ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আমাদের দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে সব সময়ই লুকোচুরি খেলা হয়েছে। যেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে হউক রাজনৈতিক দল বা সামরিক সরকার সবাই কেন জানি এই ধর্মীয় জঙ্গিবাদের বিষয়টি লুকিয়ে রেখেছেন না হয় ধামা চাপা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এতে কারোই শেষ রক্ষা হয় নি বরং তাদের এই ধামাচাপায় ধর্মীয় উগ্র জঙ্গিরা দানব হয়ে আর্বিভূত হয়েছে।

বাংলা ভাইয়ের কথা সম্ভবত আমরা কেউ ভুলে যাইনি। বিএনপি-জামাত জোটের ক্ষমতা আমলে বাংলা ভাইয়ের তান্ডব নিয়ে যখন প্রায় সমগ্র মিডিয়াই হৈ-চৈ তখনই তৎকালীন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বলে বসলেন বাংলা ভাই ইংলিশ ভাই বলতে কেউই নাই সবই মিডিয়ার সৃষ্টি। অবশ্য পরে সমগ্র জাতিই বাংলা ভাই ও গুরু শায়েখ আব্দুর রহমানের অনুসারিদের তন্ডব উপোভোগ করেছে। আদালত থেকে সিনেমা হল কোথাও তো বাদ যায়নি তাদের হমলা। চা ওয়ালার চায়ের ফ্লাক্স দেখেও পুলিশকে জীবন রক্ষার জন্য পালাতে দেখেছি। এরপর আবার বাংলাভাইকে গ্রেফতার করে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় এনে বিচারের মুখোমুখি হতেও আমরা দেখেছি। অবেশেষে বাংলা ভাই ইংলিশ ভাইরা আর মিডিয়ার তৈরি কোন কাম্পনিক চরিত্রে থাকেনি।

বর্তমান সময়ে একটি বৈশ্বিক হুমকির নাম আইএস। বছর খানেকের মধ্যে এশিয়া ইউরোপ আফ্রিকা সহ বিশ্বের বড় বড় হামলায় প্রানহানির দায় স্বীকার করে নিয়েছে এই ভয়ংকর জঙ্গি গোষ্ঠি এমন কি আমাদের দেশে ও ব্লগার, শিক্ষক, বিদেশী নাগরিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব সহ প্রায় সকল হামলা ও খুনের দায় স্বীকার করে নিয়েছে আইএস; কখনো বা আল-কায়দা। সব শেষ গুলশান ট্র্যাজেডির দায়ও সাথে সাথে স্বীকার করে নিয়েছে আইএস। এমন কি উদ্ধার অভিযানের আগেই হামলার দিন ভোর রাতেই আইএস তাদের টুইটারে হামলার বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করেছে। অবশ্য আমাদের সরকারও আইন শৃংখলা রক্ষাকারি বাহীনির কর্তাব্যক্তিরা এটাকে বাংলাভাইয়ের গুরু শায়েখ আব্দুর রহমানে জঙ্গি সংগঠন জেএমবির কাজ বলে স্বীকার করে নিয়েছেন।

বাংলাদেশে আইএস আছে আইএস নেই এমন বির্তক চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশানে ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলাকে হত্যার দায় স্বীকারের মধ্য দিয়েই এ বির্তকের শুরু। আমাদের দেশে গত ১৮ মাসে ৬২টি হামলা ও ৭৮ জন খুন হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৭টিতে আইএস ও ৭টিতে একিউআইএস বা আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা তাদের দায় স্বীকার করে নিজস্ব ইন্টারনেট ফোরামে বিবৃতি দিয়েছে। যদিও আমাদের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা শুরু থেকেই দেশে আইএস বা আল-কায়েদা অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসছেন এবং এ ধরনের ঘটনাকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র বলেই প্রচার করে আসছেন। বিগত কয়েক মাসে আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনা গুলি আইএস বা আল-কায়েদা যারাই ঘটাউক না কেন তবে এটা যে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র এটা বাস্তব।

