ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরায় প্রচারিত একটি সংবাদের ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। আর এই ভিডিও ফুটেজই আমাদের বিবেকের ভিতর আমাদের অন্তরের ভিতর নতুন করে যন্ত্রণার জন্ম দিয়েছে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লীর উচ্ছেদের ঘটনায় গত ৬ নভেম্বরের পর থেকেই সাড়া দেশে তুমুল প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। নড়ে চড়ে বসেছিল জাতির বিবেক। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে চিনিকলের জন্য অধিগ্রহণ করা বিরোধপূর্ণ জমি থেকে কয়েকশ সাঁওতাল পরিবারকে গত ৬ নভেম্বর তাদের বাড়ি ঘড় থেকে উচ্ছেদ করা হয়। সে সময় সংঘর্ষ বাঁধে এবং সাঁওতালদের বাড়িঘরে লুটপাট, ভাংচুরের পর অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঐ সংঘর্ষে জীবন দিতে হয়েছে শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামের তিন জন সাঁওতালকে। আহত হতে হয়েছে কয়েক শত সাঁওতাল সহ বেশ কয়েক জন পুলিশ সদস্যকে।

সাঁওতালদের বাড়িঘরে লুটপাট, ভাংচুর অগ্নিসংযোগের পর সাঁওতাল সহ স্থানীয়রা অভিযোগ করে আসছিল পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা তাদের বাড়িঘরে লুটপাট, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। অগ্নিসংযোগে পুলিশের সম্পৃৃক্ততার কথা এটা কারোরই তেমন বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি। সবারই ধারণা ছিল হয়তো পুলিশের উপস্থিতিতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ও তাদের সহযোগীরা সাঁওতালদের বাড়িঘরে লুটপাট, ভাংচুর অগ্নিসংযোগ করেছে। পুলিশও বলে আসছিল, ‘আগুন লাগার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়েছে। আগুনের পাশে হয়তো পুলিশকে দেখা যেতে পারে। কারণ পুলিশ আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছে। এবং পুলিশ দমকল বাহিনীকে ডেকেছিল।’ আমরাও পুলিশের সেই কথায় বিশ্বাস রেখেছি।

কিন্তু আল জাজিরায় প্রচারিত সেই সংবাদ আমাদের সব বিশ্বাস ও ধারণাকে পুরো উল্টা-পাল্টা করে দিয়েছে। এ কি দেখলাম আল জাজিরার সেই সংবাদের ভিডিওতে? খোদ আমাদের পুলিশকেই দেখলাম উচ্ছেদের নামে আমাদের নিরীহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দিতে! স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন শুধু সাঁওতালরাই নয় যে কোন মানুষই বৈধ বা অবৈধ ভাবে যেখানেই বসতি গড়ে তুলুক না কেন কাউকে উচ্ছেদ করতে হলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই উচ্ছেদ করতে হবে। সাঁওতালদেরকে চিনিকলের খামারের জমি থেকে উচ্ছেদের প্রক্রিয়ায় কি যথাযথ আইনের মাধ্যমে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হয়েছিল সেটাই একটা বড় প্রশ্ন?

১৯৫৬ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গাইবান্ধার গোবিন্ধগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি মহিমাগঞ্জ সুগার মিলের জন্য অধিগ্রহণ করে যা সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম নামে পরিচিত। জমি অধিগ্রহণের ফলে মহিমাগঞ্জের ১৫টি আদিবাসী গ্রাম এবং ৫টি বাঙালি গ্রামের আধিবাসীদের উচ্ছেদ করা হয়। অধিগ্রহণের চুক্তিতে অনুযায়ি অধিগ্রহণকৃত জমিতে আখ চাষ করা হবে তবে আখ চাষ করা না হলে এসব জমি পূর্বের মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। অধিগ্রহণের পর বেশ কিছু জমিতে আখ চাষ করা হয়। চাষকৃত আখ দিয়ে চিনি ও উৎপাদন করা হয়। কিন্তু চিনিকল কতৃপক্ষের দুর্নীতি, অব্যবস্থার ও নানা অনিয়মের কারণে ২০০৪ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরে নানা সময়ে চলে করখানা খোলা আর বন্ধের খেলা ।

