ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

গেল ৭ মে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ ( ইউপি ) নির্বাচনের চতূর্থ ধাপ শেষ হলো । আগেই ভেবে ছিলাম চতূর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচন ও সুস্ঠ ও শান্তি পূর্ণ হবে না । হয়তো আনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন আমি আবার জ্যতিষ নাকি যে আগে ভাগেই ভেবে ফেললাম । না আমি জ্যতিষ ট্যতিষ এমন কোন টা নয় বা ঐ সবে আমি বিশ্বাসী ও না ।সকালের সূর্যের ভাব দেখে ই অনেকটা অনুমান করা যায় দিন টি কেমন যাবে । চলমান ইউপি নির্বাচনের তিন ধাপের নির্বাচন অবস্হা ও আমাদের নির্বাচন কমিশনের গরিমর্শী ভাব দেখে দেশের অনেক মানুষের মনে ও এমন ই ধরনার জন্ম নিয়েছিল বলে আমি বিশ্বাসী ।চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে দেশের ৪৬ জেলার ৮৮ উপজেলার ৭০৩ ইউপিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে তবে ৩৫ ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় চেয়ারম্যান পদে ভোটগ্রহণ হয়েছে ৬৬৮ ইউনিয়ন পরিষদে।

মামলা-হামলা ও ভয় ভীতি কারনে অনেক ইউনিয়ন পরিষদেই শাসক দলের প্রতিদ্বন্দী হিসেবে নাকি বিএনপির প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রই জমা দিতে পারেননি । যেসব ইউপিতে মনোনয়নপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি , সেসব আসনে পুনঃতফসিল ঘোষণা করে নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষনার দাবি আসছিল বিএনপি ।আমাদের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন বিএনপির সেই দাবি আমলেনেয়া তো দূরের কথা কোন পাত্তা ই দেয় নি । অথচ পার্বত্য একটি জেলায় শাসক লীগের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে না পারায় সেখানে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফল ও আমাদের স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিয়ে দেশের সাধারন মানুষের ও আমার মত তেমন কোন আকাংখা বোধ হয় এখন আর নেই ।তবে নির্বাচনে যে পরিমান রক্ত পাত আর জীবননাশ হচ্ছে তা অবশ্য গভীর ভাবে চিন্তার ও ভয়ের জন্ম দিয়েছে ।বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী চার ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এ পর্যন্ত জীবন দিতে হয়েছে দেশের ৮৪ জন মানুষকে যাদের ৪৫ জনই আওয়ামী লীগ সমর্থকা আর বিএনপির সমর্থক ৩ জন এছাড়া ইউপি মেম্বার নারী ও শিশু সহ সাধারন ভোটার মারা গেছেন ৩৬ জন। আর আহতের সংখ্যা তো প্রায় সাত হাজার ই ছাড়িয়েছে । এসব ঘটনায় নির্বাচন কমিশন সহ আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় অবর্তীন হয়েছেন ।নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতায় জীবনহানির তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রথম ধাপের নির্বাচনের আগে ই ১০ জন খুন হয়েছে প্রথম ধাপের নির্বাচনের দিন জীবন দিতে হয়েছে ১১ জনকে , প্রথম ধাপের নির্বাচনের পরের দিন থেকে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১১ জন, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ৯ জন, দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের পর থেকে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ১৭ জন এবং তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের দিন ৫ জন মারা যান।আর তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের পর দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় জীবন দিতে হয়েছে ২০ জন কে ।জানিনা পৃথিবীর কোন সভ্য সমাজ আদৌ মৃত্যুকে সংখ্যায় বিবেচনা করে কি না ? আমরা কিন্তু কোন সহিংসতায় কত জন খুন হলো তার ভিত্তিতেই সহিংসতার মাত্র নির্নয় করি । আমাদের সরকারের কর্তাব্যাক্তিরা নির্বাচন ঘিরে হানা হানিতে প্রান হানির ঘটনাকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা সেই সাথে ব্যাক্তি গত শত্রুতার জের বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ।

