ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সামাজিক ভাবে বহুল প্রচলিত ” সংখ্যালঘু ” শব্দটি ইচ্ছাকৃত ভাবে আমি ব্যবহার করতে চাই নি তার পর ও অবস্থার প্রেক্ষিতে এই শব্দটি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি ।এ জন্য দুঃখ প্রকাশ ছাড়া আমর আর করার কিছু ই নেই । মাহন মুক্তিযুদ্ধের বিনিময় অর্জিত স্বাধীন দেশে কোন জাতি , ধর্ম বা বর্ণের মনুষকে সংঘ্যালঘু হিসেবে আখ্যায়িত করা বা বিবেচিত করা হয়তো কোন সুস্হ্য জাতির পরিচয় বহন করে বলে আমার মনে হয় । এমন টা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সাথে ও মানানসই না । ১৯৪৭ সালে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্হান বিভক্তির মধ্য দিয়েই আমাদের মানসিকতায় এমন বিভক্তির জন্ম । দেশ ত্যাগের পূর্ব মুহুর্তে লর্ড মাউন্টব্যাটেন গান্ধী, নেহেরু আর জিন্নাহ সাহেবদের নিয়ে যে বিষবৃক্ষে বীজ বপন করে নানা মুখী ক্ষতের সৃষ্টি করে গেছে তা কত দিন জাতিকে বইতে হবে এটাই একটা প্রশ্ন ? ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশন ভারতীয় নেতৃবর্গের হাতে যখন ব্রিটিশ ভারতের শাসনভার তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন মূলত তখন থেকেই আমাদের এ অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি নষ্ট হতে শুরু করে । হিন্দু প্রধান ভারত ও মুসলিম প্রধান পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের যে প্রস্তাব আসে তাতে বাঁধা হয়ে দাড়ায় কংগ্রেসের প্রতিবাদ । একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে মুসলিম লিগ ১৯৪৬ সালের ১৬ অগস্ট সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয় যে ধর্মঘট ই সৃষ্টি করে ” দীর্ঘ ছুরিকার সপ্তাহ ” নামে পরিচিত কুখ্যাত সপ্তাহ কালের প্রথম দিন যে দিন কলকাতায় শুরু হয়েছিল ইতিহাসের ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যে দাঙ্গা পর্যায় ক্রমে ছড়িয়ে পরে নোয়াখালী, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ও। তবে সর্বাপেক্ষা ভংকর দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল কলকাতা ও নোয়াখালীতে ।এ দাঙ্গায় জীবন দিতে হয়েছিল অন্তত দশ লাখের ও বেশি সাধারন মনুষকে । এ ভাবেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অজুহাতে ঘটতে থেকে নানা ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা । ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও এদেশীয় লুটারদের দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায় সহ অন্যান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর চালনো হয় হত্যা হামলা ও লুটপাট । যে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষতায় প্রতিশ্রুতি নিয়ে আমাদের দেশের আপমর মানুষ ঝাপিয়ে পরেছিল মহন মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে । ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর আড়াই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমনের বিনিময় আর্জিত স্বাধীন দেশে ও থেমে থাকেনি এ ধরনের বর্বরোচিত ঘটনা ।

আমাদের মূলধারার রাজনৈতিক দল গুলির নেতাকর্মীদের মধ্যে যতই মতবিরোধ থাকুক না কেন একটা ব্যাপারে কিন্তু তাদের অদ্ভুত মিল রয়েছে সেটা হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ও তাদের জায়গা সম্পত্তি দখল ।২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট জয়ী হওয়ার পরপরই তাদের প্রকাশ্য ছত্রচ্ছায়ায় দেশের দক্ষিণাঞ্চল সহ অন্যান্য এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর যে বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হয় তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।