তবে সবচেয়ে মজার ও আশ্চর্যের বিষয় হলো চিনিকল কর্তৃপক্ষ পূর্বের চুক্তি ও নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করেই অধিগ্রহণকৃত জমি বহিরাগত বিভিন্ন প্রভাবশালীদের কাছে ইজারা দিতে শুরু করে। অধিগ্রহণের চুক্তি লঙ্ঘন করে আখের চাষের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে ধান, গম, সরষে সহ অন্যন ফসলাদির চাষাবাদ শুরু করে দখল করীরা। বিভিন্ন সময় পিতা মাতার ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষেরা বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেন। এমনি কি আন্দোলনে ও পর্যন্ত নামেন জনগণের আন্দোলণের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম এলাকা সরেজমিনে তদন্ত করেন। তদন্তে তিনি সেখানকার জমিতে আখের পরিবর্তে অন্য ফসলের আবাদ দেখতে পান। এর পর থেকে ই নিজেদে ভিটেমাটি ফেরত পারার আন্দোলনে নামেন উচ্ছেদ ও মানুষেরা। আন্দোলনের অংশ হিসেবে উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতাল আদীবাসিরা ২০১৫ সালে সেখানে বসতি স্হপন শুরু করেন। আর ৬ নভেম্বর ২০১৬ সেও সব বসতি উচ্ছেদের নামে আমরা দেখছি ইতিহাসের এক অমানবিক অসভ্যবতা। এটাই ছিল মহিমাগঞ্জের ঘটনার সারসংক্ষেপ।

৬ নভেম্বরের ঘটনার পর সমগ্র দেশের বিবেকবান মানুষ যখন ফুঁসে উঠে তখনই অবস্থার সামাল দিতে সরকার ও তার প্রশাসন কিছু আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আইনী ব্যবস্থার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ইতোমধ্যে সেই তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে স্থানীয় এমপি, ইউএনও ও ইউপি চেয়ারম্যানসহ আরও অনেককে ই দায়ী করা হয়েছে। সাঁওতালদের দায়ের করা মামলায় ও ওই সব ব্যক্তিসহ ৩৩ জন আসামি করা হয়েছিল। কিন্তু আল জাজিরার সংবাদের ভিডিওতে যেই পুলিশকে সাঁওতালদের বাড়ি ঘড়ে আগুন দিতে দেখা গেল সেই পুলিশের নাম কেন সাঁওতালদের দায়ের করা মামলায় আনা হলো না? আগে থেকেই পুলিশের হামলা-মামলায় বিপন্ন সাঁওতালরা এর পর তাদের রয়েছে খাদ্য আর সাহসের অভাব। তাই স্বাভাবিক ভাবে সাঁওতালদের দায়ের করা মামলায় পুলিশের নাম না আসাটাই বাস্তব। কিন্তু তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে এমপি, ইউএনও ও ইউপি চেয়ারম্যানসহ আরও অনেককে ই দায়ী করা হলো অথচ সেখানে পুলিশের নাম গন্ধ পর্যন্ত ও এলো না। তবে কেন কার স্বার্থে পুলিশকে রক্ষা করলো সরকারের গঠন করা তদন্ত কমিটি? যদিও দেশের সর্বোচ্চ আদালত গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ সুপারকে তলব করেছেন তদন্ত প্রতিবেদনের একটি শব্দ ব্যবহারের জন্য। শব্দটি হলো— “বাঙালি দুস্কৃতকারী”। ইতোমধ্যে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ সুপারকে আগামী ২ জানুয়ারী সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখা দিতে বলা হয়েছে।

