ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

দিন দিন আমাদের দেশের মানুষদের ভিতর মনুষ্যত্ব বোধ কেন জানি কমে যাচ্ছে আমি সমগ্র দেশের মানুষকে যদিও ঢালাও ভাবে বলছিনা আবার কাউকে বাদ দিতেও পারছি না। হয়তো আমার এমন কথায় অনেকই কষ্ট পাবেন, কেউ হয়তো ভাববেন হয়তো আমি সমগ্র দেশের মানুষেরই মানহানী করছি যদি এমনটি কেউ ভাবেন সেটা হয়তো পুরোপুরিই ভুল হবে। কারণ একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে যদি কোন অন্যায় বা অপরাধ সংগঠিত হয় তার দায় ভার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সেই সমাজ বা রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিককেই বহন করতে হয়। আজ থেকে বেশ কিছুদিন আগে অর্থাৎ ২০১২ সালের শেষ দিকে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে চলন্ত বাসে এক মেডিকেল ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হন পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্হায় মৃত্যু হয় ২৩ বছর বয়সী ঐ তরুনীর। যে ধর্ষণ নাড়া দিয়েছিল ভারত সহ সমগ্র বিশ্ব বিবেককে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল ভারতসহ সমগ্র বিশ্ব।

ঐ রেশের মধ্যেই হিন্দি সিনেমার ট্র্যাডিশন কপি হয় আমাদের দেশে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে ধর্ষনের শিকার হতে হয় এক পোষাকশিল্প শ্রমিক তরুনীকে। যদিও এ নিয়ে আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলি সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জাতিকে সোচ্চার করতে পেরেছিল। তার পরও থেমে থাকেনি এ ধরনের অপরাধ বরং সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে গণপরিবহনে নারী নির্যাতন ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর খুনের ঘটনা । এ ধরনের ঘটনার পর পরই তথা কথিত আন্দোলন বা প্রতিবাদ মুখরিত হয়ে উঠে সমগ্র জাতি। আমি তথা কথিত প্রতিবাদ বলছি এ কারণে যে প্রতিবাদ বা আন্দোনের পরেও কোন ঘটনার সুষ্ঠ বিচার হয়েছে বা ঐ ধরনের ঘটনা কমেছে তা আমরা লক্ষ্য করিনি বরং ঐ ধরনের ঘটনা আরো বেড়ে গেছে অপরাধীরা ভয়ের পরিবর্তে আরো বেশি উৎসাহী হয়ে উঠে।

মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে তরুনী ধর্ষিত হওয়ার পর থেকে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলছে এ ধরনের ঘটনা। সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গত দুই বছরে অন্তত আঠারো জন নারীকে ধর্ষণ ও শারিরীক নির্যাতনের শিকার হতে হয় গণপরিবহনে, যাদের মধ্যে অনেককেই ধর্ষণের পর হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ গত পহেলা এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হতে হয় এক নারীকে। যদিও এ ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করতে স্বক্ষম হয়েছে।

গত বছর রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে জোড় পূর্বক এক গারো তরুনীকে চলন্ত মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ করা হয়। এর পর সাড়া দেশে এ নিয়ে প্রতিবাদ উঠলে ধর্ষকদের গ্রেফতার করা হয় এরপর এই মামলা কি অবস্হা তা আর আমাদের জানা নেই। ইদানিং গণপরিবহন আমাদের নারীদের কাছে এক আতংকে পরিণত হয়েছে । এক ধরনের নিরুপায় হয়েই আমাদের নারীরা গণপরিবহন ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এ নিয়ে নানা জনের নানা মত থাকলেও বিনা দ্বিধায় বলা যায় একুশ শতকে এসেও আমাদের দেশের নারীরা অনেক স্হানেই মোটেই নিরাপদ নয়।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১১ সালে ৬২০ জন, ২০১২ সালে ৮৩৬ জন, ২০১৩ সালে ৭১৯ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, ২০১৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪৩১টি ধর্ষণের ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে এবং এর মধ্যে ৮২টি ছিল গণধর্ষণ অপরাধ।

প্রতিবছরের ধর্ষণ চিত্রের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। কোনও কোনও সূত্রমতে পুলিশি খাতায় ২০১৪ সালে ধর্ষণ মামলার সংখ্যা ৪৬৪২টি এবং ২০১৩ সালে ধর্ষণ মামলার সংখ্যা ছিল ৪৫৩৮টি। প্রকৃত সংখ্যাটা যদিও অনেক বেশি হবে তার পরও ধরে নিলাম স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে আদ্যবধি প্রতিবছর গড়ে ১০০০ জন ধর্ষিত হয়েছে। তাহলে গণিতের হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশে ৪৫ বছরে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৫ হাজার নারী।

পরিসংখ্যান যাই বলুক আমাদের দেশে নারীর অবাধ চলাচল আজও যে মোটেও নিরাপদ নয় এটাই বাস্তব সত্য । আমাদের দেশে নারীর এ দূরাবস্থার জন্য সামগ্রিক ভাবেই দায়ী আমাদের বিচার ব্যবস্হা। যদিও আমাদের মানসিকতা ও দৃষ্টি ভংগির পরিবর্তন জরুরী। তারপরও বিচার ব্যবস্থাই প্রথম কারণ। প্রত্যেক টি ঘটনার যদি সুষ্ঠ বিচার হতো তা হলে অন্তত বিচারের ভয়ে ও অপরাধীরা অপরাধ করতে অনেকটা দ্বিধা করতো তাতে ক্রমানয়ে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনও ঘটতো। কিন্তু বিচারহীনতা বা বিচারে দীর্ঘ সূত্রিতার করনেই অপরাধীরা পার পেয়ে নতুন অপরাধের প্রতি উৎসাহ বোধ করছে । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত বা গণপরিবহন যে জায়গাই হউক আমরা চাইবো আমাদের নারীরা নিরাপদে থাকবে তাদের প্রতি যদি কোন অন্যায় হয় তাহলে আইন তথা বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উদাহরণ সৃষ্টি করবে।