মনে পরে যায় উল্লাপারার পূর্নিমা রানী শীলের মায়ের কথা হায়নাদের আক্রমন থেকে সেদিন নিজের মেয়ের সম্ভ্রম ও রক্ষা করতে পারিনি জন্ম দাত্রী মা তার পর ও মেয়ের জীবন রক্ষায় হায়নাদের কে জোড় হাত করে বলেছিলেন ” বাবারা তোমরা একজন একজন করে যাও আমার মেয়েটা খুব ছোট ” । এই নির্যাতনকে তৎকালিন বিরোধীদল আওয়ামিলীগ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠন করার কাজে ব্যবহার করেছিল । পরবর্তীতে ২০০৮ এর সাধারণ নির্বাচনের আগে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতিও ছিল যে তারা নির্বাচিত হলে দেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের বৈষম্য ও নির্যাতন স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে । ঐ নির্বাচনে আওয়ামী জোট সরকার একক সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভার গ্রহন করলে ও নূন্যতম পরিবর্তন হয় নি আমাদের দেশের বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে ভাগ্যের বরং নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায় নতুন মাত্র যোগ হয় নির্যাতনে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের হোতা হিসেবে নাম চলে আসে সরকারের মন্ত্রী এমপি সহ রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের । ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে বৌদ্ধদের তথা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ধর্মপ্রতিষ্ঠান “রামু প্যাগোডা ” আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয় স্হানীয় আওয়ামীলিগ ও বিএনপি জামাতের কিছু উগ্র নেতারা । ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরদিন ও আমরা দেখেছি যশোহরের অভয়নগর থানার চাপাতলা গ্রামে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের উপর স্হানীয় সরকার দলীয় প্রভাবশালীদের হামলা ও নির্যাতনের চিত্র । মানুষের প্রত্যাশা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আওয়ামীলীগ সরকার এসব লুটারদের বিচার করবে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হত্যা নির্যাতন ও দখলের যথাযথ শাস্তি ব্যবস্হা করবে । কিন্তু আজ ও সেই প্রত্যাশা শুধু প্রত্যাশা ই রয়ে গেছে । কেন জানি মনে হচ্ছে বিচারের বাণী শুধু মাত্র নিভৃতে কাঁদছে ।

আজ ঘটনাক্রমে ই চলে এসেছে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার খিদিরপাড়া ইউনিয়নের পিংরাইল গ্রামের ও যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাশাপোল ইউনিয়নের হিন্দুসম্প্রদায়ের কথা । লৌহজং উপজেলার খিদিরপাড়া ইউনিয়নের পিংরাইলগ্রামে বেশ কয়েক টি হিন্দু পরিরারের বসতি যাদের মধ্যে প্রায় ৫৫৮ জন ভোটার। ইউপি নির্বাচন হোক আর জাতীয় নির্বাচন হোক সবসময় বলির পাঠা হয় এই হিন্দু পরিবারগুলো। গত ২৩ এপ্রিলের ইউপি নির্বাচনের আগে ও পরে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান ও মেম্বর প্রার্থীর রোষানলে পরে এখনকার হিন্দু পরিবার গুলি। আতঙ্কে ভয়ে দেশ ছেড়ে পারি জমাতে চাচ্ছে ভিন দেশে।খিদিরপাড়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহ নেওয়াজ মৃধা ও ফুটবল মার্কা মেম্বার প্রার্থী মামুন শেখের কর্মী সমর্থকরা একাধিক হিন্দু বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর, লুটপাট ও তাণ্ডব চালায়। এ সময় বাড়িঘরে থাকা নারী-পুরুষদের এলোপাতাড়ি মারধর করে এবং দেশছাড়া করার হুমকি দেয়। এ ঘটনা কৃষ্ণ পোদ্দার, সুদেব ঢালী, তাপষ পোদ্দার, দীন বন্ধু, রিপন মল্লিক, গনেশ রায়, মহাদেব সরকার, সাধনা রনী, গোবিন্দ রায় ও খগেন মল্লিকসহ বেশ কয়েক জন মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে বিছানায় কাতরাচ্ছে আর অনেকই বাড়ী ঘর ছেড়ে নানা জায়গায় আশ্রয় নিয়ে ভয়ে দিন যাপন করছে ।

