ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

পুলিশ বলতে কি বুঝায়? যদি এমন প্রশ্নটা সবার কাছে ছুড়ে দেই তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই হয়তো এক একজন এক একভাবে এর উত্তর দিবেন। কিন্তু ইংরেজী রূপ Police শব্দ বিশ্লেষণ করলে আমরা যা পাই তা হলো P=Polite (মার্জিত), O=Obedient (বাধ্য), L=Loyal (বিশ্বস্ত), I= Intelligent (বুদ্ধি সম্পন্ন), C= Courageous (বীরত্বপূর্ণ), E= Efficient (দক্ষতা)। এর মূল অর্থ দাঁড়ায় আইন-শৃঙ্খলা ও শান্তি রক্ষা করার ব্যবস্থা। অর্থাৎ পুলিশ বলতে বুঝায় রাষ্ট্র তথা সমাজের সমগ্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রতিষ্ঠান, এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের কাজই হলো রাষ্ট্র তথা নাগরিকের শান্তি-শৃঙ্খলা ও জনস্বার্থ রক্ষা করা। তাই বিশ্বের অনেক দেশেই পুলিশকে বিভিন্ন উপাধিতে ডাকা হয় যেমন আইরিশ পুলিশদের ডাকা হয় গার্ডা সিওচানা, যার বাংলা অর্থ “শান্তির অভিভাবক” আর একজন পুলিশ অফিসারকে শুধু গার্ডা বা শান্তির কর্মী বলে। তবে আমাদের দেশের পুলিশবাহিনীর আচার-ব্যবহারের সঙ্গে আইরিশ পুলিশের ঐ উপাধি কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ এটাই আজ বড় প্রশ্ন?

চুরি-ছিনতাই-খুন-গুম-হত্যা-জমি দখল এমন কোন অপর্কম থেকে বাদ যাবে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নাম? যদিও প্রতিটি ঘটনার পরই আমাদের পুলিশ বাহিনীর কর্তাব্যক্তি সহ আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী দায়ছাড়া ভাবে বলে ফেলেন কোন একজন সদস্যের অপকর্মের দায়ভার সমস্ত পুলিশ বাহিনী নিবে না। যদিও এটা সত্য যে, এত বড় একটা বাহিনীতে দুয়েকজন খারাপ সদস্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার প্রশ্ন, এত বিশল একটি সুশৃংখল বাহিনীতে কিভাবে ঐ সকল পথভ্রষ্ট মানুষগুলি আশ্রয় পায়? অতি সম্প্রতি পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যের কীর্তি সমগ্র জাতিকে স্তম্ভিত ও আতংকিত করেছে। তা হলো, ২৬ জানুয়ারি ২০১৭ তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি সুন্দরবন বিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদে সাড়া দেশে আধা বেলা হরতাল ডেকে ছিল। হরতালের সমর্থনে ঢাকার শহরের শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক অনেক মানুষই যোগ দিয়েছিলেন শাহবাগে হরতাল সমর্থনের মিছিলে। ঐ মিছিলে আমরা পুলিশের যে নারকীয় তান্ডব দেখেছি তা রীতিমত সবাইকে হতবাক করেছে। সাধারণ মানুষের ঐ মিছিলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস জলকামান রাবার বুলেট লাঠি লাথি কোনটির ব্যবহার করে নাই? অথচ হরতাল সমর্থকরা করেনি কোন ভাংচুরে ফাটায়নি কোন বোমা। তারপরও প্রশ্ন কেন একটি শান্তিপূর্ণ হরতালে পুলিশের এত নির্মমতা? হরতাল সমর্থকদের উপর পুলিশের এই নির্মমতার চিত্র ধারণ করতে যেয়ে পুলিশের নির্মমতার হাত থেকে রেহায় পায়নি পেশাগত দায়িত্বে থাকা সংবাদকর্মীরাও।

Police

সেদিন পুলিশী নির্যাতনে আহত হতে হয়েছিল বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজের রিপোর্টার এহসান বিন দিদার ও ক্যামেরাপারসন আবদুল আলিমকে। সেই সাথে আমরা দেখছি মিজানুর রহমান নামের বয়োবৃদ্ধ একজন দেশপ্রেমীককে কিভাবে পুলিশ চেংগদোলা করে টেনে-হেচরে আহত করেছে। সেদিনের ঘটনায় আহত মিজানুর রহমানকে দেশপ্রেমিক বলায় কেউ আবার মনক্ষুন হতে পারেন। মিজানুর রহমান অবশ্যই দেশপ্রেমিক তিনি সেদিন যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে শাহবাগ এসেছিলেন নিজের কোন ব্যাক্তি স্বার্থ কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য নয় বরং আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে যাতে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে না যায় তার জন্য প্রতিবাদ করতে। সেদিন পুলিশের হাতে শুধু মিজানুর রহমান দিদার কিংবা আলিমই আহত হননি, আহত হয়েছেন আরো অনেকেই। অবশ্য এহসান বিন দিদার ও আবদুল আলিমের উপর নির্যাতনের ছবি যখন সোস্যাল মিডিয়াসহ নানা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তুলে সে প্রতিবাদের ঝড়ের গতিরোধ করতে সরকার অবশ্য সেইদিনই এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে শাহবাগ থানার এএসআই এরশাদ মন্ডলকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।

পুলিশের অপরাধ ও সেই অপরাধ ধামাচাপা দেয়ার জন্য সাময়িক বরখাস্ত এবং তদন্ত কমিটি এটা নতুন কিছু নয়। এর আগেও সমগ্র দেশে প্রতিবাদ হয়েছিল মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক মাসুদ শিকদার ও তা সহকর্মীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার সাবেক গণমাধ্যম কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীর উপর বর্বর নির্যাতনের পর। তখনও মাসুদ শিকদারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল তদন্ত কমিটি হয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি, ফলাফল শূন্যই রয়ে গেছে। আমাদের পুলিশের নৈতিক চরিত্রের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না বরং কেন জানি মনে হয়ে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নৈতিক চরিত্র ক্রমান্বয়ে নিম্ন দিকে ধাবিত হচ্ছে।

দীর্ঘদিন যাবত আমরা দেখে আসছি, যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন আমাদের পুলিশ বাহিনীকে তাদের দলীয় কর্মীদের মত ব্যবহারের চেষ্টা করে আসছে। এরই ফলশ্রুতিতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমাতে পুলিশকেই বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। সমাজের বিশষ্টজন সহ অনেকেরই ধারণা বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশ আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া ও হিংস্র রূপে আর্বিভূত হয়েছে। তার জন্য সকলেই ৫ জানুয়ারি ২০১৪ এর নির্বাচনকে দায়ী করছেন। ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বচনের পর সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য পুলিশই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই অনেকেই এ সরকারকে পুলিশ নির্ভর সরকার হিসেবে মনে করছেন। অবশ্য সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কথায়ও পুলিশের প্রতি তদের বিশেষ দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ পায়।

সম্প্রতি শহবাগে সাংবাদিকদের উপর পুলিশী নির্যাতনের সাফাই গাইতে গিয়ে মৌলভীবাজারের শমশেরনগরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, সাংবাদিক নির্যাতন পুলিশ করে না, মাঝে মাঝে ধাক্কাধাক্কি লেগে যায়। এ ধরনেরই কিছু হয়েছে। এতে পুলিশও মনে করছেন বর্তমান সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘাস্থায়ী করার জন্য তাদের বিকল্প বোধহয় সরকারের কাছে নেই, তাই পুলিশ আজ এতটা বেপরোয়া ও হিংস্র রূপে আর্বিভূত হয়েছে।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পুলিশ বাহিনীর অবদান ছিল অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বর্বর হানাদার বাহিনী যখন নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করেছিল, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে তখন প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। পরবর্তীতে পুলিশের এ সদস্যরা ৯ মাসজুড়ে দেশব্যাপী গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রে ১২৬২ জন শহীদ পুলিশ সদস্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রসঙ্গত, ঝিনাইদহের তৎকালীন সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে ঐতিহাসিক গার্ড অব অনার প্রদান করেন। এত কিছুর পরও রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের পুলিশ বাহিনীকে নানা অপকর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং আমাদের পুলিশও তাদের কর্তব্য ও ঐতিহ্যের কথা ভুলে গিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছেন। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক, সেই সাথে আতঙ্কজনকও বটে। আমরা চাইবো আমাদের পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মনের ভিতরে মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনা জাগ্রত হবে জাগ্রত হবে তাদের বিবেক ও কর্তব্যবোধ। আমাদের পুলিশবাহিনীও আমাদের বন্ধু হয়, আমাদের সেবক হয়েই আমাদের পাশে থাকবে- এমনটাই প্রত্যাশিত।