ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

রিকশা চালক করিম হোসেন রাজনীতি কি জিনিস মনে হয় না বোঝে? বন্ধুদের সাথে চায়ের আড্ডায় হয়তো মাঝে মাঝে রাজনিতীর বিতর্কে জড়িয়ে যান। জীবন জীবিকার প্রয়োজনে রোদ বৃষ্টি শীত গরমে রিকশা নিয়ে ছুটতে হয় রাজধানীর গলি থেকে রাজপথে। করো সাথে কোন দ্বন্দ বা শত্রুতা আছে কিনা তা হয়তো নিজেও জানেন না তারপর বুলেটের আঘাতে আহত হতে হয়েছে রিকশা চালক করিম হোসেনকে। নিজের গতর খাটানো পরিশ্রমের মজুরী দাবী করলে নিজের রিকশার মাতাল যাত্রীর লাইসেন্স করা অস্ত্রের বুলেটের আঘাতেই মাটিতে লুটিয়ে পরতে হয় করিমকে। তবে ঐ যাত্রী আর কেউ নন বর্তমান ক্ষমতাশীন দল আওয়ামীলিগের অঙ্গ সংগঠন আওয়ামীযুবলীগের স্হানীয় নেতা বনানী থানা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ইউসুফ হোসেন সোহেল।

ঘটনার সময় সোহেল ও তার সাথে থাকা বন্ধু দুই জনই নাকি ছিলেন মাতাল। তবে সোহেল মাতাল থাকলে কি হবে তালে কিন্তু ঠিকই ছিলেন। ঘটনা ঘটিয়ে সাথে সাথেই বনানী থানায় গিয়ে ছিনতাই কারীর কবলে পরে নিজের আত্মরক্ষার জন্য নিজের লাইসেন্সকরা অস্ত্রের গুলি ব্যবহার করেছেন বলে সাধারন ডাইরী করতে ভুলেন নি। আহত রিকশা চালক সাধারন মানুষের সহযোগিতায় চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পর নিজেই বাদী হয়ে বনানী থানায় মামলা দায়ের করেন। কিছু সংবাদ মাধ্যমের চিল্লা চিল্লির পর আমাদের আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহীনির কিছুটা টনক নড়ে এবং তারা বনানীর একটি হোটেল থেকে সোহেলকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তবে আমাদের আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহীনির সক্ষমতা শেষ পর্যন্ত সোহেলের ক্ষমতার কাছে হারমানতে বাধ্যহয়। সোহেলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিতে চাইলেও পায়নি পুলিশ কারণ মামলার বাদী রিকশাচালক করিম হোসেনের অনাপত্তিতে ঢাকার হাকিম আদালত সরকার সমর্থক এই সংগঠনটির নেতাকে জামিন দিতে বাধ্যহয়।

রিকশাচালক করিম হোসেনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাউরা গ্রামে জীবিকার প্রয়োজনে থাকেন রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তিতে আর রিকশাও চালান গুলাশান বনানী এলাকায়। কোন মানুষের নিজের জীবনের প্রতি যখন কোন আঘাত বা হামলা আসে তখন সে চায় জীবনের শেষ শক্তি টুকু দিয়ে সেই হামলাও হামলাকারিকে প্রতিহত করতে এবং হামলাকরি যদি আইনের আওতায় আসে তবে সে চাইবে অবশ্যই হামলাকারির উপযুক্ত বিচার হউক। তবে রিকশা চালক করিম হোসেন কেন তার উপর হামলাকারির বিচার চাইলেন না? কেন রিকশাচালক করিম আদালতে দাঁড়িয়ে আসামির জামিনের ক্ষেত্রে তার অনাপত্তির কথা জানালেন? করিম হোসেন নেহায়েত গরীব রিকশা চালক আর ইউসুফ সরদার সোহেলকে ক্ষমতাশীনদের সহযোগি হিসেবে এলাকার ত্রাস হিসেবেই চিনেন সবাই। করিম হোসেনও যেহেতু সোহেলের রাজত্বেরই একজন প্রজা তাই করিম ভাল করেই বুঝেছেন জলে বাসকরে কুমিড়ের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা মোটেও সম্ভব নয়। করির হোসেন ভালই ভালই আদালতে দাড়িয়ে সোহেলের জামিনে তার অনাপত্তির কথা আদালতকে জানিয়ে দিয়ে নিজের ও পরিবার পরিজনের জীবন কোন মতে রক্ষা করছেন।

এর আগেও আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনির কান্ড। ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল রাতে নিউ ইস্কাটন রোডে রনি নিজ গাড়ি থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন। এতে রিকশাচালক হাকিম ও অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ এপ্রিল হাকিম এবং ২৩ এপ্রিল ইয়াকুব মারা যান। ২০১৫ সালের ১৫ এপ্রিল রমনা থানায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে মামলা করেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২৪ মে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৩১ মে এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে রনিকে আটক করেন। ঐ ঘটনায়ও আমারা দেখেছি রনি মাতাল অবস্হায় নিজের মায়ের সংসদ সদস্যের স্টিকা লাগানো গাড়ি ও লাইসেন্স করা অস্ত্র ব্যবহার করেই হত্যা করেন দুই দুই জন সাধারন খেটে খাওয়া নিরীহ মানুষকে। হাকিম ও ইয়াকুব হত্যার মামলা এখন আদালতে বিচারাধীন। জানিনা হাকিম ও ইয়াকুব হত্যার মামলা বিচার কোনদিকে গড়াবে?

সাতক্ষীরার বহুল আলোচিত মহিলা সংসদ সদস্য ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী রিফাত আমিনের ছেলে রাশেদ সারোয়ার রুমন এলাকার এক আতংকের নাম। মায়ের ক্ষমতা ও দাপট কে কাজে লাগিয়ে এমন কোন অপকর্ম নাই যে না করেছে রুমন। গত রমজান মাসে সাহেব আলী নামের এক গরু ব্যবসায়ীকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করার অভিযোগ আসে রুমনের বিরুদ্ধে। গত রমজান মাসে সাহেব আলী নামের এক গরু ব্যবসায়ীকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করার অভিযোগ আসে রুমনের বিরুদ্ধে। তার কিছুদিন আগে তার মায়ের ব্যবহৃত জাতীয় সংসদের স্টিকারযুক্ত গাড়িতে তিন তরুণীকে নিয়ে অস্ত্রসহ শ্যামনগরের একটি রিসোর্টে ধরা পড়ে বেশ কিছুদিন কারাগারেও থেকে এসেছিলেন রুমন। গত ১১ সেপ্টেম্বর এক আওয়ামী লীগ নেতাসহ চারজনকে মারপিট করে আবার সংবাদ শিরোনাম হয় রুমন। ওই রাতেই রুমন আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলো। পরে জানা যায়, পালানোর সময় গাড়ি নিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন‌্য পরিচিত রুমন। তখন শহরের মাগুরার বউ বাজারের বাঁশতলার সোনা চোরাচালানী মিলন পাল নামে একজনের বাগানবাড়িতে ওঠে রুমান। পরদিন ওই বাগানবাড়িতে আড্ডা দেওয়ার সময় গ্রামবাসী বাড়ি ঘিরে মারধর করে রুমনকে। পরে আওয়ামী লীগ নেতারা গিয়ে তাকে জনরোষ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। অবশেষে যুবলীগ নেতা জুলফিকার আলী উজ্জ্বল ও ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বুলেটের করা দুটি চাঁদাবাজির মামলায় ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ গ্রেপ্তার করা হয় রুমনকে। জুলফিকার আলী উজ্জ্বলও যেহেতু বর্তমান ক্ষমতাশীন দলেরই একটি অঙ্গসংগঠনেরই নেতা সেই সুবাদেই রুমন কে হয়তো কয়েক দিন পুলিশ হেফাজতে সরকারী খানা খেতে হতে পারে।

তবে সবচেয়ে আতংক ও ভয়ের ঘটনা ছিল টাঙ্গাইল-৩ আসনের সাংসদ আমানুর রহমান ওরফে রানার ঘটনা। আমানুর রহমান রানা টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী খান পরিবারের জ্যেষ্ঠ কর্তাব্যক্তি। তাঁর ভাই ও সন্তানেরাও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত। এই পরিবারের বিরুদ্ধে গত ২৫ বছরে হত্যা মামলা সহ ৫০টি বিভিন্ন মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে আমানুর একাই ৪৬টি মামলায় অভিযুক্ত। সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ হত্যাকাণ্ডের পর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে তাঁর ও তাঁর ভাইদের নাম আসে। রানার ৪৬ মামলার মধ্যে ৪৪টি থেকে অব্যাহতি এবং একটি স্থগিত রাখার ব্যবস্থা করতে পেছেন ইতোমধ্যে। তবে আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ হত্যাকাণ্ডের মামলা থেকে অনেক চেষ্টার পরও অব্যাহতির ব্যবস্হা করতে পারেন নি। যিনি হত্যাসহ ৪৫টি বিভিন্ন ধরনের মামলার বিচার এড়াতে পেরেছেন, তাঁর শক্তি ও ক্ষমতার বিষয়টি সবারই অনুমান করা সম্ভব। তবে এবার ২২ মাস পলাতক থাকার পর সেপ্টেম্বর ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তাঁকে খুনের মামলায় কারাগারে যেতে হয়েছে। অবশ্য পলাতক অবস্থায়ও নিজের সংসদ সদস্য পদ রক্ষাকরার জন্য অন্তত দুবার জাতীয় সংসদে হাজিরা দিতে আসেন সাংসদ রানা।

গত ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর গাইবান্ধা-১ আসনের সাংসদ মনজুরুল ইসলাম মাতাল অবস্হায় গুলিছোড়ে আহত করেন সুন্দরগঞ্জ গোপাল চরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শিশু শাহাদাত হোসেনকে। পরে সাড়া দেশে এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে সাংসদ মনজুরুল ইসলামকে গ্রেফতার করেন আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী যদিও ঐ ঘটনায় বেশি দিনে জেলে থাকতে হয়নি সাংসদ মনজুরুলকে।

আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সহ নানা শক্তি নানা ভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভার গ্রহন করেছেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাভার গ্রহনকারীদের মধ্যে কোন কোন স্বার্থান্বেসী ক্ষমতার দাপট ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে খুন ধর্ষন রাহাজনি দখল বাজি সহ নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকে। কখনো কখনো ঐ সব স্বার্থান্বেসীদের দাপটের কাছে জিম্মি অসহায় বোধ করে আমাদের আইন শৃংখলা রক্ষাকারি বাহীনি, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি সহ নিজ দলের শীর্ষ স্হানীয় নেতারা। কখনো কখনো ঐ স্বার্থান্বেসীদের দিয়ে কিছু বারতি সুবিধা আদায় করে নেয় কিছু আইন শৃংখলা রক্ষাকারি বাহীনি, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি সহ দলীয় কিছু অসাধু নেতারা। এতেই তাদের দৌড়ত্ব ও অত্যাচার বেড়ে যায় বহু অংশে। আমারা চাইবো বর্তমান আওয়ামী জোট সরকারের সময় ঘটে যাওয়া এ ধরনের ঘটনা গুলি অবশ্যই নিরপেক্ষ ভাবে তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্হা করে দেশে আইনের শাষন প্রতিষ্ঠার প্রমান রাখবে।