পূর্ববর্তী বছরের ইউপি নির্বাচনের চেয়ে এ বার নির্বাচনে সহিংসতার বৃদ্ধির মূল কারন হিসেবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের অভিমত ই হলো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন । বেশির ভাগ প্রার্থীর ই ধরনা প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরযুক্ত প্রত্যয়ন পত্র পেলে নির্বাচনে জয় আর ঠেকায় কে ? এই ধারনার বাস্তবতা ও আমরা দেখছি । ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য নানা দলের তৃণমূল নেতারা টাকার ব্যাগ কাধে নিয়ে ছুটছে আওয়ামীলিগের মধ্যম থেকে শুরু করে বড় বড় নেতার বাসা কিংবা অফিসে হাসিল করে নিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর যুক্ত দলীয় মনোনয়ন পত্র । এতেই অওয়ামিলীগের তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী নেতাদের ভিতর যে ক্ষোভ আর হতাশা জন্ম নিয়েছে সেই ক্ষোভ আর হতাশাকে পূজি করেই অওয়ামিলীগের তৃণমূলের অনেক ত্যাগী নেতা দলের হাইকমান্ডের আদেশ অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীতা করার কারনেই আওয়ামী কর্মীদের জীবন নাশ হয়েছে বেশি । আর ভোট কেন্দ্র দখলের যে চিত্র আমরা উপোভোগ করছি তাতে মনে হচ্ছে প্রত্যেক টি ইউনিয়ন পরিষদ যেন এক একটি মাগুরা । অধিকাংশ কেন্দ্রে চলছে দখল, জাল ভোট ও সিল মারামারির মহাষোৎসব । প্রহসনে এই তৃণমূল নির্বাচনে সরকার ও নির্বাচন কমিশন নতুন বিস্ময়কর কিছু ঘটনার ও জন্ম দিয়েছে ।সংবাদ পত্রের সংবাদ অনুযায়ী তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বেলছড়ি ইউপিতে সর্বোচ্চ প্রদত্ত ভোটের হার দেখানো হয়েছে ১৯৬ শতাংশ আর নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার চন্দননগর ইউপিতে ভোট পড়েছে ১০৭ শতাংশ ।আবার অনেক ইউনিয়নে শতভাগ ভোট পরার খবর ও আমরা শুনেছি । মৃতব্যক্তি বা প্রবাসি কারো ভোট ই বাকী থাকেনি সব ব্যালটেই সীল পরেছে ।কোন এক ভোট কেন্দ্রে সদ্য মারা যাওয়া এক মহিলার স্বামীকে কৌতুকের শুরেই বলতে শুনাগেছে ” যারে নিয়ে এত দিন সংসার করলাম সে বোধ হয় আমার চেয়েও আমাদের ইউনিয়নের অওয়ামিলীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীকে ই বেশি ভাল বাসতো তাইতো মরার পরে ও উনারে ভোট দিতে কবর থেইকা উইঠা আসছে ” ! এমন ভোটচিত্রের পরও নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের কর্তাব্যক্তিরা গর্বের সাথে বলে ই চলেছেন যে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নাকি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে।

নির্বাচন যেমনই হোক, এতে লাভ-ক্ষতি কী হচ্ছে এসবের কোনো হিসেব স্বাভাবিক ভাবেই আমরা সাধান মানুষ তেমন করিনা বা করছি ও না ।গাও গ্রামের এ নির্বাচনে তথাকথিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধরা আমাদের সাধারন মানুষের প্রত্যাশা কতটুকু পুরন করতে স্বার্থক হবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন । তবে এই নির্বাচনে নির্বাচন কেন্দ্রিক হানা হানিতে যে খুন খারাপি হচ্ছে তাতে আমরা সবাই আজ চিন্তিত আমাদের মনের ভিতর ভিতর জন্ম নিচ্ছে নানান আতংকের ।তবে আমরা অন্তত্য এতটুকু আশা করবো যে নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রতিটি খুনা খুনি , হানা হানি সহ প্রত্যেকটি অঘটনের ই সুষ্ঠ তদন্ত করে আসল দোষীদের আইনের আওতায় এনে উচিত বিচার করবে সংশ্লিষ্টরা । তানা হলে তৃনমূল পর্যায়ের এ নির্বাচনে সহিংসতার জের সত্যিকার অর্থেই ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্ম দিবে ।সহিংসতায় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে নির্বাচনী সহিংসতা থেকে জন্ম ব্যক্তিগত আক্রোশ ভবিষ্যতে নতুন নতুন সহিংসতার জন্ম দিবে আরো অনেক মানুষে জীবনহানি ঘটবে । যা আগামীতে আমাদের আইন শৃংখলা , নির্বাচনী সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাড়াবে ।