্য ই ব্যস্ত ধর্মীয় উগ্রবাদীরা । বছরের শুরু থেকে আদ্যবধি চার জন ব্লগার ও এক জন প্রকাশকে হত্যার মধ্যদিয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা আমাদের সমগ্র জাতির মনে আজ আতংক ও ভয় ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য মরন পন চেষ্টা করে আসছে । যে কোনও মুহূর্তে গলায় চাপাতির কোপ নেমে আসতে পারে জেনেও মুখ বুজে নেই আমাদের প্রতিবাদী বিবেক ও চিন্তা । কিন্তু কত দিন? কত জন? প্রশাসনিক ভাবে কিছু করা সম্ভব কি না আমরা সাধারন নাগরিক তা বুঝিনা। কিন্তু যদি সম্ভব না হয়, তা হলে আমরা আধুনিক যুগ থেকে চিরকালের জন্য স্হবির হয়ে পরবো । প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিসর থেকে এমন ভাবেই বিচ্যুত হব যে, সেই পরিবেশ কখনো ই হয়তো ফিরবে না। আমাদের সরকার তথা রাষ্ট্রযন্ত্র সব সময় ই ধর্মীয় মৌলবাদীদের পক্ষে অবস্হান নিতে মোটে ও কুন্ঠাবোধ করে নি আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র মৌলবাদীদের কোন না কোন ভাবে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে আসছে । তাই মৌলবাদীদের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র মুক্ত চিন্তা তথা বাক স্বাধীনতা প্রকাশের পথ প্রায় রুদ্ধ করে রেখেছে ।

মুক্ত চিন্তা তথা বাক স্বাধীনতা প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকারের বৈরি মন ভাব আরেক বিশেষ বাধা । সরকার বিভিন্ন কালো আইন করে মুক্তচিন্তা তথা বাকস্বাধীনতা প্রকাশের পথ প্রায় বন্ধ করে রেখেছে । বর্তমান সময়ের তেমনি একটি কালো আইন হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন সেই সাথে আছে সম্প্রচার নীতিমালা । বর্তমান ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন সম্পুর্ণ ভাবে আমাদের মুক্তচিন্তার অন্তরায় । ফেসবুক,টুইটার , ব্লগ সহ অনলাইন ভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে আমাদের দেশের তরুন প্রজন্ম স্বাধীনভাবে লেখালেখির মাধ্যমে মত প্রকাশ করেছে । অথচ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় সেই অধিকারকে সম্পুর্ন ভাবে বাধাগ্রস্হ করা হয়েছে ।

তাই একটু জানা দরকার কি এই ” তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা ” । বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সর্বশেষ সংসদ অধিবেশনে ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬’ পাস হয়। আইনটি পাসের পরে আইনটির ব্যবহারিক দিক নিয়ে তেমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত না হলেও ২০১৩ সালের সংশোধনীর পরে বিষয়টি আলোচনা ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ১/১১-পরবর্তী দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আইনটির প্রয়োগ চোখে পড়েনি। ফলে আইনটির কিছু কিছু ধারা যে বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের জন্য হুমকি হতে উঠতে পারে তা বিবেচনায় আসার বাস্তবিক প্রেক্ষিত আসেনি। পরবর্তী সময়ে আইনের ৫৭ ধারা মহান সংসদে সংশোধনী আকারে পাস হওয়ায় আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৭ ও ৬১ ধারায় উল্লিখিত অপরাধগুলো দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো আদালতের দ্বারস্থ ব্যতিরেকেই কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন বলে আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ আদালত কর্তৃক কোনো প্রকার সমন জারি ছাড়া তারা চাইলেই যে কারো বিরুদ্ধে এফআইআর রেজিস্ট্রেশন ও তদন্ত করা এবং তাঁকে আটক করতে পারার আইনি ক্ষমতা লাভ করেন। ৫৭ ধারা ছাড়াও এ আইনের অধীন কিছু অপরাধের অভিযোগকে জামিন অযোগ্য এবং আইনে ৫৪, ৫৫, ৫৭ ও ৬১ ধারায় উল্লিখিত অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য ঘোষণা করায় তা নাগরিক অধিকার অনেকাংশে ক্ষুণ্ণ করেছে বলেই আইন বিশেষজ্ঞদের মত। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বিশেষ করে তরুণ সমাজ তথা আমাদের মুক্তমত প্রকাশক তথা মুক্ত চিন্টার ধারকরা স্বাভাবিকভাবেই ভীতিকর হুমকির ভেতর পড়েছে। ৫৭ ধারার কিছু কিছু শব্দ কোন কোন ধরনের কর্মকাণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করবে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় ইন্টারনেট এর স্বাভাবিক বিভিন্ন কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মিথ্যা কিংবা ষড়যন্ত্রমূলক হয়রানির সুযোগও রয়েছে অনেক। জামিন অযোগ্য হওয়ায় মিথ্যা অভিযোগে মামলা নিষ্পত্তি অবধি জামিন না পাওয়ার সম্ভাবনা ৫৭ ধারাকে আরো ভীতিকর করে তুলেছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোট হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ তাই ধারাটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ, এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন বলেও মতামত দিয়েছে। আথচ আমাদের সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে । তথ্যপ্রযুক্তি আইন এবং তার ৫৭ ধারার আমাদের মুক্তবুদ্ধি , মুক্তচিন্তা এবং বাকস্বাধীনতা তথা আমাদের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে হুমকি হিসেবে দাড়িয়েছে । তাই আমাদের বাংলাদেশে স্বাধীন ও মুক্ত মত প্রকাশের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন পিছুকরছে উগ্রধর্মীয় মৌলবাদীদের চাপাতি অপরদিকে ঝুলছে রাষ্ট্রযন্ত্র তথা প্রশাসনের হাত করা অর্থাৎ জেল জুলুম ।