ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

নির্বাচন হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন একটি আনুষ্ঠানিক বা প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জনগণ প্রশাসনিক কাজের জন্য একজন প্রতিনিধিকে বেছে নেয়। সপ্তদশ শতক থেকে আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে নির্বাচন একটি আবশ্যিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেন জানি নির্বাচনের এমন সংজ্ঞা ক্রমেই তিতা হয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন কালো টাকা, পেশী শক্তি ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কাছে আমাদের গণতন্ত্র ও এর মূল নিয়ামক নির্বাচন ক্রমেই দূর্বল অসার হয়ে পরছে। নির্বাচন তথা জনগের ভোটের মাধ্যমে যোগ্যতম প্রতিনিধি নির্বাচন কেন জানি আজ আমাদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি আমাদের দেশে শেষ হয়ে গেল ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপ, যদিও ছয় ধাপে এ নির্বাচন শেষ হবে ৪ জুন। এবারে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন একাট বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে আমাদের কাছে হাজির হয়েছিল তা হলো- এবারই প্রথম দলীয়ভাবে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলছে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আমার কাছে সব নির্বাচনের শ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে মনে হয় তাই আমি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে গাঁও-গ্রামের নির্বাচন বলেই আখ্যায়িত করি। কারণ এই নির্বাচনের মাধ্যমেই আমাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠি তাদের সেবক বা প্রতিনিধি নির্বাচন করে থাকেন। তাই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেই সবচেয়ে বেশি উৎসবের আমেজ থাকে। কিন্তু এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কেন জানি সেই উৎসব আতংকে পরিণত হয়েছে।

গত ২২ মার্চ ছিল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে ব্যাপক সহিংসতার মধ্য দিয়েই প্রথম ধাপের ৭১২টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম ধাপের সেই নির্বাচনের দিনেই বিভিন্ন ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে সাড়া দেশে নিহত হয়েছেন ১১ জন এবং আহত হয়েছেন সহস্রাধিক। প্রথম ধাপের নির্বাচনের পরের দুইদিনে নির্বাচনের দিনে আহত আরো তিনজনসহ নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন আরো ৬ জন। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের পূর্বেই সারাদেশের অনেক এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১০ জন এবং আহত হয়েছেন দুই সহস্রাধিক। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২।

প্রথম ধাপের নির্বাচনের এত ঘটনার পর ভেবে ছিলাম নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হয়তো সজাগ হবে। দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়তো কিছুটা হলে ও সুষ্ঠ ও আনন্দ মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। অথচ সেই আশারও ফল হলো গুড়ে বালি। দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও রক্ত স্রোত থামেনি।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী এ পর্বের নির্বাচনে নির্বাচনী সহিংসতায় সাড়া দেশে নিহত হয়েছে ১১ জন এদের মধ্যে রয়েছে একজন শিশু। প্রতিটি হ্ত্যা বা খুনই প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের কাছে বেদনা দায়ক কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নের মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র নয় বছরের শিশু শুভ কাজী হত্যা কেন জানি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছি না ।

শুভ তার মায়ের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে এসেছিল নির্বাচনী উৎসবে শরিক হতে । কিন্তু সেই উৎসবই যে শুভর জীবনের কাল তাতো ভাবেনি শিশু শুভ। কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়নের মধুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ১০টার দিকে রানা মোল্লা নামের এক ব্যক্তি ২৫-৩০ জন লোক নিয়ে কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সিল মারার চেষ্টা চালান। রানা আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আনোয়ার হোসেন আয়নালের লোক হিসেবে পরিচিত। তাঁদের তাণ্ডবে ওই কেন্দ্রের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকেন। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়লে সেই গুলিই কেড়ে নেয় শিশু শুভর জীবন।

ভোট, রাজনীতি, গনতন্ত্র বা ক্ষমতা কোনটা কি তার কিছুই জানতো না শুভ। শুভ শুধু জানত ভোট কেন্দ্রের মায়ের সাথে আসলে চকলেট বা আইসক্রিম খাওয়া যাবে বেলুন কেনা যাবে। শুভর মৃত্যুর কেন জানি মনে করিয়ে দেয় উনসত্তের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান শহীদ হওয়া নবকুমার ইন্সটিটিউশনের ছাত্র শহীদ মতিউর রহমানের কথা। মনে করিয়ে দেয় নাম না জানা মিছিলের অগ্রভাগে থাকা ঐ পথ শিশুটির কথা যাদের জীবন কেড়ে নিয়েছিল বর্বর পাকিস্তানী হায়নাদের বুলেট। আজ শুধু একটাই প্রশ্ন স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এসেও কেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লোভী ঘাতকদের বুলেটে কেড়ে নেয় শিশু শুভদের জীবন? কি এমন মধু আছে আমাদের এই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যার জন্য জীবন দিতে হয় হাজারো শুভকে? কেন বার বার শুভদের জীবন কেড়ে নেয় আমাদের অশুভ রাজনীতি?