ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বাংলাদেশে ধারাবাহিক ভাবে একই কায়দায় খুন হতে হচ্ছে লেখক, প্রকাশ ও ব্লগারদের। এসব খুনের পরপরই কোন না কোন ইসলামিক উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী এর দায় স্বীকার করে নিয়েছে । এ ধারা যদিও অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে জন্ম নিয়েছিল তবে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে মুক্তচিন্তার লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের উপর হামলার মধ্যদিয়ে এটা একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ড. হুমায়ুন আজাদের উপর হামলার দায় তখন ইসলামী উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী জমিয়াতুল মুজাহেদীনের সন্ত্রাসবাদীরা স্বীকার করে নিয়েছিল। এরপর বেশ কয়েকজন লেখক ও ব্লগারের উপর হামলা হলেও সবচেয়ে বেশি সমালোচনা শুরু হয় ২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনের হত্যার মধ্যদিয়ে। রাজীব হায়দার শোভন হত্যার পরই হত্যাকারীরা কেন জানি আরো উৎসাহিত হয়ে উঠে নতুন নতুন ঘটনা ঘটানোর জন্য। অবশ্য রাজীব হত্যার পর সবাই ভেবেছিল হয়তো এ ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হবে না। তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সহ ক্ষমতাশীনেরা তখন রাজীবের জন্য কতই না মায়া কান্না করেছেন কেউ কেউ রাজীবকে জাতিয় বীর হিসেবেও আক্ষায়িত করেছিলেন। কিছু দিন না যেতেই প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।

৫ মে ২০১৩ এর জামাত-ই ইসলামের ছায়া সংগঠন হেফাজত-ই- ইসলাম নামক তথাকথিত ইসলামিক সংগঠনের তান্ডবের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয় সরকার ও তার প্রশাসন। এর পর থেকেই সরকার ও প্রশাসনের মায়া মমতা ও দরদ কমতে থাকে একাত্তরের মানবতা বিরোধীদে বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমা আসা সমস্ত যুব সমাজ তথা গনজাগরন আন্দোলনে শরিক হওয়া দেশের মানুষের উপর। এমন কি হেফাজত-ই-ইসলামের দেয়া তালিকা থেকে লেখক ও ব্লগারদের গ্রেফতার শুরু করতে দেখা যায় সরকার কে। এতেই উৎসাহিত হয়ে নানা নামের ইসলামিক উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠ হেফাজত-ই-ইসলামের দেয়া তালিকা ধরে ব্লগার ও অনলাইন এ্যাকটিভিষ্টদের হত্যার উল্লাসে মেতে উঠে। এর ই ধারাবাহিকতায় গত ৬ এপ্রিল বুধবার রাতে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের একরামপুর মোড়ে উগ্রবাদিদের চাপাতি ও বুলেটে খুন হতে হয় অনলাইন এ্যাকটিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদকে। নাজিমুদ্দিন সামাদ ছিল একাত্তরের মানবতা বিরোধীদের বিচারে পক্ষের সৈনিক ও গণজাগরণ আন্দোলনের কর্মী। জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী বেসরকারি সংস্থা সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপের তথ্যমতে নাজিমুদ্দিন হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে নেয় আনসার আল ইসলাম নামে আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী। এ ধরনের প্রতিটি হত্যাকান্ডের পরপরই আমাদের দেশের কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে নানা ধরনের বক্তব্য ও মন্তব্য শোনা যায়।

নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যার পরও এর ব্যতিক্রম হয় নি। বিবিসি বাংলার সাথে নাজিমুদ্দিন সামাদ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আলাপ কালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন “কেন এটা হয়েছে, কি হয়েছে, এখনই তা বলতে পারবো না। আগে জেনে নেই।” তবে একই সাথে মন্ত্রী বলেন, “ব্লগে আপত্তিজনক লেখা লিখেছে কিনা তা দেখার প্রয়োজন আছে”। আপত্তিকর লেখা লিখলেই কি হত্যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এই প্রশ্নে বিরক্তি প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। “আমি সে কথা বলতে চাইনি…আগের যে হত্যাকাণ্ড গুলো হয়েছে তাদের ব্লগ যদি দেখেন, এভাবে মানুষের ধর্মে আঘাত দেওয়া, বিশ্বাসে আঘাত দেওয়া, পৃথিবীর কোনো দেশেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।”

অবশ্য এর আগে ২০১৫ সালের ৯ আগস্ট পুলিশ সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক ব্লগারদের সীমা লংঘন না করতে বলেছিলে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর এবারের এমন বক্তব্য আমাকে চরমভাবে মনক্ষুন্ন করেছে যেখানে মাননীয় মন্ত্রীর প্রসাশনকে বলার কথা যে কারা খুনি তাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে যতদ্রুত সম্ভব খুনিদের আইনের আওতায় আনা সেখানে তিনি তা না বলে নাজিমুদ্দিন কোথায় কি লিখেছে সে ব্যাপারে প্রসাশনকে খোঁজ নিতে বলেছেন। একজন মানুষ যে কারণেই খুন হউক না কেন খুন হয়েছে এটাই বড় কথা আর যারা খুন করেছে অর্থাৎ অপরাধীদের যত দ্রুত সম্ভব গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা এটাই রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা কর্তা ব্যক্তিদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমাদের দেশের বেলায় কেন জানি সব কিছুতেই উল্টো একের পর এক ধর্ষিত হচ্ছে আমাদের কোন না কোন নারী অথচ আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র ধর্ষকের বিচার না করে ধর্ষিতার পোষাকের সমালোচনা করে ধর্ষিত নারীকে আরো কয়েক বার ধর্ষণ করে দেয় ।

যদি কোন ব্যক্তি ধর্ম নিয়ে কোন উস্কানিমূলক লেখা লিখে তার জন্য তাকে কি ধর্মীয় উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী তকে খুন করে ফেলবে? তাহলে দেশে আর আইনের শাসন বলতে বাকী কিই বা রইল? লেখক, প্রকাশক ও ব্লগারদের খুনের বিচারে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতরে কেন জানি একটি চরম উদাসীন ভাবদেখা যায়। ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যার সাথে সাথে ই চাপাতিসহ হত্যাকারীরা ধরা পড়েছে তাও আবার পুলিশের হাতে নয় নিতান্ত সাধারণ দু’জন মানুষ, হিজড়া নাম দিয়ে সমাজ যাদের অপাংক্তেয় করে রেখেছে, তারা জীবন বাজি রেখে আটক করেছিল খুনিদের সেদিন জনগণ নিজেদের হাতে আইন তুলে নেয়নি খুনিদের তুলেদিয়েছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকদের হাতেই। তারপরও ভেবে ছিলাম আইন সুষ্ঠ গতিতে চলবে ঘটনার মূলে থাকা জঙ্গিরা ধরা পরবে কিন্তু তা আর বাস্তবে হয় নি। মূল অপরাধীরা আজো স্লিপার সেলেই আছে দিন দিন ওরা অর্থ ও শক্তি জুগিয়ে নতুন ডাল পালার বিস্তার করছে।

হয়তো ক্ষমতার জন্যই আমাদের সরকার তথা বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্র আজোও ঘুমিয়েই আছে। এই ঘুম যদি আরো একটু দীর্ঘায়িত হয় তবে সেদিন আর বেশি দূরে নয় মৌলবাদীদের সেই স্লোগানই বাস্তবায়িত হবে “আমরা হবো তালেবান দেশ বানাবো আফগান।” তবে আমরা চাইবো না মহান মুক্তিযুদ্ধের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীন দেশে উগ্রধর্মীয় মৌলবাদ মাথা গজিয়ে উঠুক। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিণতি কখনোই আফগান বা পাকিস্তানের মত হউক। মুক্তচিন্তা মুক্ত মত চিরজীবি হউক বাংলাদেশে এটাই প্রত্যাশা।