ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

২০১৫ সালের অক্টোবর মাস ও তার পরবর্তী কিছু সময় দেশের সমস্ত মিডিয়া ও রাজনীতি গরম ছিল গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে নিয়ে। সাংসদ লিটন সমালোচিত হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত জনদাবির মুখে, জেলেও গিয়েছিলেন তারই নিজের এলাকার ছোট্ট শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভকে গুলিকরে আহত করার জন্য। আর ২০১৬ সাল আমাদের বিদায় হলো সেই সাংসদ লিটনের ইহকাল বিদায়ের মধ্যদিয়ে দিয়েই।

মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগেরই নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তারপরও দুর্বৃত্তের হাতে জীবন দিতে হলো তাকে এটা আজ যেমন দেশের মানুষের মনে ভয়ের জন্ম দিয়েছে সেই সাথে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের। লিটন হত্যার পরপরই তার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ থেকে বলা হচ্ছে এটা উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠির কাজ তবে আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও লিটন হত্যার তদন্তে নিয়োজিত কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে কোন সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি কারা লিটন হতয়ার সাথে জড়িত। তবে এ হত্যায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েক জনকে অনুমান নির্ভর আটক করেছেন আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। যাদের অধিকাংশই স্হানীয় জামাত-শিবিরের রাজনিতির সাথে জড়িত।

06_manjurulislamliton_121015_0013

লিটন হত্যা নিয়ে নানা জনের নানা মত। যার যেই মতই থাকুক না কেন বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা যে তেমন সুবিধাজনক না সেটা বলতে আমি মোটেও দ্বিধা বোধ করবো না। কারণ একই দিনে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা জেড এ মাহমুদ ডনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। ডন অক্ষত থাকলেও গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে জীবন দিতে হয়েছে সিপ্রা রানি নামের পথচারী এক নারীকে।

জানিনা কোন তথ্যের ভিত্তে আওয়ামীলিগের পক্ষ থেকে লিটন হত্যার জন্য জামাত-শিবির তথা ইসলামিক মৌলবাদি গোষ্ঠিকে দায়ী করা হয়েছে? যদি আওয়ামীলীগের এই দাবি সত্যি হয় তবে জাতির জন্য আরো অনেক অশনি সংকেত অপেক্ষা করছে। আওয়ামীলীগের এমন দাবি উড়িয়ে দেওয়ার মতও কোন কারণ নেই। গত কয়েক বছরে আমরা গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন এলাকায় যে নারকীয় তান্ডব দেখেছি তা সহসায় ভুলার কথা নয়। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের কয়েক মিনিটের মধ্যেই জঘণ্য তান্ডব শুরু হয়েছিল গাইবান্ধর সুন্দরগঞ্জে। পরে সে তান্ডব ছড়িয়ে পরেছিল গাইবন্ধা সহ দেশের অনেক প্রান্তেই। তবে সেই তান্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হ্য় ও অলোচিত হয় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ। জামায়াত-শিবির কর্মীরা সুন্দরগঞ্জে বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, ঘরবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, থানা-ফাঁড়ি ও পুলিশের ওপর হামলা করে। রেল স্টেশন, সুন্দরগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়, কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি ও বামনডাঙ্গা পুলিশ ফাঁড়ি, কিছুই বাদ যায়নি জামাত-শিবিরের তন্ডবের হাত থেকে। আগুনে পুড়িয়ে ও নির্মমভাবে পিটিয়ে মারা হয় চার পুলিশ সদস্যকে। এভাবে পুরো সুন্দরগঞ্জ সহ গাইবান্ধার অনেক এলাকাই চলে যায় জামায়াত-শিবিরের দখলে।

৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের আগে ও পরে আমরা নানান তান্ডব দেখেছি সুন্দরগঞ্জ ও তার আশেপাশে। ভোটকেন্দ্র হিসেবে স্কুল জ্বালিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে আগুনে পুড়িয়ে অর্ধ ডজন পুলিশ হত্যা এবং অস্ত্র লুটের ঘটনাও ঘটেছে সেখানে। হলি আর্টিজানের হামলায় অংশ নেয়া জঙ্গিদের কয়েকজনও নাকি গাইবান্ধর সুন্দরগঞ্জ সহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত! সবকিছু মিলিয়েই গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন এলাকা যে জামাত-শিবির সহ ধর্মীয় উগ্রবাদীদের নিরাপদ আশ্রয় ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যা সত্যি দুঃখজন সেই সাথে আতংকেরও বটে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন, কেন আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী লিটনের নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ হলেন? রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের রাড়িতে নিরাপত্তা না দিতে পারলেও সংসদ সদস্যের মত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির রাড়িতে তো নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব ছিল আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর। লিটনকেও যেহেতু নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, সে ক্ষেত্রে তাদের কাছে অবশ্যই এতটুকু দাবি করতে পারি যে কে বা কারা হত্যা করেছে এর অসল রহস্য উদঘাটন করে আইনের আওতায় এনে উচিত বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাবেন।

ইতোমধ্যে সুন্দরগঞ্জ সহ গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় জামাত শিবির নামধারী ধর্মীয় উগ্রবাদীরা পুলিশ হত্যা সহ যে ধ্বংস লীলা চালিয়েছে তার যদি সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি আনতেন তাহলে হয়তো সাংসদ লিটন হত্যা গুলশানের হলি আর্টিজানের হামলা সহ অনেক অঘটনের হাত থেকেই রক্ষা করা যেত জাতিকে। আমরা চাইবো না আহসানউল্লাহ মাস্টার বা কিবরিয়া হত্যার মত লিটনের হত্যাকান্ডও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হউক। আমার চাইবো সাংসদ লিটনের হত্যাকারীদের বিচারের মধ্য দিয়ে দেশের আইনের শাসন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মুক্ত নতুন এক সূর্যের উদয় হবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে।