ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

জমি তথা ভূমি পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর বিশেষ করে মানুষের সকল কর্মকান্ডেরই মূল উৎস। জম্ম থেকে মৃত্যু সবই এ জমি বা ভূমিতে, তাই মানুষের জীবন জীবিকার জন্য জমির বিকল্প কিছুই নেই। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার এই জমি গুলির দিকে সবসময়ই কু-নজর এক শ্রেণীর ভূমি দস্যুদের। এসব ভূমি দস্যুরা সম্পদশালী অথচ নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্যও নিজেদের অধিক সম্পদশালী করার জন্য সব সময়ই কেড়ে নিচ্ছে আমাদের সাধারণ নিরীহ মানুষের জমি। গত সোমবার অর্থাৎ ৪ এপ্রিল চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারার ঘটনা নতুন করে আতীতের অনেক ঘটনাই মনে করিয়ে দিল।

বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারার উপকূলীয় এলাকায় এস আলম গ্রুপ ও চায়না সেফকো কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করছে। স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ এস আলম গ্রুপ পুনর্বাসনের সুযোগ ও জমির ন্যায্য মূল্য না দিয়েই জোর করে তাদের জমি অধিগ্রহণ করে নিজেদের বাপ-দাদার ভিটা মাটি থেকে উচ্ছেদ করছে তাদের। এই উচ্ছেদের প্রতিবাদেই “বসতভিটা রক্ষা সংগ্রাম কমিটি” এর ব্যানারে এলাকাবাসী বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। এরই অংশ হিসেবে গত সোমবার সমাবেশের আয়োজন করে এলাকাবাসী। এই সমাবেশকে ভন্ডুল করার জন্য এস আলম গ্রুপ এর স্থানীয় দালালরা বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পক্ষে একই স্থানে সমাবেশের আয়োজন করে। এই সুযোগ কেই কাজে লাগিয়ে স্থানীয় প্রসাশন সেখানে ১৪৪ ধারা জরি করে।

আমাদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবাদ তথা স্লোগান চালু আছে “জীবন দিব তবুও জমি দিব না” এই স্লোগান নিয়েই গণ্ডামারার স্থানীয় সাধারণ ভূমি মালিকেরা নিজেদের ভিটা মাটি রক্ষায় ১৪৪ ধারা ভাংগতে বাধ্য হয়েছিল। ১৪৪ ধারা অমান্য করার জন্যই এলাকাবাসীর মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ যা পরবর্তীতে রক্তক্ষয়ী সংর্ঘষে রূপ নেয়। এতে হতাহত হয় স্থানীয় অনেকেই। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে জীবন দিতে হয়েছে অন্তঃসত্ত্বা এক মহিলাসহ অন্তত্য ছয় জনকে আহত হয়েছে পুলিশসহ অর্ধশতাধিক।

এর আগেও মুন্সীগঞ্জের আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের প্রতিবাদেও ফুঁসে উঠতে দেখেছি সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের, সেখানেও জীবন দিতে হয়েছে মানুষকে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়ার কথাও আমরা ভুলে যাইনি। ২০১০ সালের অক্টেবর মাসের শেষ দিকে সে কিনা তুলকালাম কান্ড! কায়েতপাড়া ও রূপগঞ্জ ইউনিয়নের ২৪টি মৌজায় সেনা আবাসন প্রকল্পের (আর্মি হাউজিং স্কিম) জমি কেনা নিয়েই ঘটেছিল সেই কাণ্ড। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল এই প্রকল্পের নামে নামমাত্র মূল্য দিয়ে স্থানীয়দের ভিটা-মাটি ছাড়ার করার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল, এমন কি তারা চাইলেও নাকি অন্য করো কাছে জমি বিক্রি করতে পরছিল না এরই প্রতিবাদের ফুঁসে উঠেছিল সেখানকার জনতা। এতেও হতাহত হয়েছে অনেকেই।

প্রতিনিয়তই সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয় ভূমি নিয়ে জীবন দেয়া-নেয়ার কাহীনি। আবাসন, শিল্প বা অন্য কোন প্রকল্পের নাম করে গ্রাস করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের জমি। ঢাকাসহ অন্যান শহরের আশে-পাশের সাধারণ মানুষ আজ তাদের জমি ও জীবন উভয় নিয়েই চিন্তিত। ভূমি খেকোদের একই কথা হয়তো “জমি দিবি না হয় জীবন দিবি”। কোন ভাবেই শেষ হচ্ছে না জমি আর জীবনে এই কাহিনী। আমি কাহিনী বলতে বাধ্য হলাম এই কারণেই যে আমাদের সাধার মানুষেরা সেই আদি কাল থেকেই নানাভাবে প্রভাবশালী ভূমিদস্যু তথা ভূমি খেকোদের নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার অথচ প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিরা বার বার শুধুই ভূমি খেকোদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যস্ত। কখনোই নির্যাতিত মানুষেরা পায় নাই তাদের ন্যায় বিচার, আজো আমাদের সমাজ তথা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি তাদের ন্যায্য অধিকার। আইন ও সংবিধানে যদিও সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা কথাই বলা আছে। এর পরও এটাই প্রত্যাশ করবো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, প্রতিটি মানুষ তার ন্যায্য অধিকার পাবে।