একটি স্বাধীন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন গনতন্ত্র যখন দূর্বল হয়ে পরে তখন সেখানে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি অপশক্তি মাথাচারা দিয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ জাতীয় নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী যে সহিংসতা হয়েছে তার থেকেই জঙ্গিরা বিশেষ উৎসাহের যোগান পেয়েছে। অবশ্য তার আগে মানবতাবিরোধীদের বিচারের রায়কে কেন্দ্র করে যে নারকীয় তান্ডব হয়েছে সেখান থেকেও জঙ্গিরা কম উৎসাহ পায় নি। আমাদের সরকার ও প্রশাসনের কর্নধাররা তখন অবশ্য জঙ্গিবাদের এ বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে ক্ষমতা পাকা পোক্তের ব্যপারেই বিশেষ মনোযোগি ছিলেন, আর তাতেই এই অপশক্তি বিশেষ শক্তি যোগার করেই মাঠে নেমেছে।

আজ যাদের নাম বা যে সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের নাম জঙ্গি সম্পৃক্ততায় এসেছে ২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার পর থেকে প্রতিটি অঘটনের পরেই এদেরই সম্পৃক্তটার কথা আমরা শুনেছে। পূর্বের প্রতিটি অঘটনকে সরকার ও আইন শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনী যদি কথা আর বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতো তা হলে আমাদেরকে গুলশান বা শোলাকিয়ার ট্র্যাজেডি দেখতে হতো না। আমাদের সরকার ও আইন শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর এ কথাটা খেয়াল রাখা উচিত ছিল যে ছোট ছোট ভূমিকম্পনই না কি বড় ধরনের ভূমিকম্পের আভাস দিয়ে যায় ।

সম্প্রতি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব মাহমুদ আলী এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কোন এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন “আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, ওই ঘটনায় কোনোভাবেই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে এ অপশক্তিকে প্রতিহত ও পরাজিত করতে হবে। এজন্য এক বাক্যে সব বন্ধুপ্রতিম দেশ বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছেল।” আমি জানিনা কিসের ভিত্তিতে মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় বলেছেন আর্ন্তজাতিকভাবে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আমরা জানি বর্তমান পাকিস্তানসহ আন্যান ধর্মীয় উগ্র জঙ্গিদের দ্বারা আক্রান্ত দেশ গুলির বর্তমান অবস্থা। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে আমরা ফ্রান্স বা আমেরিকার সমকক্ষ নই তাই ফ্রান্স বা আমেরিকার হামলার পরে আর্ন্তজাতিক ভাবে যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে আমাদের ক্ষেত্রে কিন্তু তার উল্টা হওয়াই স্বাভাবিক। গুলশান হামলা আমাদেরকে নানাভাবে আতংকিত করেছে চিন্তিতও করেছে; বিশ্ববাসীর কাছে হয়েছি মাথা নত। এ ক্ষত পুরো জাতিকেই বহন করতে হবে।

তবে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আজ যারা নিয়োজিত তারাই পারেন আমাদের এই কলংকের হাত থেকে উদ্ধার করতে। ধর্মীয় উগ্রবাদ তথা জঙ্গিবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ তারা আমাদের যে গোজামিলের মধ্যে রেখেছেন তার থেকে তাদের অবশ্যই বেরিয়ে এসে জঙ্গি দমনে আন্তরিক হয়ে দেশ ও জাতির মান সম্মান ও অস্তিত্ব রক্ষায় যা যা করনীয় তাই করতে হবে। এ জন্য আমাদের সাধারণ মানুষের সাহায্য ও সমর্থন সব সময়ই তাদের সাথে থাকবে। কারন এ দেশ আমার এ দেশ আপনার এ দেশ আমাদের সকলের- তাই এর অস্তিত্ব রক্ষায় আমরা সর্বদায়ই সজাগ।