আল জাজিরায় প্রচারিত সংবাদ আমাদের ইতোমধ্যে ভীত করেছে আতংক ও আশংকার জন্ম দিয়েছে মনের ভিতর। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন কি ছিল আল জাজিরায় ঐ ভিডিওতে? আল জাজিরায় ঐ ভিডিওতে আমরা দেখেছি দাঙ্গা পুলিশের ২৫-৩০ সদস্যের একটি দল রাস্তা ধরে সাঁওতালদের বসতির দিকে টর্গেট করে গুলি করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছেন। এক পর্যায়ে কয়েকটি বাড়ির সামনে পুলিশ সদস্যদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের সঙ্গে সাদা পোশাকধারী দুই পুলিশ সদস্যকেও দেখা গেছে। একজন সাদা পোশাকধারী পুলিশ আগুন লাগায়। তাকে পোশাকধারী এক দাঙ্গা পুলিশ সাহায্য করে। মুহূর্তেই দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সেখান থেকে আগুন নিয়ে সাঁওতালদের অন্যান্য ঘরেও তা দেওয়া হয়। ভিডিওতে একটা পর্যায়ে গোটা পল্লীতে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায়। আর পুলিশের সদস্যরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা দেখছে। তাদের সামনেই ঘরগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পুড়ে শেষ হয়ে যায় সাঁওতালদের মনের ভিতর লুকয়ে থাকা হাজারো স্বপ্নের। ঐ হামলায় আজ সহায় সম্বল ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে শত শত সাঁওতাল পরিবার।

শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থান হলো মায়ের কোল আর দেশের সাধারণ নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়স্থান হলো পুলিশ। অর্থাৎ একটি জাতিকে শান্তিতে ও নিরাপদে রাখাই হলো সে দেশের পুলিশ তথা আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারি বাহীনির দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু আমাদের পুলিশ বাহিনী তাদের সেই কর্তব্য কতটুকু যথাযথভাবে পালনে স্বার্থক হয়েছে? আমাদের পুলিশ সহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহীনির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ আমরা প্রতিনিয়ত ই শুনে আসছি। বরাবরই ঐ সব অপকর্মের ঘটনার পর আমরা বলে থাকি একটা বিশাল বাহীনিতে দুয়েক জন খারাপ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছুই না। আর এটাই বাস্তব সত্য। কিন্তু গাইবান্ধার গোবিন্ধগঞ্জের ঘটনায় আমরা যা দেখেছি তা কোন ভাবেই পূর্বের নানা অপকর্মের সাথে তুলনা করা যায় না। এখানে দুয়েক জন পুলিশ সদস্য গোপনে এমনটি ঘটায় নি ২৫-৩০ সদস্যের একটি দল এক হয়ে একটি নিরীহ গরীব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসত বাড়িতে আগ্নি সংযোগ করেছে যা দেখে আমাদের বার বার একাত্তরের পাক হায়নাদের অত্যাচারের কথা, মনে করিয়ে দেয় মানে করিয়ে দেয় আমাদের পাশের দেশ মিয়ানমারের ঘটনা। যেখানে একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রাদায় কে নিধনের জন্য সেনাবাহিনী সহ সেখানকার ধর্মীয় সংখ্যাগুরু মৌলবাদীরা আদাজল খেয়ে লেগেছে। চালাচ্ছে ধর্ষণ বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ সহ গণহত্যা।

সাঁওতালদের বীরত্বের কথা আমাদের সবারই জানা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগেই ছিল সাঁওতালরা। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন শুরু হওয়া আর ১৮৫৬ সালের নভেম্বর শেষ হওয়া স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দাদন বিরোধী আন্দোলনে সিধু, কানু, চাঁদ আর ভৈরব সহ দশ হাজার সাঁওতাল জীবনের বিনিময় দাবি আদায় করে ছিল। একাত্তরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে দিনাজপুরে এক হাজার সাঁওতালের সমন্বয়ে গড়ে তুলে ছিল মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধে সাঁওতালসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৬০২ জন শহীদ ও হয়েছেন। বীরাঙ্গনা হিরামনি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের চা শ্রমিকদের মধ্যে প্রথম নারী যিনি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন তিনি ও সাঁওতাল সম্প্রদায়েরই ছিলেন। এত শত অবদানের পরও বার বার নানা ভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন আমাদের দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা।

একটি কথা মনে রাখতে হবে মহান মুক্তি যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধে যেমন সবারই অবদান ছিল ঠিক তেমন এখন সবার অধিকারকেই সমান ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাই গাইবান্ধার গোবিন্ধগঞ্জে সাঁওতালদের ভিটেমাটিতে অগ্নিসংযোগ ও হত্যা সহ যারাই জড়িত তাদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতান এনে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে বাস্তবায়িত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

লেখক: ওয়াসিম ফারুক, কলামিস্ট।