যশোরের চৌগাছার পাশাপোল ইউনিয়নের ঘটনা ও এর ব্যতিক্রম নয় স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত চেয়ারম্যান শাহীন রহমান । শাহীন ও তার বাহিনীর অত্যাচারে এলাকার অন্তত ৩০টি হিন্দু পরিবার দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে। সংখ্যালঘু পরিবারের এক কিশোরীকে আটকে রেখে গণধর্ষণের ভয় দেখিয়ে তিন বিঘা জমি ও লিখে নিয়েছে শাহীন চেয়ারম্যান । এলাকার ত্রাস শাহীন ও তার বাহিনীর ভয়ে কারো ই মুখ খোলার সাহস নাই । জমি রাড়ী যাই যাউক জীবন তো বাঁচাতে হবে তাই শাহীন গংদের নির্যাতনে টিকতে না পেরে বাড়ীখালি গ্রামের মোহন, হাজারী, চণ্ডী, বিজয়, বাদল, নিখিল, গোপাল, প্রসেন, দীপক, নিতাই, পবিত্র, অজিতের তিন ছেলে, মহাদেব, শান্তিরামের ছেলে, বলয়, তুষার, তপন, কুশপদ, দীপক, বিমল সপরিবারে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে । এছাড়া বাড়ীখালি গ্রামের ধীরেন, রানীয়ালি গ্রমের পঞ্চানন বিশ্বাস, মালিগাতি গ্রামের জয়দেব ও বড়গোবিন্দপুর গ্রামের কার্তিক ও নাকি হয়েছেন ভিটে মাটি ছাড়া । লৌহজং কিং বা চৌগাছা নয় বরং সমগ্র বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্হা প্রায় একই ধরনের নির্বাচন হউক বা অন্যকোন অজুহাতে হউক আমাদের সমাজের ক্ষমতাধর একটি বিশেষ শ্রেনীর লোভের শিকার হতে হচ্ছে আমাদের হতদরিদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কে ।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর আমাদের এই অঞ্চলে অমুসলিমদের সংখ্যা ছিল ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ, স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা ১৪.৬ ভাগে এসে দাড়ায় অমুসলিম জনসংখ্যার হার আর ২০১১ সালের শুমারিতে বাংলাদেশে অমুসলিম জনসংখ্যা এসে দাড়ায় ৯.৬ ভাগে ।প্রতি দিন ই যেন বাংলাদেশ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকরা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে । অতি সম্প্রতি ” বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার পরিস্থিতি, জানুয়ারি-মার্চ ২০১৬ ” শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায় গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর কমপক্ষে ৭৩২টি নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমপক্ষে ৯ হাজার ৫৬৬, যা গত বছরের ছয় গুণেরও বেশি। এসব ঘটনায় ১০ জন নিহত, ৩৬৬ জন আহত, ১০ জন অপহূত, দু’জন জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত এবং গণধর্ষণের শিকার ৪ জনসহ ধর্ষিত হয়েছে ৮ জন। সংখ্যালঘুদের জমিজমা, ঘরবাড়ি, মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, দখল ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৬৫৫টি। ২২টি পরিবারকে দেশত্যাগের হুমকি দেয়া হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। কেবল এ নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমপক্ষে ৮ হাজার ২৫০।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে যুগের পর যুগ পার হয়ে যাচ্ছে অথচ আমাদের সমাজে থাকা সংখ্যায় অল্প মানুষ গুলি কেন নানা আক্রমনের শিকার হচ্ছে ? আমাদের রাষ্ট্র ,সংবিধান ও আইন কেন ই বা তাদের পাহারা দিতে ব্যার্থ হচ্ছে ? ঐ মানুষ গুলির পাশে দাঁড়ানোর কি কেউ নেই ? অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে যে মানুষ গুলি সারাদিন সভা সেমিনারে নানান কথা বলে ব্যস্ত সময় পার করছে বাস্তবে কি ঐ গুলি তাদের ফাঁকা বুলি না তাদের ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের ই ভিন্ন এক কৌশল ? সংখ্যায় অল্প ধর্ম ও জাতি মানুষ গুলি কখনো ই আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য কোন হুমকি হিসেবে আমি মানতে নাড়াজ ।তারা নিতান্ত ই গরীবি হালে দুবেলা দু মুঠো খেয়ে জীবন যাপন করছে তার পর ও কেন তাদের উপর নেমে আসে নানান নির্যাতনের খড়গ ? কেনই বা তাদের যতসামান্য সম্পত্তি ও নারীদের উপর হায়নাদের কু-নজর ? যে যেভাবেই দেখুন না কেন আমরা চাইবো না আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে কোন একটি মানুষ নির্যাতনের শিকার হউক কোন মানুষ ই জীবন রক্ষার জন্য চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি জমাউক কোন অজানা গন্তব্যে । এর জন্য আমাদের রাষ্ট্র, রাষ্ট্র পরিচালনা দায়িত্বে নিয়োজিত সরকার ও তার প্রসাশনের দায়িত্ব হবে অবশ্যই সে যেই ধর্মের বর্ণের বা জাতে ই হউক না কে প্রতিটি মানুষের জান মানের যথা-যথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা । তা হলেই আমরা মুক্তি যুদ্ধের চেতনার ধর্ম নিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো ।